ওরা মাথা নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানিয়ে ধুলোর মধ্যে দিয়ে হেঁটে সুড়ঙ্গের সিঁড়ির কাছে এল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্দিরে এল। দেখল পুরোহিত কোয়েতজাল দেবতার ভাঙা বাঁ হাতটা জোড়া দিচ্ছে।
ফ্রান্সিসের মনে কী হল। ও দেবমূর্তির সামনে এসে মাথা নুইয়ে ভক্তিশ্রদ্ধা জানাল। তারপর তিনজনে মন্দিরের বাইরে এল।
সামনের প্রান্তরে ওদের ঘোড়া বাঁধা ছিল। ওরা সেদিকে চলল। একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা মন্দির থেকে ছুটে এসে ওদের কাছে দাঁড়াল। হেসে ফ্রান্সিসের হাতে একটা ছোট কাপড়ের ঝোলামত দিল। ফ্রান্সিস ঝোলার মুখ খুলে দেখল কিছু মণিমাণিক্য। ফ্রান্সিস ঐ ঝোলাতেই মূর্তিটা রাখল। যোদ্ধাটি বলল–সেই পথপ্রদর্শক। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।
চারজনে ঘোড়ায় উঠল। ফ্রান্সিস ঝোলাটা ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বেঁধে রাখল।
সামনে পথপ্রদর্শক। পেছনে ওরা তিনজন। লাল ধুলো উড়িয়ে ওদের ঘোড়া ছুটল। বিষাক্ত উপত্যকার পাশ দিয়ে যাবার সময় ফ্রান্সিস ঐ দিকে তাকাল। দেখল সেই ধোঁয়াটে ভাব, বেগুনী রঙের ফুল আর মনসা গাছটা। ফ্রান্সিস বলল–জানো হ্যারি ঐ মনসা গাছটাও কাঠের। লোকের চোখে ধূলো দেবার জন্যে ওটা করা হয়েছে।
সামনেই বিস্তৃত প্রান্তর। ঘোড়া ছুটল পূর্বদিক লক্ষ্য করে। গেরুয়া পাহাড়ের উদ্দেশ্যে।
– সমাপ্ত –
মণিমানিক্যের জাহাজ
পথে কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে ফ্রান্সিস, হ্যারি আর শাঙ্কো সারাদিন ঘোড়া ছোটাল। পথপ্রদর্শকটি পাঁচ দিনেই ওদের গেরুয়া পাহাড়ে পৌঁছে দিল। তারপর চলে গেল নিজের দেশে।
গেরুয়া পাহাড়ে ওরা যখন পৌঁছল তখন বিকেল। একটু দূরেই সমুদ্রে জাহাজ ভাসছে। শাঙ্কো একটা ছোট পাথররের ওপর উঠে চিৎকার করে ডেকে বলল–ভাইসব, আমরা এসেছি। জাহাজের ডেক-এ দুতিনজন ভাইকিং দাঁড়িয়েছিল। তারা শাঙ্কোর ডাক শুনল। ফ্রান্সিসদের দেখতে পেল। ওরা চীৎকার চাঁচামেচি করে বাকি বন্ধুদের ডাকাডাকি শুরু করল। ফ্রান্সিসের শরীরের দুর্বলতা তখনও কাটেনি। তার ওপর এত দূর পথ ঘোড়া ছুটিয়ে আসা। ও একটা পাথরের ওপর শুয়ে পড়ল। হ্যারিও বসল ওর পাশে। একটু পরেই কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু এল। দুর্বল ফ্রান্সিসকে দুতিনজন ধরে নিয়ে চলল। পেছনে হ্যারি আর শাঙ্কো। জলে নামতে হলো সবাইকে। কারণ জাহাজে ফেলা কাঠের পাটাতন মাটিপাথর পর্যন্ত আসেনি। ফ্রান্সিসকে কাঁধে করে নিয়ে চলল। পাটাতন দিয়ে হেঁটে চলল।
