ওরা দরজার কাছে এল। গ্রন্থাগারিক ও পাহারাদার এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল-দেখুন–সব পড়া হলো না। পরে আসবো।
–অবশ্যই, অবশ্যই। গ্রন্থাগারিক বললেন। এদিকে মারিয়া কোনোরকমে ছবির ছেঁড়া পাতাটা পোশাকের আড়ালে চেপে ধরে আছে। এই শীতেও মারিয়া ঘেমে উঠেছে। যদি ছবিসুদ্ধ ধরা পড়ে, লজ্জা অপমানের আর শেষ থাকবে না।
গাড়িতে উঠে মারিয়া ছবির পাতাটা ফ্রান্সিসকে দিল। বলল–উফ–কী কান্ড! তুমি শেষ পর্যন্ত আমাকে চোর বানালে? ফ্রান্সিস হো হো করে হেসে উঠল।
–কী দরকার ছিল চুরি করার? বাবাকে বললেই পারতে। মারিয়া বলল।
-আমি এখন কাউকে এই ছবির কথা জানাতে চাইনা। তাই–। ফ্রান্সিস বলল-তাছাড়া ছবি আর ত্রিভুজটা নিয়ে ভাবতে হবে তো। তাই হাতের কাছে রাখবো।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিস ও মারিয়া শোবার ঘরে এল। ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া, তুমি ঘুমোও।
–তুমি শোবে না?
–না–আমাকে এই ছবিটা খুব ভাবিয়ে তুলেছে।
–তুমি এটা নিয়ে ভাববে, ঘুমুবে না আর আমি নাক ডাকিয়ে ঘুমুবো? অসম্ভ। মারিয়া বলল।
–বেশ, তাহলে এসে সমস্ত ব্যাপারটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা যাক। দুজনে বিছানায় বসল।
ফ্রান্সিস ছবিটা বিছানায় পাতল। রূপোর ঝকঝকে মোমবাতিদানটা বিছানায় রাখল। এবার খুব মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখতে লাগল। একটু পরে বলল আচ্ছা মারিয়াকবি আরি স্তম্ভ সম্পর্কে কী লিখছে?
লিখেছেন যে মণিমাণিক্য বোঝাই সেই সোনার জাহাজের সঙ্গে স্তম্ভগুলোর একটা সম্পর্ক আছে। কারণ, স্বর্ণকার থরবার্গ মরবার আগে–সপ্তম-স্তম্ভ এই কথা দুটো বহুকষ্টে বলতে পেরেছিল। কিন্তু সম্পর্কটা যে কী তা কবি আরি নিজে বুঝে উঠতে পারেননি। সবটাই অনুমান। মারিয়া বলল।
–হুঁ। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। তারপর বলল—দেখো জাহাজের মুখের ছবিটায় কোনো রহস্য আছে কি নেই এটা ঠিক এখুনি বলা যাচ্ছে না। তবে আমার মনে হয় পেছনের ত্রিভুজটার রহস্য খুব গভীর। মণিমাণিক্য-বোঝাই ঐ ক্ষুদ্র জাহাজটা কোথায় গোপনে রাখা হয়েছে তার হদিস পাওয়া যাবে ঐ ত্রিভুজটা থেকে।
এবার মারিয়া ঝুঁকে পড়ে। ত্রিভুজের মতো ছবিটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে বলল–একটা জিনিস লক্ষ্য করেছো?
–হ্যাঁ, দেখেছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না ঐ তিনটে চিহ্নের অর্থ কি? ফ্রান্সিস বলল।
এবার মারিয়া বলল–সাপের মুখের মতো এই ছবিটায় একটা জিনিস লক্ষ্য করেছো?
–কী? ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া বলল-ত্রিভুজের ওপরের দিকে তিনটে চিহ্ন।
–হ্যাঁ, দেখেছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না ঐ তিনটে চিহ্নের অর্থ কী? ফ্রান্সিস বলল।
এবার মারিয়া বলল–সাপের মুখের মতো এই ছবিটায় একটা জিনিস লক্ষ্য করেছো.
–কী?
–সাপের মাথার দিকে সাতটা মণির মতো চিহ্ন?
