কিছুদিন পরে ফ্রান্সিসদের জাহাজ রেভকজাভিক বন্দরে পৌঁছল। রেভকজাভিক বেশ বড় বন্দর। বেশ কটা জাহাজ নোঙর করা। মারিয়া ফ্রান্সিসকে বলল রেভজাভিক কথাটার অর্থ হলো বাষ্পচ্ছন্ন উপসাগর।
ফ্রান্সিস বিস্কোকে ডাকল। ওর হাতে রাজার চিঠিটা দিল। বলল–এখানকার রাজা ইনগলফের হাতে চিঠিটা পৌঁছে দাও। বিস্কো চিঠি নিয়ে চলে গেল। ফ্রান্সিসের বন্ধুরা জাহাজ থেকে নেমে জায়গাটা দেখতে লাগল। বেশ কিছু বাড়িঘর আছে। বাড়িঘর সবই পাথরে তৈরি, ছাদ মোটা ঘাসের আস্তরণে তৈরি, রাস্তায় লোকজনের ভিড়। প্রায় সবাই ভাইকিং। দোকানপাট, কড মাছের গুদাম এসব আছে। বাড়িগুলো লম্বাটে। লম্বা ঘর। দুপাশের দেয়ালে কাঠের পাটাতন। শোয়া, রান্না করা ঐ পাটাতনেই। ফ্রান্সিসের বন্ধুরা ঘুরেফিরে বন্দরটা দেখতে লাগল। তখনই ওরা দেখল পথ দিয়ে ঘোড়ায় টানা একটা বেশ জমকালো গাড়ি আসছে। গাড়ির কালো চকচকে কাঠে সোনালী লতাপাতার কাজ। ওরা বুঝল রাজা ইনগলফ চিঠি পেয়ে আসছেন। ওরা তাড়াতাড়ি জাহাজে ফিরে এল।
রাজার ঘোড়ার গাড়ি জাহাজঘাটায় এসে থামল। রাজা ইনগলফ আর রাণী দুজনেই এসেছেন। ফ্রান্সিস আর মারিয়া জাহাজ থেকে নেমে এল। রাজা ও রানীকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। রাজা ইনগলফ ফ্রান্সিসকে দুহাতে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন–ফ্রান্সিস, চারণ কবিদের গানে তোমার নানা বীরত্বের কাহিনী শুনেছি। তুমি আমাদের দেশে এসেছো এ জন্যে আমরা গর্ব অনুভব করছি। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে চুপ করে রইল। ওদিকে রানীও মারিয়ার সঙ্গে নানা কথা বলতে লাগলেন। কেমন লাগছে এ দেশ–আসতে কষ্ট হয়েছে কিনা–এসব।
একটু পরে রাজা-রানীর সঙ্গে গাড়িতে চড়ে ফ্রান্সিস ও মারিয়া রাজবাড়িতে এল। রাজবাড়িটাও পাথরের। বেশ বড়। চারদিকে পাথরের দেয়াল।
একটা ঘর ফ্রান্সিস ও মারিয়াকে ছেড়ে দেওয়া হলো। খুব সাজানো-গোছানো পাথরের ঘর। দেয়ালে পাথর কেটে ফুল লতাপাতার কাজ।
একসময় ফ্রান্সিসদের খাবারঘরে আসার জন্যে বলতে একজন পরিচারক এল। ওরা তার সঙ্গে চলল।
ওরা দুজনে খাবার ঘরে ঢুকল। একটা লম্বাটে বেশ বড় মসৃণ পাথরের খাবার টেবিল। ধারে ধারে কারুকাজ করা ও কাঠের চেয়ার পাতা। রাজা-রানী তাদের পাশেই ফ্রান্সিস আর মারিয়াকে বসালেন। মন্ত্রী, সেনাপতি ও অন্য অমাত্যরাও এসে বসলেন। পরিবেশনকারীরা খাবার পরিবেশন করতে লাগল। খাওয়া-দাওয়া চলল। রাজা ইনগলফ ফ্রান্সিসকে কথাপ্রসঙ্গে বললেন–রাজামশাইর চিঠিতে তোমরা আসছো এটা জেনেছি। কিন্তু তোমরা কেন এসেছে সেটা উনি লেখেননি।
