পরদিন ভোরেই খবর রটে গেল যে রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যরা আক্রমণ করতে আসছে। ননোয়াক্লা যযাদ্ধাদের মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। কয়েকজন যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের ঘরের সামনে এসে ডাকাডাকি করতে লাগল। ফ্রান্সিসরা উঠে পড়ল। বাইরে এসে শুনল আক্রমণের কথা।
ফ্রান্সিস হ্যারি তরোয়াল নিল। শাঙ্কো নিল তীরধনুক। ওরা প্রান্তরে এসে দাঁড়াল। ননোয়াক্লা যোদ্ধারাও ততক্ষণে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
পোড়া বনের ছাই উড়িয়ে কিছুক্ষণ পরেই কালহুয়াকানের সৈন্যরা ঘোড়া ছুটিয়ে এসে পড়ল। প্রান্তরে আসতেই শুরু হল লড়াই। ওরা সংখ্যায় বেশি ছিল না। ওরা হয়তো ভেবেছিল ওদের দেশের অন্য সৈন্যদেরও এখানে পাবে। এসেই দেখল ওদের দেশের একজন সৈন্যও নেই। ওরা বেশ দমে গেল। ননোয়াক্কা সৈন্যরা মরণপণ লড়াই করতে লাগল। শাঙ্কো তীর ছুঁড়ে একটার পর একটা শত্রু সৈন্যকে ঘায়েল করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা হার স্বীকার করল। জনাদশেক বন্দী হল। বেশ কিছু মারা গেল। বাকীরা ঘোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে গেল। চোলুলার অধিবাসীরা যুদ্ধজয়ের আনন্দে চীৎকার হৈ-হল্লা শুরু করল।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাজা হুয়েমাক যুদ্ধজয়ের সংবাদ শুনলেন। কোয়েতজাল দেবতাকে স্মরণ করে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করলেন।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিস বলল–চলো–রাজা হুয়েমাকের সেই সিন্দুকটা খুঁজতে হবে।
ওরা পোড়া বনের কাছে এল। ফ্রান্সিস ঠিক যেখান দিয়ে রাজা হুয়েমাক ঢুকেছিল সেই জায়গাটা লক্ষ্য করল। সেখান দিয়েই ফ্রান্সিস ঢুকল। পেছনে হ্যারি শাঙ্কো আর কয়েকজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা।
পোড়া বনের মধ্যে কিছুটা গেল ওরা। ফ্রান্সিস প্রত্যেককে একটা করে পোড়া গাছের ভাঙা ডাল নিতে বলল। তাই দিয়ে ছাইয়ের গাদা সরিয়ে সরিয়ে সবাই সেই সিন্দুকটা খুঁজতে লাগল। এক জায়গায় ছাই সরিয়ে হ্যারিই প্রথম দেখতে পেল সিন্দুকটার পুড়ে যাওয়া কোণাটা। হ্যারি চীৎকার করে ডাকল–ফ্রান্সিস এই যে সিন্দুকটা। সবাই ছুটে এল। দেখল সিন্দুকটা সবটা পুড়ে যায়নি। আধ-পোড়া অবস্থায় পড়ে আছে। তবে দেখা গেল ফ্রান্সিস যা বলেছিল তাই হয়েছে। সোনা রূপার অলঙ্কার চাকতি সব গলে সিন্দুকটার গায়েই লেপ্টে আছে। মণিমুক্তোগুলো কালচে হয়ে গেছে। কিন্তু হীরের কোন চিহ্ন দেখা গেল না। ফ্রান্সিসরা ঐ অবস্থাতেই পোড়া সিন্দুকটায় যতগুলি মণি-মুক্তো দামী পাথর ভরল। গলিত সোনা রূপোর পাত কটা হাতে নিল। সব নিয়ে চোলুলায় ফিরে এল ওরা। তারপর রাজপ্রাসাদে রাজার শয়নকক্ষে ঢুকল। রাজাকে সব জিনিস ফ্রান্সিস দিয়ে দিল। রাজা খুশীই হলেন।
