দুপুর হল। বৃদ্ধ লোকটি খাবার নিয়ে এল। খাবার খেয়ে আবার সবাই কাজ শুরু করল।
বিকেলের আগেই ওরা পোড়া বনের প্রায় শেষে পৌঁছে গেল। কিন্তু আর পাথর নেই। ভাঙা বাড়ির পাথর শেষ হয়ে গিয়েছিল আগেই। এখান ওখান থেকে আরো পাথর জোগাড় করেছে, কিন্তু আর ভাঙা পাথর পাওয়া যাচ্ছে না। ফ্রান্সিস হেঁটে হেঁটে শেষ পর্যন্ত এল। ভালো করে দেখল আর একটুখানি গেলেই পোড়া বন শেষ। ও দেখল এখানকার আগুন নিভে গেছে। রাজা হুয়েমাক ওদের কাঁচা চামড়ার জুতো মত দিয়েছিল। ফ্রান্সিসের পায়ে সেই জুতো। ও পোড়া পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে বাকিটুকু পেরিয়ে গেল। ফ্রান্সিসের দেখাদেখি হ্যারি শাঙ্কো আর আহত যোদ্ধারাও বাকিটুকু হেঁটে পার হয়ে গেল।
এবার ফ্রান্সিসরা চলল রাজা হুয়েমাকের খোঁজে। পুয়েবেলা নদীর সেতু পেরিয়েই দেখল প্রজাদের নিয়ে রাজা বসে আছেন।
ফ্রান্সিসদের দেখে রাজা হুয়েমাক বেশ আশ্চর্য হলেন। ওরা আগুনে পোড়া বন পার হল কী করে। সব আগুন তো এত তাড়াতাড়ি নিভে যাবার কথা না? রাজা হুয়েমাক কিন্তু ভীষণ খুশী হলেন। উঠে দাঁড়ালেন। ফ্রান্সিসরা কাছে আসতেই ফ্রান্সিসকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রাজার ছেঁড়া পোশাকে তখনও ধুলো রক্ত লেগে রয়েছে। হ্যারি শাঙ্কো যোদ্ধারা সবাই মাথা নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানাল। রাজা বললেন–ফ্রান্সিস তোমরা পোড়া বন পেরিয়ে এলে কী করে?
–পাথর ফেলে ফেলে পাথরের ওপর হেঁটে হেঁটে পার হয়েছি। আপনাদেরও সেভাবেই পার হতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ফ্রান্সিস বলল।
–কেন?
রাজা কালহুয়াকানের কিছু সৈন্য হয়তো তুলায় আছে। ওরা রাজার খোঁজে এদিকে আসতে পারে। যে কোন মুহূর্তে। কাজেই আর দেরী করবেন না। আপনি প্রজাদের সেভাবেই নির্দেশ দিন। এদিকে ফ্রান্সিসদের আসতে দেখে সবাই এদের ঘিরে দাঁড়িয়েছে। রাজা হুয়েমাক সকলের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বললেন, পোড়া বন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে পার হতে। রাজার কথা শেষ হতে সবাই ছুটল পোড়া বনের দিকে। সবার আগে বাচ্চা কোলে মায়েদের তারপর স্ত্রীলোকেরা, বাচ্চারা, বৃদ্ধবৃদ্ধারা রওনা হল। যোদ্ধারা গেল তারপর। সবশেষে রাজা ও ফ্রান্সিসরা।
ওরা বনের মাঝামাঝি এসেছে তখনই দেখল দক্ষিণ দিক থেকে ধূলো উড়িয়ে একদল অশ্বারোহী ছুটে আসছে। বোঝাই গেল কালহুয়াকানের যে সৈন্যরা তুলাতে ছিল তারাই রাজার খোঁজে এসেছে। সৈন্যদল পুয়েবেলা সেতুর কাছে এসে দাঁড়াল। এবার একটা একটা করে ঘোড়া হাঁটিয়ে পার করতে হবে। ওরা বোধহয় সেইজন্যেই তৈরী হতে লাগল। ওরা তখনও জানে না রাজা কালহুয়াকান তার সমস্ত সৈন্যসহ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বোঝা গেল ফ্রান্সিসদের আশঙ্কাই সত্য।
সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল। সবাই একে একে চোলুলা নগরে ফিরল। আহত রাজা হুয়েমাক এত অত্যাচার দুশ্চিন্তা পরিশ্রম সহ্য করতে পারলেন না। রাজপ্রাসাদের প্রবেশ করবার আগেই পাথরের সিঁড়ির ওপর প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি রাজাকে ধরে ফেললেন। প্রায় অচেতন রাজাকে সিঁড়ির ওপর শুইয়ে দিল। হ্যারিকে বলল–শিগগির রাজবৈদ্যকে ডেকে আনে। হ্যারি কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর রাজবৈদ্যকে পেল। তার হাত ধরে টেনে সঙ্গে আসার জন্যে ইঙ্গিত করল। রাজবেদ্য এল। প্রায় অচেতন রাজার কাছে বসল। পুঁটুলি থেকে ওষুধপত্র বের করল। রাজার কাঁধের ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিল। রাজার কাছেই বসে রইল। ওদিকে রাজা হুয়েমাকের প্রজারা যে যার লুঠ হয়ে যাওয়া বাড়িতে ফিরল। চীনেমাটির বাসনকোসন যা পেল জড়ো করল। শুকনো কাঠ দিয়ে উনুন ধরিয়ে রাতের রান্না শুরু করল। পুরো একটা রাত আর একটা দিন উপবাসী হয়েছে। সবাই ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজা হুয়েমাক একটু সুস্থ হলেন। উঠে বসলেন। ফ্রান্সিসরা রাজাকে ধরাধরি করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে এল। শয়নঘরে এনে রাজাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। পাহারাদার দুজন সৈন্যকে ঐ ঘরে রেখে ফ্রান্সিসরা নিজেদের ঘরে চলে এল।
রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিস রাজার খোঁজ নিতে গেল। দেখল রাজা ঘাস আর পালকের বিছানায় বসে আছেন। তানেকটা সুস্থ এখন। ফ্রান্সিসকে দেখে হেসে বললেন–তোমাদের কাছে আমি আর আমার প্রজারা চিরকালের জন্যে ঋণী রইলাম। ফ্রান্সিস বলল–ওসব থাক। একটা জরুরী কথা আপনাকে বলতে এসেছি। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–আপনার প্রাসাদ থেকে রাজা কালহুয়াকান একটা কাঠের সিন্দুমত নিয়ে যাচিছল। কী ছিল ঐ সিন্দুকে? রাজা শাবরে বললেন–জানতাম, আমার ঐ মী অলঙ্কার হীরে মুক্তো কালহয়াকান লুঠ করে নিয়ে যাবেই।
–-কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস নিয়ে যেতে পারেনি। এখন ঐ সিন্দুক নিশ্চয়ই বনের মধ্যে পড়ে রয়েছে। হয়তো সোনা রূপার অলংকার সব আগুনের তাপে গলে গেছে। তবে হীরে মুক্তো দামী পাথর এসব নিশ্চয় রয়েছে। ফ্রাসিস বলল।
–কী হবে ওসব অলঙ্কার মণিমুক্তো দিয়ে। রাজা বললেন।
–ও কথা বলবেন না। ফ্রান্সিস বলল–ভবিষ্যতে আপনার প্রজাদের দলের জন্যে প্রয়োজন পড়বে।
–ও কি আর উদ্ধার করা যাবে?
–কেন যাবে না। আমরাই উদ্ধার করবো। ফ্রান্সিস বলল?
–বেশ-দেখ চেষ্টা করে। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিস ঘরে ফিরে এল। রাত একটু বাড়তেই চোলুলার অধিবাসীদের আনন্দ গান নাচ হৈ হল্লা শুরু হল। ওরা বোধহয় ভাবতেও পারেনি এভাবে বন্দী জীবন থেকে, অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচবে। ফ্রান্সিসরা দরজায় দাঁড়িয়ে মশালের আলোয় আলোকিত প্রান্তরে চোলুলার অধিবাসীদের নাচ দেখতে লাগল। গান শুনতে লাগল।
