ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ স্তম্ভ, প্রদীপ, ঘাসে ঢাকা জায়গাটা দেখল। কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। এই স্তম্ভগুলোর সঙ্গে মণিমাণিক্য-বোঝাই সোনার জাহাজের সম্পর্ক কী? আরো একটা সোনার স্তম্ভ নাকি আছে। সেটাই বা কোথায়? তবে একটা কথা ফ্রান্সিস বুঝল যে এই স্তম্ভগুলোর সাহায্যেই সপ্তম স্তম্ভটা খুঁজে বার করতে হবে। তাহলেই রাজা ফ্লোকির গুপ্তধনের হদিস পাওয়া যাবে।
দুজনে গাড়িতে চড়ে রাজবাড়িতে ফিরে এল।
খাওয়া-দাওয়ার সময় ফ্রান্সিস রাজা ইনগলফকে বলল–এবার আমরা জাহাজে ফিরে যাবো।
রানী বলে উঠলেন–উই–তোমরা এখানেই থাকবে।
–তাহলে এক কাজ করা যাক–ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া এখানে আপনার কাছে থাক। আমাকে জাহাজে বন্ধুদের সঙ্গে থাকতেই হবে।
–বেশ–তাতে আমাদের আপত্তি নেই। রাজা বললেন?
–আজকে লোগবার্গের উৎসবে তোমরা যাবে না? রানী বললেন।
-হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাবো। বন্ধুদেরও নিয়ে যাবো। মারিয়া এখান থেকে আপনাদের সঙ্গে যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
রাজার দেওয়া গাড়িতে চড়েই ফ্রান্সিস জাহাজঘাটায় এল। জাহাজে উঠতেই বন্ধুরা ওকে ঘিরে ধরল। ফ্রান্সিস বলল–সবাই তৈরি হয়ে নাও। একটু পরেই আমরা লোকবার্গ যাবো। আজ ওখানে উৎসব। নাচগানের আসর বসবে।
সব ভাইকিংরা হৈ হৈ করে উঠল। সবাই খেয়েদেয়ে তৈরি হতে চলে গেল।
স্থানীয় চাষীদের কয়েকটা শস্যটানার গাড়ি যোগাড় করা হলো। ঘোড়াও পাওয়া গেল। ফ্রান্সিস আর ওর বন্ধুরা গাড়িতে আর ঘোড়ায় চড়ে হৈ হৈ করতে করতে চলল লোগবার্গের দিকে। যাবার সময় দেখল এই বন্দর নগরের রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে গেছে। দলে দলে স্ত্রী-পুরুষ ছেলেমেয়েরা যাচ্ছে উৎসবে যোগ দিতে। চারদিকে উৎসবের আবহাওয়া।
ওরা লোগবার্গ পৌঁছল। তখন অল্প অন্ধকারে পাথরের তিনটি বড় প্রদীপ জ্বালাবার কাজ চলছে। সেই বৃদ্ধটি সাদা মোটা লম্বা কাপড় পেঁচিয়ে পলতে তৈরি করল। তারপর একটা ছোট কাঠের মই প্রদীপস্তম্ভের গায়ে লাগাল। মইয়ে উঠে লম্বা আর মোটা পলতে প্রদীপে রাখল। পলতের মুখটা বাড়িয়ে রাখল। এবার লোকটি একটা শীল মাছের তেলের পিঁপে নিয়ে এল। মই দিয়ে উঠে তিনটে প্রদীপেই তেল ঢালল। তারপর চমকি ঠুকে একটা মশাল জ্বালল। মশালের আগুন দিয়ে প্রদীপগুলো জ্বেলে দিল। প্রদীপগুলো ভালো করে জ্বলে উঠতেই জায়গাটা আলোয় আলোময় হয়ে উঠল।
