ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল–বাবা, তুমি কিচ্ছু ভেবো না।
–হুঁ, এবার বসো। খাওয়া শেষ করো। মন্ত্রীমশাই বললেন।
ফ্রান্সিস শান্ত ছেলের মতো আবার বসে পড়ল। খেতে লাগল।
ফ্রান্সিসের আর তর সইছিল না। খুব ভোরে উঠে পড়ল। মারিয়াকে ডাকল। ঘুম ভেঙে মারিয়া ওর দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল-শীগগিরি তৈরী হয়ে নাও। তোমার বাবা-মার সঙ্গে কথা বলতে যাবো।
ওরা ঘোড়ায় টানা গাড়ি চড়ে যখন রাজপ্রাসাদে এসে পৌঁছল তখন সবে সকাল হয়েছে। রাজামশাই তখনও বিছানায় শুয়ে। রাজার শোবার ঘরে ঢুকল দুজনে। রাজামশাই তো ওদের দেখে অবাক। বললেন–কী ব্যাপার? তোমরা এত সকালে?
মারিয়া বাবার পাশে বিছানাতেই বসল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে রইল। মারিয়া একে একে সব কথা বলতে শুরু করল। তখনই পাশের ঘর থেকে রানী এলেন। বললেন–মারিয়ার গলা শুনলাম। কী ব্যাপার? তোমরা এ সময়? মারিয়া তখন বাবা-মা দুজনকেই সব কথা বলল। রাজামশাই বললেন–দ্যাখো মারিয়া ফ্রান্সিসের বাবাই এখন তোমার অভিভাবক। উনি যদি সম্মতি দিয়ে থাকেন আমাদের বলার কিছু নেই। মারিয়া খুশিতে হাততালি দিয়ে ফেলল। রানীর গলা জড়িয়ে ধরল। বলল–মা, তুমি? রানী হাসলেন। বললেন–তোমার বাবা তো বললেনই। তাহলে আর আমি অমত করবো কেন? রাজামশাই বললেন-আইসল্যান্ডের কথা তো বিশেষ জানো না তোমরা। ওখানে কিন্তু সূর্যের উত্তরায়ণ দক্ষিণায়নের জন্যে বছরে ছমাস রাত ছমাস দিন।
-এখন তো ওখানে শীতকাল। ফ্রান্সিস বলল–তার মানে রাত চলছে। এ সময়টায় কি আকাশ নিকষকালো!
-না–তা নয়। খুব নরম আলো যাকে এ সময়। কাছের সবকিছু আবছা দেখা যায়। তবে শীতটা বেশি। রাজা বললেন।
–তাতে কোনো অসুবিধে হবে না। ফ্রান্সিস বলল?
–কিন্তু একটা ব্যাপার নিয়ে ভাবছি। রাজা বললেন?
–কী ব্যাপার? মারিয়া জানতে চাইল। রাজা বললেন–ফ্রান্সিস, তোমার বোধহয় মনে আছে তুমি যখন সোনার ঘন্টা আনতে গিয়েছিলে তখন আমার সেনাপতি ছিল গুমন্ড। সে তোমাদের বিপদে ফেলতে চেয়েছিল।
-হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আছে বৈকি। ফ্রান্সিস বলল?
–সেই গুমন্ডকে আমি আইসল্যান্ডে নির্বাসিত করেছিলাম। এখন গুমন্ড থিংভেলিরে লোকজন জড় করে রাজা হয়ে বসেছে। রাজা বললেন।
–কিন্তু আমরা তো যাচ্ছি রেভকজাভিকে। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ, রেভকজাভিকের রাজা এখন ইনগলফ। ইনগলফ আমাকে বরাবরই সম্মান করে। ওকে আমি চিঠি লিখে তোমার হাতে দেবো, ও তোমাদের সমাদর করবে। কিন্তু মুশকিল হয়েছে যে সপ্তাহখানেক আগে ইনগলফ আমাকে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছে যে গুমন্ড নাকি ওর রাজ্য আক্রমণ করার জন্যে তোড়জোড় করছে। এ সময় তোমরা যাবে তাই ভাবছি তোমরা না বিপদে পড়ো। রাজা বললেন।
–আমরা যাতে যুদ্ধে না জড়িয়ে পড়ি সে চেষ্টাই করবো। ফ্রান্সিস বলল?
