এভাবেই দিন কাটছিল। ফ্রান্সিস কোনোদিনই দুপুরে ঘুমোতো না। এখন ঘুমোয়। আশ্চর্য! সেটাই অভ্যেস হয়ে গেল। অবশ্য বেশিক্ষণ নয়। আধ ঘণ্টা মতো ঘুমিয়ে উঠতে লাগল। কিছুদিন হলে মারিয়াও এসময় বাড়ি থাকে না। কোথায় যায় কে জানে।
মারিয়া থাকলে তবু গল্প করে সময় কাটতো।
সেদিন বিকেলের দিকে মারিয়া বাড়ি ফিরতে ফ্রান্সিস বলল–তুমি দুপুরে কোথায় যাও বলোতো?
–রাজবাড়িতে। মারিয়া বলল?
–কেন?
–রাজবাড়ির গ্রন্থাগারে পড়তে যাই। মারিয়া বলল?
–তা বইগুলো নিয়ে এসে পড়লেই পারো। ফ্রান্সিস বলল।
–নিয়ম নেই। মারিয়া বলল।
–তোমাদের বাড়িতে গ্রন্থাগার। তেমাকেও নিয়ম মানতে হবে?
–হ্যাঁ, নিশ্চয় মানাতে হবে। তাছাড়া ভেড়ার চামড়ায়, পার্চমেন্ট কাগজে লেখা, আঁকা বই। টানা হ্যাঁচড়া করলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
–হুঁ। তা এখন কী বই পড়ছো?
ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–আইসল্যান্ডের এক একটা বই। প্রায় একশ বছর আগের লেখা। জানো তো আইসল্যান্ডের অধিবাসীরা গীতিকাব্য গল্পকাহিনী ভীষণ ভালোবাসে। আসলে আইসল্যান্ডের অধিবাসীরা তো বেশির ভাগই ভাইকিং–আমাদের দেশের মানুষ। কিছু আছে আয়ারল্যান্ডের আর অন্য দেশের লোক। ওখানকারই একজন কবি নাম থরগিলমন আরি। সংক্ষেপে কবি আরি নামে পরিচিত। তার বই আইসল্যান্ডিগা বক বা আইসল্যান্ডবাসীদের বই। সেটাই পেয়েছি।
–বইটা পড়া হয়ে গেছে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ভাইকিংরা দলে দলে আইসল্যান্ডে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। সমুদ্রের খাড়িতে, নদীতে প্রচুর মাছ। বহুবিস্তৃত তৃণভূমি। কবি আরি বলেছেন, সেই তৃণের প্রতিটি পাতা থেকে যেন মাখন ঝরে পড়ছে। তাহলেই বুঝতে পারছো কী উর্বর সেইসব দিগন্তবিস্তৃত তৃনভূমি। ভাইকিংরা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল ঘোড়া, গরু, ভেড়া যন্ত্রপাতি, অস্ত্র, ধর্মীয় মূর্তি আর আগুন।
-হ্যাঁ, অনেকদিন আগে থেকেই অনেক ভাইকিং আইসল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেছে। তোমাদের আত্মীয়স্বজনও তাদের মধ্যে আছেন।
–ঠিক বলেছো। তাঁরাই এক একজন এক একটি অঞ্চলে রাজ্য স্থাপন করে রাজা হয়েছেন। একটু থেমে মারিয়া বলল–ওসব ইতিহাস থাক। শুধু একজনের কথা বলি। তার নাম ফ্রোকি। তিনি রেভকজাভিক-এ রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। রাজা হলেও তিনি জীবন শুরু করেছিলেন জলদস্যু হিসেবে। রাজা হয়েও জলদস্যুতা ছাড়েননি। দীর্ঘকাল আইসল্যান্ডের দক্ষিণ সমুদ্রে বিদেশী জাহাজ দখল করেছেন। নির্বিচারে লুঠ করেছেন। এই জলদস্যুতা করে তিনি প্রচুর সোনা মণিমাণিক্য পেয়েছিলেন। কবি আরি বলেছেন–রাজা ফ্লোকি সেই সোনা দিয়ে একটা ছোট্ট জাহাজ রৈী করিয়েছিলেন। সেই ছোট্ট জাহাজটি বোঝাই করেছিলেন মণিমাণিক্য দিয়ে। তারপর মণিমাণিক্যসুদ্ধ সেই সোনার জাহাজ যে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন তা কেউ জানে না।
ফ্রান্সিস এতক্ষণ বিছানায় আধাশোয়া হয়ে মারিয়ার মুখে গল্প শুনছিল। মণিমাণিক্যসুদ্ধ সোনার জাহাজের রহস্যের কথা শুনে ও লাফিয়ে উঠে বসল। বলল-দাঁড়াও–দাঁড়াও। সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বলো তো?