ফ্রান্সিসরা জাহাজে উঠতেই ওরা কী এনেছে দেখবার জন্যে বন্ধুরা সবাই ওদের ঘিরে ধরল। শাঙ্কো থলে থেকে বের করে কোয়েতজাল দেবতার অতি সুন্দর মূর্তিটা দেখাল। সবাই অবাক। বিস্ময়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল মূর্তিটা। তারপরই চিৎকার করে উঠল—ও-হো-হো। সবাই জানতে চায় সমস্ত ঘটনা। ফ্রান্সিস বলল–আমরা ভীষণ পরিশ্রান্ত। পরে তোমাদের সব বলবো। এবার কিছু খাবার ব্যবস্থা করো। প্রায় উপোস করে আছি।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি কেবিনঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। ওখানেই ওদের খেতে দেওয়া হলো। শাঙ্কো কিন্তু তখনও বেশ সতেজ। ওকে ঘিরে ধরল সবাই। শাঙ্কো বিপুল উৎসাহে ওদের বিষাক্ত উপত্যকার গল্প শোনাতে লাগল।
পরদিন সকালেই জাহাজের নোঙর তোলা হলো। পাল খাটানো হলো। জোর হাওয়া বইছে তখন। পালগুলো ফুলে উঠল। জাহাজ চলল ভাইকিংদের দেশের দিকে।
মাসখানেক পরে জাহাজ ভাইকিংদের রাজধানীর জাহাজঘাটায় ভিড়ল।
তখন সকাল। জাহাজঘাটায় লোকজন কম। কেউ ফ্রান্সিসদের জাহাজ লক্ষ্যই–গল না। কত জাহাজ তো আসে। রাজাকে সংবাদ দিতে একজন ভাইকিংকে পাঠানো হলো। কিছুক্ষণ পরেই গাড়ি চড়ে রাজা, রানী, মারিয়া, মন্ত্রী ও অমাত্যরা এলেন। এইবার জাহাজঘাটায় লোকজন জমতে শুরু করল। অল্পক্ষণের মধ্যেই জনারণ্যের সৃষ্টি হলো। ওদিকে জাহাজে রাজা, রানী, মারিয়া, মন্ত্রী ও অমাত্যরা রূপোর থাম, কোয়েতজাল দেবতার মূতি দেখে সবাই বিস্মৃত হলেন। রাজা ঐ মণিমাণিক্যের জাহাজ জাহাজের ডেকেই বললেন–ফ্রান্সিসরা জাহাজ চুরি করেছিল। ওদের সে অপরাধ আমি মার্জনা করলাম। ফ্রান্সিসের বাবা মন্ত্রীমশাই শুধু মুখে মৃদু শব্দ করলেন–হুম্।
রূপোর থাম দুটো রাখা হলো রাজার জাদুঘরে। ফ্রান্সিসের অনুরোধে রাজবাড়ির সামনের চত্বরের কোণায় তৈরি হলো শ্বেতপাথরের একটা ছোট মন্দিরমতো। তাতে স্থাপিত হলো কোয়েতজাল দেবতার মূর্তি। ফ্রান্সিস আর মারিয়া মাঝে মাঝেই আসে মূর্তি দর্শন করতে। ভক্তি জানাতে।
দিন কাটে। খাওয়া ঘুম। তবে এর মধ্যেই যখন বন্ধুরা আসে তখন ফ্রান্সিসের ভালো লাগে। গল্পগুজবে আড্ডা জমে ওঠে। যে সব অভিযানে ওরা গিয়েছিল সেই সব অভিযানের গল্প হয়। উৎসাহে উদ্দীপনায় চঞ্চল হয়ে ওঠে ওরা। হ্যারি এমনিতেই কম কথা বলে। কিন্তু বিস্কো শাঙ্কোদের উৎসাহ প্রবল। অধৈর্য হয়ে ওঠে ওরা। বলে–চলো ফ্রান্সিস আবার বেরিয়ে পড়ি। ফ্রান্সিস হাসে। বলে–উদ্দেশ্যহীন বেড়িয়ে বেড়ানো আর এই ঘরে বসে থাকা–একই। একটা লক্ষ্য তো চাই। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকায়। বলে–কী হলো হ্যারি? হ্যারি একটু মাথা নেড়ে বলে–দেখা যাক চেষ্টা করে–অভিযানে বেরোবার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় কিনা। বন্ধুদের এই আড্ডায় মারিয়াও আসে মাঝে মাঝে। কিন্তু নতুন অভিযানের ব্যাপারে কোনো কথা বলে না।
