-ঐ গুপ্তধনের ওপর আমার কোন লোভ নেই।
–তা জানি। কিন্তু প্রথম রাজা কালহুয়াকানের বংশধর হিসেবে ঐ গুপ্তধন আপনারই প্রাপ্য।
-ঠিক আছে। দেখ যদি খুঁজে বের করতে পার। রাজা বললেন।
–আমরা ঠিক গুপ্তধন আবিষ্কার করতে পারবো। তবে একটা অনুরোধ আপনি তো এখন সুস্থ। আপনি তুলাতে আসুন এটাই আমরা চাই।
–বেশ। স্রোমের শাসনভার নিলে তুলাতে তো আমাকে যেতেই হবে। রাজা বললেন।
রাজাকে সম্মান জানিয়ে ফ্রান্সিস চলে এল।
পরদিন রাজা কালহুয়াকানের মন্ত্রী তুলা থেকে এলেন। রাজা হুয়েমাক রাজ্যের শাসনভার গ্রহণে সম্মতি জানালেন। বললেন পরদিন সকালে তিনি তুলায় যাবেন। তার সঙ্গে যাবে শুধু ছজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা আর তিনজন বিদেশী বন্ধু। কোন রকম জাঁকজমক যেন করা না হয়। তিনি প্রথমে তুলার কোয়েতজাল মন্দিরে যাবেন। পূজা দেবেন। তুলার অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন। তারপর সিংহাসনে বসবেন।
পরদিন সকালে রাজা হুয়েমাক রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন। একটা সুসজ্জিত ঘোড়াতে উঠলেন। দুপাশে তিনজন করে ননোয়াক্লা অশ্বারোহী যোদ্ধা রইল। পেছনে তিনটে ঘোড়ায় ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কো।
রাজা হুয়েমাককে সামনে রেখে যাত্রা শুরু হল। রাজা খুবই সাধারণ পোশাক পরেছেন। দেহে কোন অলংকার নেই। শুধু মাথায় গোঁজা পাখির পালকগুলো যা জমকালো। প্রান্তর পোড়া বন পেরিয়ে রাজাকে নিয়ে সবাই এল পুয়েবেলা নদীর সেতুর কাছে। সবাই ঘোড়া থেকে নামল। ঘোড়াগুলো হাঁটিয়ে পার করানো হল। তারপরই স্ত্রোমো রাজ্য। মন্ত্রী ও কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে অপেক্ষা করছিলেন। তারা মাথা নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানালেন। তারপর রাজার পেছনে পেছনে চললেন তুলার দিকে।
তুলায় প্রবেশের মুখে দাঁড়িয়েছিল নানারঙের পোশাক পরা কয়েকটি মেয়ে। তারা রাজাকে সম্মান জানিয়ে অনেক ফুল ছড়িয়ে দিল। একদল পুরুষ কাছিমের খোলের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নেচে নেচে চলল।
কোয়েতজাল মন্দিরের সামনে এসে সবাই ঘোড়া থেকে নামল। পুরোহিত মন্দিরের সিঁড়ির ওপরই দাঁড়িয়েছিল। সে ফুল ফল ছড়িয়ে জোরে জোরে কী আওড়াতে লাগল। রাজা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। পুরোহিত থামল। রাজা মন্দিরে ঢুকলেন। বুনো ফল, ফুল পাতা দিয়ে কোয়েতজালের পুজো করলেন। তারপরে বাইরে এসে দাঁড়ালেন মন্দিরের সিঁড়ির মাথায়। ততক্ষণে সামনের প্রান্তরে তুলার অধিবাসীদের ভীড় জমে গেছে। অধিবাসীরা অনেকেই মুখে থাবড়া দিয়ে শব্দ করে আনন্দ প্রকাশ করেছিল।