দিন সাতেক কেটে গেল। রাজা হুয়েমাক অনেকটা সুস্থ হলেন। রাজা কালহুয়াকান মারা গেছেন। তুলায় এখন রাজা কালহুয়াকানের এক মন্ত্রী শাসনকার্য চালাচ্ছেন। সেদিন তিনি রাজা হুয়েকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চোলুলায় এলেন। রাজা হুয়েমাককে সবিনয়ে অনুরোধ করলেন স্ত্রোমো দেশের শাসনভার গ্রহণ করতে। রাজা হুয়েমাক জানালেন তিনি চোলুলার প্রজাদের নিয়েই আনন্দে থাকতে চান। নতুন রাজ্যভার নিতে তাঁর কোন আগ্রহ নেই। মন্ত্রীই যেন শাসন করবার দায়িত্ব নেন। মন্ত্রী দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করলেন। তিনি বারবার বলতে লাগলেন স্রোমের রাজা হতে পারে একমাত্র প্রথম কালহুয়াকানের বংশধররাই। সুতরাং রাজা হুয়েমাকই বংশধর হিসেবে রাজা হওয়ার উপযুক্ত। এবার রাজা হুয়েমাক দ্বিধায় পড়লেন। ভেবে পেলেন না কী বলবেন। তাই তিনি বললেন মন্ত্রী যেন দিন কয়েক পরে আসেন। রাজা হুয়েমাক এর মধ্যে ভেবেইতিকর্তব্য স্থির করলেন।
সেদিন সন্ধেবেলা রাজা হুয়েমাক ফ্রান্সিসকে ডেকে পাঠালেন। ফ্রান্সিস রাজপ্রাসাদে এল। রাজা হুয়েমাক কালহুয়াকানের মন্ত্রীর সব কথা বললেন। ফ্রান্সিস বলল–আপনি অবশ্যই স্রোমোর শাসনভার গ্রহণ করুন।
–কী লাভ? এই তো বেশ আছি। রাজা বললেন।
–না মহামান্য রাজা–আপনার মত প্রজাবৎসল মহান মানুষকে ওরা রাজা হিসেবে পেলে ওরা ধন্য হয়ে যাবে। আমরা য়ুরোপীয়রা সভ্য বলে গর্ব করি কিন্তু আমাদের য়ুরোপেও আপনার মত রাজা খুব কমই আছে।
-কিন্তু চোলুলার কী হবে? রাজা বললেন।
–চোলুলাকেও স্রোমো রাজ্যের মধ্যে নিয়ে নিন। রাজধানী স্থাপন করুন তুলাতে। দুদেশের প্রজাই তো এক। তলতেক ভাষাও। কোন অসুবিধের কারণ নেই। আপনার সুশাসনে তলতেক জাতি আরও সভ্য হোক উন্নত হোক। এটা কি আপনিও চান না? ফ্রান্সিস বলল। রাজা হুয়েমাক ফ্রান্সিসের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন-বেশ ওদেশের মন্ত্রীকে সে কথাই বলবো।
–মহামান্য রাজা–আমার কয়েকটা কথা বলার আছে?
–বলো। তুলার বিষাক্ত উপত্যকার নীচে প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তধনের খোঁজ আমরা পেয়েছি।
-বলো কি। রাজা আশ্চর্য হয়ে বললেন–কতকাল ধরে ঐ গুপ্তধনের সন্ধ ন চলছে আর তুমি তার খোঁজ পেয়ে গেছো?
–হ্যাঁ–যাজক ব্ৰেণ্ডনের একটা ছড়ার মধ্যে সাংকেতিক নির্দেশ ছিল। আমি তার সাহায্যেই এগিয়েছি। এখন মাত্র একটা সংকেত বাকি। আমি নিশ্চিত সেই সংকেতের অর্থ বার করতে পারবো যদি আপনি আমাদের অনুমতি দেন। ফ্রান্সিস বলল।