–বলো কী? ফ্রান্সিস চমকে উঠল। তাড়াতাড়ি ছবিটা নিয়ে দেখতে দেখতে
বলল–মারিয়া-আশ্চর্য–দেখো সাপের দাঁতও সাতটা।
–সত্যিই তো। মারিয়া বলে উঠল।
–স্বর্ণকার থরবার্গ বলেছিল-সপ্তম স্তম্ভ। তাহলেই বোঝা যাচ্ছে সাত সংখ্যাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া বলে উঠল–ঠিক বলেছো।
ফ্রান্সিস বিছানা থেকে নেমে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। মারিয়া কিছুক্ষণ তাই দেখল। তারপর বলল–কী ভাবছো?
–আবার সমুদ্রযাত্রা। ফ্রান্সিস বলল।
–মানে? মারিয়া বলল।
–এবার আইসল্যান্ড সপ্তম স্তম্ভের রহস্য উদ্ধারে?
–বাবা তোমাকে আর যেতে দিলে তো? মারিয়া বলল?
–তবে সেই পুরোনো পথ—
–অর্থাৎ জাহাজ চুরি?
–হ্যাঁ।
–এবার আমিও যাবো। মারিয়া বলল।
–অ্যাঁ? ফ্রান্সিস পায়চারি থামিয়ে মারিয়ার দিকে তাকাল?
–দেখো–তোমার বাবাকে সব বুঝিয়ে বলবো। তারপর বলবো আমিও তোমার সঙ্গে যাবো। তাহলে উনি আর আপত্তি করবে না। মারিয়া বলল।
-বেশ–তাহলে কালকেই অনুমতির বাপারটা মিটিয়ে ফেলতে হবে। তারপর বন্ধুদের খবর দেবো।
.
পরদিন রাতে ফ্রান্সিসের বাবা মন্ত্রীমশাই খেতে বসেছেন। ফ্রান্সিসও খাচ্ছে। মারিয়া খাবারদাবার পরিবশন করছে। তখনই মারিয়া আস্তে আস্তে আইসল্যান্ডের কবি আরি, রাজা ফ্লোকি, তার মণিমাণিক্য-বোঝাই ক্ষুদে জাহাজ, স্তম্ভ এসবের গল্প বলতে লাগল। মন্ত্রীমশাই খেতে খেতে শুনতে লাগেলন। সবশেষে সপ্তম স্তম্ভের রহস্যভেদ করতে ফ্রান্সিস আইসল্যান্ড যেতে চায় সে কথা বলল। মন্ত্রীমশাই খাওয়া থামিয়ে মারিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর চোখ ফেরালেন ফ্রান্সিসের দিকে। ফ্রান্সিস খাওয়া থামিয়ে বাবার দিকে তাকাল। মন্ত্রীমশাই একবার কাশলেন। তারপর ভারী গলায় বললেন–তোমার জ্বালায় তোমার মা অকালে দেহ রেখেছেন। এবার এই মেয়েটাকেও মেরে ফেলতে চাও।
ফ্রান্সিস বলল–বাবা–তুমি ব্যাপারটা–
ফ্রান্সিসকে থামিয়ে দিয়ে মন্ত্রীমশাই বললেন–তোমার কোথাও যাওয়া হবে। না। এই আমার শেষ কথা।
মারিয়া মাথা নিচু করে মৃদুস্বরে বলল–বাবা–একটা কথা বলছিলাম।
–হুঁ। বলো। মন্ত্রীমশাই বললেন।
–মানে–আইসল্যান্ড তো বেশি দূরে নয়, কাছেই। তাই ভাবছি আমিও ওদের সঙ্গে যাবো। মারিয়া মৃদুস্বরে বলল।
–এ্যাঁ? মন্ত্রীমশাই বেশ চমকে উঠলেন।
মারিয়া একই ভঙ্গিতে বলল–বাবা–আপনি ভাববেন না। ওখানে তো ভাইকিংদেরই বসত। কোনো বিপদ হবে না আমাদের। নিরাপদে ফিরে আসবো।
মন্ত্রীমশাই মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ কী ভাবলেন। তারপর মুখ তুলে বললেন-দেখো মারিয়া–তোমার জন্যেই আমি ফ্রান্সিসকে যেতে দিতে চাইছিলাম না। এখন তুমি যদি সঙ্গে যাও–আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে তোমাদের কোনো বিপদ ঘটলে আমাকে দোষ দিও না।