রাজা হুয়েমাক দুহাত ওপরে তুললেন। সব কোলাহল বন্ধ হয়ে গেল। রাজা হুয়েমাক হাত নামিয়ে বলতে লাগলেন-আমার প্রিয় সন্তানতুল্য প্রজাগণ–এই দেশের শাসনভার আমি এইজন্যে নিলাম যাতে আরো মানুষের মঙ্গল আমি করতে পারি। দুটো নির্দেশ আমার–কয়েদঘর বলে এখানে কিছু থাকবে না। যেটা আছে। সেটা হবে মেয়েদের তাঁতঘর। দুই–কোয়েতজালের মন্দিরে নরবলি প্রথা আমি বন্ধ করে দিলাম। কোয়েতজাল শুধু মৃত্যুর দেবতা নয় জীবনেরও দেবতা। মূল্যবান সম্পদ, খ্যাতি যশ, রাজ্যজয়, সম্মান, প্রতিপত্তি এসব নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র ভাবি না। আমার চিন্তা একটাই–প্রজাদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যবিধান, আর দেশের উন্নতি। রাজার কথা শেষে তুলার অধিবাসীরা আনন্দধ্বনি দিল।
তারপর রাজা হুয়েমাক ফ্রান্সিসদের ও মন্ত্রী গণ্যমান্যদের নিয়ে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন।
রাজা হুয়েমাক সিংহাসনে বসলেন। দুপাশে মোটা নক্সাকরা কাপড়বিছানো কাঠের আসনে বসলেন আগের মন্ত্রী আর তুলার : গণ্যমান্যরা।
ফ্রান্সিসরা রাজার সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস রীতিমাফিক শ্রদ্ধা। জানিয়ে বলল–মহামান্য রাজা আমাদের জাহাজে ফেরার সময় হয়েছে। এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। এখন আমরা প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তভাণ্ডার খুঁজতে যাচিছ। আপনি অনুমতি দিন।
–বেশ যাও। প্রয়োজন হলে আমার যোদ্ধাদের নিয়ে যেতে পারো?
–তার দরকার হবে না।
ফ্রান্সিসরা রাজসভা থেকে চলে এল। প্রাসাদের বাইরে এসে চলল কোরেতজালের মন্দিরের দিকে। মন্দিরে ঢুকে মূর্তির পেছনে এল ওরা। দেখল আগের মতই পাথর সরানো আছে। কেউ সুড়ঙ্গপথের মুখ বন্ধ করেনি। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো, মশাল নাও। শাঙ্কো মন্দির থেকে দুটো জ্বলন্ত মশাল নিয়ে এলো।
মশালের আলোয় সিঁড়ির পথ দেখে দেখে ওরা আস্তে আস্তে নাল। নীচে সিঁড়ির কাছে তিনটি কুড়ুল পাওয়া গেল। রাজা কালহুয়াশনের সৈন্যরা সেদিন পালাবার সময় ফেলে গেছে। ফ্রান্সিস দুটো কুণ্ডুল হাতে নিল। আর একটা দিল হ্যারিকে।
ধুলোভরা পাথুরে মেঝে দিয়ে ওরা আস্তে আস্তে এগোতে লাগল। দেখল প্রথম খোঁদলটা থেকে বিষাক্ত জল ফোঁটা ফোঁটা পাথরের সিঁড়িটির ওপর পড়ছে। বারিনথাসের মৃতদেহ নেই। হয়তো বিষাক্ত জলে, গলে গেছে। হয়তো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বিষাক্ত জল বা সিঁড়ি গড়িয়ে আসছে তাই নীচের ধুলোয় শুষে যাচ্ছে।
হাঁটতে হাঁটতে ওরা দ্বিতীয় খোঁদলটার কাছে এল। মাথা উঁচু করে ফ্রান্সিস দেখল সেই একই রকম খোঁদল। পাথরের সিঁড়ি খোঁদল পর্যন্ত উঠে গেছে। হেঁটে হেঁটে তৃতীয় খোঁদলের কাছে এল। সেই একই রকম খোঁদলটা পর্যন্ত পাথরের সিঁড়ি উঠে, গেছে। ফ্রান্সিস বলল–এবার ফিরবো। শেষ সমাধান এখনও বের করতে পারিনি। কিন্তু সেই সমাধান এখানেই পাবো। তোমরা পাথরের ছাত দেয়াল মেঝের দিকে ভালো করে নজর রাখো। মুর্তির ভাঙা বাঁ হাতটা এখনো পাইনি। আস্তে আস্তে ফিরে চললো। ভাঙা বাঁ হাতটা পেতেই হবে।
