ওরা ধুলোর মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরতে লাগল। তীক্ষ্ণ নজর রাখলো চারদিকে। ফ্রান্সিস মুখে মুখে ছড়ার শেষটুকু আওড়াতে লাগল–এক হাত ধুলিময়। মাঝখানের সিঁড়ির কাছে এসে ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল–হ্যারি–দেখ তো ওটা কী? মশালের আলোয় দেখা গেল ধুলোর মধ্যে থেকে কী যেন একটু উঁচু হয়ে আছে। ফ্রান্সিস ধুলো ঠেলে তাড়াতাড়ি ওখানে এল। দেখল একটা হাত ধুলোয় পোঁতা। হাতের তর্জনীটা ওপরের দিকে উঁচিয়ে আছে যেন কিছু নির্দেশ করছে। ফ্রান্সিস তর্জনীর নির্দেশ লক্ষ্য করল। দেখল তর্জনীটা নির্দেশ করছেওপরে সেই দ্বিতীয় গোল খোঁদলটা। ফ্রান্সিস ঐ দিকে তরোয়াল উঁচিয়ে চীৎকার করে বলল–হ্যারি ঐ যে গুপ্তধন।
–কী করে বুঝলে?
–এই হাতটাই কোয়েতজাল দেবতার ভাঙা বাঁ হাত যেটা আমরা খুঁজছিলাম। একবার ছড়াটা মনে করো
এক হাত ধুলিময়
মুখ নয় কথা কয়
আঙুল তুলে হে–
ঐ দেখ হাতের তর্জনীটা ঐ গোলমত খোঁদলটার দিকেই ইঙ্গিত করছে কিনা ফ্রান্সিস বলল।
তারপর ফ্রান্সিস তরোয়াল কোমরে গুঁজে হাতের কুড়ুলটা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেল। হ্যারি হাত বাড়িয়ে ওকে আটকাল। বলল–যদি কুল চালালে গোল জায়গাটা ভেঙে গিয়ে বিষাক্ত উপত্যকার জল নেমে আসে।
–অসম্ভব। আমি নিশ্চিত ওখানেই রয়েছে গুপ্তধন।
–বেশ–সবাই একসঙ্গে উঠবো। একসঙ্গেকুল চালাবো। মরতে হয় তিনজন একসঙ্গে মরবো। হ্যারি বলল।
–আমরা মরবো না হ্যারি। ফ্রান্সিস বলল।
–না। বারিনথাসের ভয়াবহমৃত্যু আমরা দেখেছি। তোমরাও যদি-না ফ্রান্সিস–যা করবার একসঙ্গে করবো। ্যরি বলল।
সিঁড়িটা প্রশস্ত নয়। তিনজন কোনরকমে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে উঠতে লাগল। গোলমত খোঁদলটার কাছে উঠে এল। শাঙ্কো হাতের মশাল পাথরের খাঁজে আটকাল। তারপর তিনজন একসঙ্গে ঐ জায়গায় কুড়ুলের ঘা দিল। পাথর কুচি ঝরে পড়ল ওদের মাথায় গায়ে। আবার কুড়ুল চালাল। আবার পাথর কুচি ঝরে পড়ল। তারপর হ্যারি ও শাঙ্কো কিছু বোঝার আগেই ফ্রান্সিস দেহের সমস্ত শক্তি একত্র করে হঠাৎ সজোরে ও জায়গাটায় কুড়ুলের ঘা মারল। ওর কুড়ুলের ফলাটা কীসের মধ্যে ঢুকে গেল। ফ্রান্সিস বলে উঠল-হ্যারি, যেটাকে পাথর বলা হয়েছে সেটা আসলে পাথর নয়। খুব সম্ভব কাঠ আর সেটা রাখা হয়েছে ঠিক বিষাক্ত উপত্যকার মাঝখানে।
আবার তিনজনে কুড়ুল চালাল। কুড়ুলের ফলা বসে যেতে লাগল। ভেঙে পড়ল কাঠের টুকরো। ফুটো হয়ে গেল আর সেখান থেকে গড়িয়ে পড়তে লাগল হীরে মোতি চুনী পান্না–দামী দামী সব পাথরের টুকরো। ফ্রান্সিস চীৎকার করে বলল–হ্যারি প্রথম কালহুয়াকান রাজার গুপ্তধন। এবার তিনজনেই উৎসাহের সঙ্গে কুড়ুল চালাতে লাগল। কাঠ কেটে কঁকটা বড় হল। ঝর ঝর করে হীরের টুকরো, পান্না চুনী সোনার চাকতি পড়তে লাগল। সিঁড়িতে জমা হতে লাগল সেসব। হঠাৎ গড়িয়ে পড়ল কোয়েতজাল দেবতার দুফুটের মত উঁচু একটা সোনার মূর্তি। মূর্তির দুচোখ দামী পাথরের। সারা গায়ে হীরে মণিমাণিক্য বসানো। মন্দিরে যে মূর্তি আছে অবিকল তেমনি দেখতে এই মূর্তি। ফ্রান্সিস মূর্তিটায় হাত দিল না। ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপার। রাজা হুয়েমাক হয়তো বিধর্মী মূর্তি স্পর্শ করেছে বলে মনঃক্ষুণ্ণ হতে পারেন।
ফ্রান্সিস বলল–আর কাটার দরকার নেই। শাঙ্কো–রাজা হুয়েমাককে গিয়ে সব বলো। উনি যেন জনাকয়েক ননোয়াক্লা যোদ্ধা নিয়ে এখানে আসেন। শাঙ্কো চলে গেল। ফ্রান্সিস মণিমাণিক্য ছড়ানো সিঁড়ির ওপর বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পরে রাজা হুয়েমাক এলেন। সঙ্গে কয়েকজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা। ফ্রান্সিস সিঁড়ি থেকে নেমে এল। রাজা হুয়েমাক অবাক হয়ে দেখতে লাগলেন সিঁড়িতে ছড়ানো মণিমাণিক্য। ফ্রান্সিস বলল–মহামান্য রাজা–আমরা বিধর্মী তাই কোয়েতজাল দেবতার ভাঙা বাঁ হাত, এই মূর্তি দুইনি। এবার আপনি যা করার করুন।
রাজা হুয়েমাক ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরলেন। আনন্দে তার চোখে জল এসে গেল। অরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন–সাবাস ফ্রান্সিস।
রাজা যযাদ্ধাদের নির্দেশ দিলেন ওপরের কাঠের আস্তরণ সব ভেঙে ফেলতে। একজনকে বললেন কাপড়ের বস্তা আনতে। যোদ্ধারা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। কাঠের আস্তরণ কুড়ুল চালিয়ে ভাঙতে লাগল। আরো মণিমাণিক্য হীরে চুনী পান্না পড়তে লাগল। যোদ্ধাটি কাপড়ের বস্তা নিয়ে ফিরে এল। কাপড়ের বস্তায় সব ভরা হতে লাগল।
ফ্রান্সিস বলল–মহামান্য রাজা–আমাদের কাজ শেষ। এবার আমরা গেরুয়া পাহাড়ে যাবো। সেখান থেকে জাহাজে। আপনি এক জন পথপ্রদর্শক আমাদের সঙ্গে দিন।
–নিশ্চয়ই। রাজা আস্তে আস্তে সিঁড়ির কাছে গেলেন। কোয়েতজালের ছোট মূর্তিটা তুলে নিলেন। তারপর মুর্তিটা ভালো করে দেখলেন। ফ্রান্সিসের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন–ফ্রান্সিস এই দেবমূর্তি তোমাদেরই প্রাপ্য। নাও।
ফ্রান্সিস বুঝে উঠতে পারলো না কী করবে। ও হ্যারি আর শাঙ্কোর দিকে তাকাল। হ্যারি বলল–নাও ফ্রান্সিস। এ তো সম্মানের। ফ্রান্সিস মূর্তি নিয়ে হাত দিয়ে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। রাজা হেসে বললেন–তলতেক জাতির উপাস্য দেবতার মূর্তি। এ মূর্তিকে কখনো অপবিত্র করো না। দেশে ফিরে কোন পবিত্রস্থানে এই দেবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করো।
–নিশ্চয়ই করবো। ফ্রান্সিস বলল। তারপর বলল–মহামান্য রাজা–আমাদের কাজ শেষ। আমরা যাচ্ছি।
