মারিয়া হেসে বলল–তোমার মাথায় মাঝে মাঝে এমন ভূত চাপে না যে কী বলবো। মারিয়া এবার উঠতে উঠতে বলল তোমার অনুরোধ গ্রন্থাগারিক ফেলতে পারবেন না। কিন্তু তুমি তো সবটা শুনলে না।
–যেতে যেতে শুনবো। জলদি তৈরি হয়ে নাও। ফ্রান্সিস বলল।
ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ে দুজনে রাজবাড়ি চলল। ফ্রান্সিস বলল–এবার বলো।
মারিয়া বলতে লাগল–কবি আরি লিখেছেন–মুমূর্ষ থরবার্গ কী যেন বলতে চেয়েছিল। কবি আরি থরবার্গের মুখের কাছে অনেকক্ষন কান পেতে দুটো কথা খুব অস্পষ্টভাবে শুনতে পেয়েছিলেন।
–সেই কথা দুটো কী? সাগ্রহে ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল?
–সপ্তম স্তম্ভ। মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস কথা দুটো কয়েকবার আওড়াল–সপ্তম স্তম্ভ। তারপর বলল–আচ্ছা আইসল্যান্ডে স্তম্ভ কোথায় আছে?
–রেভকজাভিকেই আছে। জানো–-রেভকজাভিকের চারপাশে সুন্দর পাহাড়। উত্তরের পাহাড়ের নিচে একটা বিস্তৃত সমতলভূমি। সেখানে কয়েকটা স্তম্ভ পোঁতা আছে। রাজা ফ্রোকি সেই স্তম্ভ পুঁতিয়েছিলেন। সেখানে প্রত্যেক মাসের পনেরো তারিখে নাচগানের আসর বসে। এই জায়গাটার নাম লোগবার্গ। কত মানুষ আসে। মেলা বসে যায় যেন। অনেক রাত পর্যন্ত নাচগান চলে। মারিয়া বলল।
–আচ্ছা–ঐ জায়গায় স্তম্ভ কেন পোঁতা হয়েছিল?
–কবি আরি বলেছেন–হয়তো রাজা ফ্রোকির ইচ্ছে ছিল ওখানে একটা উপাসনা মন্দির তৈরি করার।
–কটা স্তম্ভ পোঁতা আছে ওখানে? ফ্রান্সিস বলল?
–আমি তত যাইনি। ঠিক জানি না? মারিয়া বলল। রাস্তায় লোকজন। গাড়ি চলেছে। পথের ধারে দোকানপাট, বাড়িতে আলো জ্বলছে। ফ্রান্সিস বলল-গ্রন্থাগারের চাবি কার কাছে থাকে?
–গ্রন্থাগারিকের কাছে?
–কোথায় থাকেন উনি?
–রাজবাড়ির পূর্বকোণায়।
ফ্রান্সিস গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কোচোয়ানকে সেখানে যেতে বলল।
খবর পেয়ে গ্রন্থাগারিক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। মাথা নুইয়ে ফ্রান্সিসকে মারিয়াকে সম্মান জানালেন। বারবার বলতে লাগলেন–আমি–মানে আপনারা–বুঝতে পারছি না–
ফ্রান্সিস হেসে বলল–আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না। গ্রন্থাগারের চাবিটা নিয়ে আমাদের সঙ্গে আসুন। গ্রন্থাগারে আমরা একটু পড়াশুনা করবো।
–নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। গ্রন্থাগারিক প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। ছুটলেন চাবি আনতে।
গ্রন্থাগারের পাহারাদার দরজার কাছেই পাহারা দিচ্ছিল। ফ্রান্সিসদের দেখে অবাক। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল। গ্রন্থাগারিক ওকে আলো নিয়ে আসতে বললেন। পাহারাদার একটা মোটা জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে এল। বিরাট দরজার বড় তালাটা গ্রন্থাগারিক খুললেন। ঘরঘর শব্দে দরজাটা খুলল। সকলে ভেতরে ঢুকল। গ্রন্থাগারিক বললেন–কি বই পড়বেন আপনারা?