অনেক লোক এসেছে। পাহাড়ের খাঁজকাটা পাথরে বসেছে সবাই। ওই পাথরগুলোতে বসে সাধারণ দর্শকরা। ওখানেই সামনের দিকে একটা বড় পাথরের বেদীমতত। বেদীতে পাথর কুঁদে ফুল পাতা পাখির ছবির অলঙ্করণ। একটু পরেই খয়েরী রঙের সুদৃশ্য একটা মাথা খোলা গাড়িতে চড়ে রাজা ইনগলফ ও রানী এলেন। রানীর পাশে মারিয়া। রাজা-রানী উৎসবের সাজে সেজে এসেছেন। মারিয়াও একটা হালকা সবুজ রঙের নতুন পোশাক পরে এসেছে। রাজা-রানী ও মারিয়া সেই কাজ-করা বেদীতে বসল। দর্শকরা সমস্বরে রাজার জয়ধ্বনি দিল। ততক্ষণে ফ্রান্সিসরাও খাঁজকাটা পাথরের আসনে বসে পড়েছে।
সেই বৃদ্ধ লোকটি আরো দুতিনজনের সাহায্যে একটা লতাপাতা বোনা মোটা বিরাট কাপড় নিয়ে এল। স্তম্ভগুলোর পেছনে ঘাসের জমিতে সেটা পেতে দিল ওরা।
স্তম্ভের একপাশে তিন-চারটে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বাদ্যযন্ত্রীরা বসল। শুরু হলো বাজনা। আইসল্যাণ্ডের নানা রঙের সুতোয় কাজ-করা পোশাক পরে একদল মেয়ে এসে দাঁড়াল নাচের জায়গায়। একটি মেয়ে এগিয়ে এসে সুরেলা গলায় বাজনার সঙ্গে গান ধরল। শুরু হলো নাচ। অন্য মেয়েরা দল বেঁধে, কখনও হাত ধরাধরি করে, কখনও হাত ছাড়িয়ে নাচতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আসর জমে উঠল। দর্শকরা মাঝে মাঝে চিৎকার করে নাচিয়েদের উৎসাহিত করতে লাগল। একসময় নাচ গান থামল।
এবার রাজা-রানী আসন ছেড়ে উঠলেন। সবাই উঠে দাঁড়াল। রাজা ও রানী তাদের ঘোড়ার গাড়ির দিকে চললেন। পেছনে মারিয়া। তারা গাড়িতে উঠলেন। গাড়ি চলল। সুন্দর পোশাক পরা চারজন দেহরক্ষী ঘোড়ায় চড়ে গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে চলল।
আবার শুরু হলো বাজনা-নাচগান। দর্শকদের মধ্যে থেকেও কিছু লোক গিয়ে নাচের আসরে যোগ দিল। আনন্দ হর্ষধ্বনি উঠল দর্শকদের মধ্যে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে নাচগান চলল। তারপর উৎসব শেষ হলো। দর্শকরা উঠে দলে দলে গাড়িতে . চড়ে, পায়ে হেঁটে ফিরে চলল। ফ্রান্সিসরাও ফিরে চলল বন্দরের দিকে।
ওদিকে লোগবার্গের উৎসব থেকে রাজা-রানী ও মারিয়া ঘোড়ার গাড়ি চড়ে ফিরে আসছে রাজবাড়িতে।
রাজা ইনগলফের গাড়ি চলেছে। সামনে দুজন ও পেছনে দুজন অশ্বারোহী দেহরক্ষীও চলেছে। রানী হেসে মারিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন–কী? উৎসব কেমন লাগল?
খুব ভালো। বিরাট পাথরের প্রদীপের আলোয় এরকম নাচগান–অপূর্ব। মারিয়া বলল।
অল্প আলোয় গাড়ি চলেছে। একটু কুয়াশার জটলা এখানে ওখানে। গাড়ি একটা মোড়ে এল। এখানে দুটো রাস্তা। একটা চলে গেছে বন্দর শহরের দিকে। রাজবাড়ির দিকে। অন্য রাস্তাটা সোজা চলে গেছে এ রাজ্যের সীমান্তের দিকে। সীমান্ত পেরিয়েই থিংভেলির রাজ্য। সেই রাস্তাটা খুব ভালো নয়। এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে রাস্তা। এ রাস্তাটায় লোকজন গাড়িঘোড়ার চলাচলও কম। রাস্তার মাঝখানে দুপাশে কোথাও কোথাও তুষার জমেছে।