ফ্রান্সিস তখন আস্তে আস্তে কবি আরির আইসল্যানিগা বক–এর কথা রাজা ফ্লোকি কর্তৃক গোপনে লুকিয়ে রাখা মণিমাণিক্য-বোঝাই সোনার জাহাজ এসবের ঠিক বুঝল না এগুলো কী? ফ্রান্সিসকে ডেকে বলল–এই চৌকোণো থামের মতো এগুলো কী? ফ্রান্সিস কাছে এল। চৌকোণো থামগুলো দেখল। কিন্তু ও নিজেও বুঝতে পারল না। মাথা নাড়ল।
ওরা দুজনে ঘুরে ঘুরে সব দেখতে লাগল। তখনই ফ্রান্সিস দেখল কিছুদূরে পাহাড়ের নিচে একটা পাথরের ঘর। ঘোট ঘর। ঘরটায় ছাউনি এখানকার রীতি অনুযায়ী মোটা শুকনো ঘাসের। ফ্রান্সিস তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ঘরটা থেকে একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এল। লোকটার মুখের দাড়ি-গোঁফ, মাথার চুল সব সাদা। একটা লম্বা কাঠের মাথায় আঁটা বাঁধা। সেটা নোকটার কাঁধে। বৃদ্ধটি ঝটা নিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে ফ্রান্সিস আর মারিয়ার কাছে এল। একবার ওদের দেখল। তারপর স্তম্ভপোঁতা জায়গাটা আঁটা দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগল। মারিয়া এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল–এ জায়গাটা পরিষ্কার করছেন কেন?
বৃদ্ধটি সাদা ভুরু কুঁচকে মারিয়ার দিকে তাকাল। পাকা দাড়ি-গোঁফের ফাঁকে হাসল। বলল–তোমরা বুঝি নতুন এসেছো?
-হ্যাঁ। মারিয়া বলল।
–আজকে পনেরো তারিখ। ঘন্টাকয়েক পরে এখানে নাচগানের আসর বসবে। বৃদ্ধ বলল।
প্রত্যেক পনেরো তারিখই নাচগান হয় এখানে তাই না? মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ–আর আমার কাজ হলো সেদিন এই জায়গাটা ঝটটাট দিয়ে পরিষ্কার রাখা আর উৎসবের সময় প্রদীপ জ্বালানো।
কথাটা শুনে ফ্রান্সিস এগিয়ে এল। বলল–এখানে প্রদীপ কোথায়?
বৃদ্ধটি আঙুল দিয়ে চৌকোণো থামগুলো দেখাল। বলল–ঐ তিনটে প্রদীপ। মোটা কাপড় পেঁচিয়ে পলতে তৈরি করি। তারপর প্রদীপগুলোর মাথায় শীল মাছের তেল ঢালি। প্রদীপ জ্বালিয়ে দিই। এই কাজগুলো করাই আমার চাকরি। বৃদ্ধটি আবার ঝাট দিতে লাগল। ফ্রান্সিস এগিয়ে গিয়ে পাথরের প্রদীপগুলো দেখল। দেখল সত্যিই বড় প্রদীপের মতো ওগুলো। ওগুলোর মাথায় তেলকালি লেগে আছে।
-আপনি কতদিন এই কাজ করছেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধটি সাদা ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নেড়ে বলল–সেই কতদিন থেকে–মনে নেই।
–আচ্ছা আপনি কি বরাবর এই ছটা স্তম্ভই দেখেছেন?
–হ্যাঁ?
–সপ্তম স্তম্ভের কথা শুনেছেন কখনও?
বৃদ্ধ একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল–আমার আগে যে এখানে কাজ করতো, কথায় কথায় সে একদিন বলেছিল এখানে রাজা ফ্লোকি আর একটা স্তম্ভ পুঁতেছিলেন। তবে সেটা পাথরের না, সোনার।
কথাটা শুনে ফ্রান্সিস চমকে উঠল। বলল–আর কী বলেছিল?
বৃদ্ধ মাথা নাড়লনা, আর কিছু না। তারপর নিজের কাজ করতে লাগল।