–আইসল্যান্ডের কবি আরির বই। ফ্রান্সিস বলল?
–কবি আরি ছাড়াও আইসল্যান্ডের লেখক পলিরিয়াস, স্ত্র্যাবো,–
বাধা দিয়ে ফ্রান্সিস বলে উঠল–না না–শুধু আরির বই পড়বো। মারিয়া জানে বইটা কোথায় আছে। আলোটা রেখে আপনারা কিছুক্ষণের জন্যে বাইরে যান।
–নিশ্চয়-নিশ্চয়–। গ্রন্থাগারিক বললেন। তারপর পাহারাদারকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
মারিয়া মোমবাতিটা হাতে নিয়ে এগোল। চারপাশে কাঠের পাটাতনে নানা আকাবের হাতে লেখা বই রয়েছে। মারিয়া একটা বড় আকারের চৌকোণা বইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। মোমবাতিটা রাখল। দেখা গেল বইটা সিন্ধুঘোটকের মোটা চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা। মারিয়া মোটা মলাট ওল্টাল। বইয়ের নাম লেখা–আইসল্যান্ডিগা বক। মোটা পার্চমেন্ট কাগজের বেশ কিছু পাতা উল্টে সেই ভেড়ার সাদা চামড়ায় আঁকা রঙ করা ছবিটা বের করল। ফ্রান্সিস খুব মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখতে লাগল। এটা একটা জাহাজের মুখ। নানা রঙে আঁকা। ছবিটা দেখতে এরকম–নিচে লেখা দীর্ঘ সৰ্প। পাঁচ ফুট লম্বা এক ফুট চওড়া। ফ্রান্সিস বুঝল ঐ জাহাজটার ক্ষুদে মাপ এটা। জাহাজের মুখের ছবিটার পেছনের পাতায় আঁকা একটা ত্রিভুজের মতো।
ফ্রান্সিস খুব মনোযোগ দিয়ে ছবির ত্রিভুজটা দেখল। জাহাজের ব্যাপারটা বুঝল। জাহাজটার নাম দীর্ঘ সৰ্প। জাহাজের পুরো ছবি নেই। আছে শুধু সামনের মুখটা। কিন্তু অন্য পিঠের ত্রিভুজটার কোনো অর্থই বুঝতে পারল না। এই ত্রিভুজটা আঁকার মানে কি? ফ্রান্সিস ছবি দুটো বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। মারিয়া ঐ ছবি দুটো আগেই দেখেছিল। এবার বলল–চলো–দেরি হয়ে যাচ্ছে; গ্রন্থাগারিক মশাই অনেকক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
ফ্রান্সিস ছবিটা থেকে মুখ তুলল। কোনো কথা না বলে মারিয়ার মাথার চুলে। হাত দিয়ে কি দেখতে লাগল। মারিয়া অবাক।
–কী ব্যাপার? মারিয়া বলল।
তোমার মাথার চুলে গাঁথা এই কাটাটা খুলে দাও তো। ফ্রান্সিস বলল। তারপর চ্যাপ্টামতো সোনার কাঁটাটা দেখাল। মারিয়া আর কিছু বলল না। কাটাটা চুল থেকে খুলে দিল। ফ্রান্সিস দিয়ে বইয়ের পাতলা চামড়াটা কাটতে লাগল। চ্যাপ্টা মত কাটাটা মারিয়া ওর কান্ড দেখে চাপা স্বরে বলে উঠল—এই–কী করছো?
–চুরি। বইয়ের এই ছবির পাতাটা আমার চাই। ফ্রান্সিস বলল। ততক্ষণে পাতাটা কাটা হয়ে গেছ। ফ্রান্সিস বলল–এটা তোমার পোশাকের আড়ালে নিয়ে চলো।
–কী কান্ড—তুমি–। মারিয়া কথাটা আরা শেষ করতে পারল না।
ফ্রান্সিস বলল–চুপ। চলো।