–আমি আর নতুন কী বলবো? কবি আরি যা তার বইতে লিখে গেছেন তাই বলছি। মারিয়া বলল।
–বেশ, বলে যাও।
–এই সোনার জাহাজ রাজা ফ্রোকি কেন লুকিয়ে রেখেছিলেন তা কবি আরি সঠিক বলতে পারেননি। তবে অনুমান করেছেন সে সময় নরওয়ে থেকে অনেক ডাইকিং সমুদ্র পেরিয়ে রেভকজাভিক-এ বসবাস শুরু করেছিল। পাছে সেই সোনার জাহাজের কথা ছড়িয়ে পড়ে, পাছে চুরি হয়ে যায় তাই রাজা ফ্লোকি সেই জাহাজটা শুকিয়ে ফেলেছিলেন।
–এই সোনার জাহাজের কথা তখন কি আর কেউ জানতো না।
–কবি আরি এই সম্পর্কে কিছু বলেননি। তবে যে স্বর্ণকার সেই জাহাজের নক্সা তৈরি করেছিল, তৈরি কবি আরি ঘটনাচক্রে তার খোঁজ পেয়েছিলেন। সেই স্বর্ণকারের নাম থরবার্গ। থরবার্গ তখন মৃত্যুশয্যায়।
–আচ্ছা রাজা ফ্লোকি কি তখন বেঁচে ছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
–না। ফারো দ্বীপপুঞ্জের কাছে এক জলযুদ্ধে রাজা ফ্লোকি হঠাৎ মারা যান। মারিয়া বলল।
তাহলে থরবার্গ তো সেই নিখোঁজ সোনার জাহাজ উদ্ধার করতে পারতো। ফ্রান্সিস বলল।
মণিমাণিক্যের জাহাজ–হয়তো পারতো। কিন্তু তার উপায় ছিল না। কারণ তখন থরবার্গ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তার প্রায় বারোধ হয়ে গিয়েছিল। কাউকে সব গুছিয়ে বলে যাবার মত অবস্থা তার ছিল না। তাছাড়া সংসারে থরবার্গের কেউ ছিলও না।
–হুঁ। তারপর? ফ্রান্সিস বলল।
–মূমূর্ষ থরবার্গ কবি আরিকে দিয়েছিল একটু মসৃণ ভেড়ার চামড়া। তার এক পিঠে একটা জাহাজের মুখ নানারঙে আঁকা। অন্য পিঠে একটা ত্রিভুজের মতো আঁকা।
–দাঁড়াও দাঁড়াও–ফ্রান্সিস বলে উঠল–তুমি দেখেছো সেই ছবি আঁকা চামড়াটা?
–হ্যাঁ। কবি আরির ঐ পুরনো বইয়ের মধ্যে আছে।
–বইটা তো রাজবাড়ির গ্রন্থাগারে। ফ্রান্সিস বললো?
–হ্যাঁ?
–আচ্ছা-থরবার্ক ঐ ক্ষুদে জাহাজটার মাপ বলেছিল?
–না। তবে ছবিটায় মাপ লেখা আছে পাঁচ ফুট।
ফ্রান্সিস দ্রুত পায়ে বিছানা থেকে নেমে এল। বলল–তৈরি হয়ে নাও। আমরা এক্ষুণি রাজবাড়ির গ্রন্থাগারে যাবো।
–কী বলছো? সন্ধ্যে হয়ে গেছে। গ্রন্থাগার কখন বন্ধ হয়ে গেছে। মারিয়া বলল।
–তুমি চলো। গ্রন্থাগারিককে অনুরোধ করবো। কিছুক্ষণের জন্য গ্রন্থাগারের মধ্যে যেন যেতে দেন।