–ঠিক আছে–তোমরা যা ভালো বুঝবে করবে?
–আমাদের একটা ভালো জাহাজ দিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। রাজামশাই বললেন?
–যাত্রার দিনটা পরে আপনাকে জানাবো। ফ্রান্সিস বলল?
–আচ্ছা–রাজা বললেন। ফেরার পথে ফ্রান্সিস হ্যারির বাড়ি গেল। হ্যারি সব শুনে লাফিয়ে উঠল–আবার অভিযান। ঠিক হলো হ্যারি বিস্কো, শাঙ্কো আর অন্য বন্ধুদের খবর দেবে। পরদিন বিকেলে ফ্রান্সিসের বাড়িতে মিলিত হবে সবাই।
বিকেলে প্রায় সব বন্ধুই এল। গল্পগুজবে আড্ডা জমে উঠল। একসময় ফ্রান্সি উঠে দাঁড়াল। সবাই চুপ করল। ফ্রান্সিস বলল–ভাইসব–আবার অভিযানে বেরুবো আমরা। এবারের গন্তব্যস্থল–আইসল্যান্ড। তারপর ফ্রান্সিস কবি আরির বই, ছবি নকশা, রাজা ফ্রোকির গুপ্তধন, মণিমাণিক্য-বোঝাই জাহাজ, সপ্তম স্তম্ভ সব কথাই বলল। সবশেষে বলল–ভাইসব, দুটো সুসংবাদ দিচ্ছি–এক রাজামশাই আমাদের জাহাজ দেবেন–ভাল জাহাজ, আর দুই–এই অভিযানে মারিয়াও আমাদের সঙ্গে যাবে। সব ভাইকিং বন্ধুরা চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো-। তারপর আলোচনা করে স্থির হলো, পাঁচ তারিখে ওরা জাহাজ নিয়ে অভিযানে বেরুবে।
দেখতে দেখতে পাঁচ তারিখ এসে গেল। এর মধ্যে সবাই গরম জামাকাপড় কিনল। খাদ্য অস্ত্রশস্ত্র সব যোগাড় করে রাখল। গ্রীনল্যান্ডে ওরা এর আগে এক অভিযানে গিয়েছিল। কাজেই শীতের দেশ সম্পর্কে ওদের অভিজ্ঞতা আছে। তাছাড়া–আইসল্যান্ড গ্রীনল্যান্ডের মতো সবসময় বরফে ঢেকে থাকে না।
যাত্রার দিন একটা সুদৃশ্য মজবুত জাহাজ জাহাজঘাটায় আনা হলো। ফ্রান্সিসরাও তখন সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস কুড়ুল, বেলচা, দড়ি এসব জাহাজে রাখল। তারপর খাদ্য-জল।
জাহাজঘাটায় একটা সুন্দর সামিয়ানা টাঙিয়ে তার নিচে রাজবাড়ি থেকে আনা চেয়ার-টেবিল রাখা হলো। মারিয়া, ফ্রান্সিস ও বন্ধুরা জাহাজে উঠল। ডেক-এ এসে দাঁড়াল। রাজা,মন্ত্রী ও অন্যান্য গণ্যমান্য অমাত্যরা সামিয়ানার নিচে এসে বসলেন। কামান দাগা হলো। ঘর ঘর শব্দে নোঙর তোলা হলো। ফ্রান্সিসদের জাহাজ গভীর সমুদ্রের দিকে ভেসে চলল।
দিন সাতেকের মধ্যে জাহাজ ফারো দ্বীপে পৌঁছল। সেখান থেকে দক্ষিণ আইসল্যান্ডের বন্দর অলিপ্টাজর্ড-এ পৌঁছল।
আলোর দেশ ছেড়ে এবার ফ্রান্সিসরা অন্ধকারের দেশে পৌঁছল। সত্যি চারিদিকে নিকষ অন্ধকার নয়, শেষ বিকেলের ম্লান আলোর মত আকাশে মাটিতে আলো ছড়ানো। তাতে কাছাকাছি সবকিছুই অস্পষ্ট হলেও দেখা যায়। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। সবাই বাড়তি গরম পোশাক গায়ে পরে নিল।
