রাজা হুয়েমা সেতুর কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার প্রজাদের নিয়ে। সবাই অবাক চোখে বনের মাথায় ধোঁয়া আগুন দেখতে লাগল। রাজা হুয়েমাক ধোঁয়া উঠতে দেখে আগেই বুঝেছিলেন শুকনো বনে আগুন লেগেছে। আরো বুঝলেন ফ্রান্সিসই আগুন লাগিয়েছে আর এইজন্যেই তাকে চিঠি দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিল। রাজা মৃদু হেসে মনে মনে ফ্রান্সিসকে অজস্র ধন্যবাদ জানালেন।
আগুন বনের দুদিকে অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল। এই পুয়েবেলা নদীর সেতুর কাছে দাঁড়িয়েও বন্দী আর চোলুলার লোকজনদের গায়ে আগুনের উত্তাপ এসে লাগল। রাজা হুয়েমাক চেঁচিয়ে বললেন–সেতুর ওপারে চলো। সবাই সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে ওপারে চলে গেল। একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা এরমধ্যেই দাঁত দিয়ে কামড়ে হাতের বাঁধা দড়ি ছিঁড়ে ফেলেছিল। সে ছুটে রাজার হাতের বাঁধা দড়ি খুলে দিল। রাজা নিজেই তখন যোদ্ধাদের হাতের বাঁধন খুলে দিতে লাগলেন। সব বন্দীরা মুক্ত হল। সবাই ওখানেই পাথরে মাটিতে বসে পড়ল। জ্বলন্ত বনের দিকে তাকিয়ে রইল।
সন্ধে হল। কিন্তু জ্বলন্ত বনের আগুনের আভায় বহুদূর দিনের আলোর মত পরিষ্কার দেখা যেতে লাগল।
বনের আগুন থেকে মাত্র দুজন সৈন্য পালিয়ে আসতে পেরেছিল। একজন বনের বাইরে এসেই মুখ থুবড়ে পড়ে মারা গেল। অন্যজন মাটিতে শুয়ে রইল মড়ার মত। তারও বাঁচার আশা নেই।
ওদিকে ফ্রান্সিস, হ্যারি আর শাঙ্কো বনের ধার থেকে সরে এসে প্রান্তরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস সেই ভীষণ অগ্নিলীলার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল–এই আগুন থেকে একজনেরও বাঁচার আশা নেই। আমাদের ওপর রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যদের পশুর মত অত্যাচারের প্রতিশোধ তাহলে নিতে পারলাম। উফ–আমার ঘুম পাচ্ছে চলো।
ফ্রান্সিসরা ঘরে ফিরে এল। ফ্রান্সিসের শরীরের দুর্বলতা তখনও কাটেনি। ও ঘরে ঢুকেই বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং একটুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। গত রাতে কারোর ঘুম হয়নি। হ্যারি আর শাঙ্কোও শুয়ে পড়ল।
রাত বাড়তে লাগল। বনের আগুনের তেজও কমে আসতে লাগল। শেষ রাতের দিকে আগুন অনেকটা স্তিমিত হয়ে এল।
ওদিকে রাজা হুয়েমাক তার প্রজাদের নিয়ে পুয়েবেলা নদীর সেতুর ওপাশে বসে রইলেন। আগুনে পোড়া বনের ওপর দিয়ে চোলুলায় ফেরা অসম্ভব। সারারাত কাটল।
ভোর হল। ঘুম ভেঙে গেছে। তখনও ফ্রান্সিস শুয়ে ছিল। হ্যারি ডাক–াণিন-কী করবে এখন?
–রাজা শোক আর তার প্রজাদের চোলুলায় ফিরিয়ে আনবো। কিন্তু বনে আগুন এখনও সম্পূর্ণ নেভেনি। বন ঘুরে আসতে গেলে বহু দূর ঘুরে আসতে হবে। নিদ্রাহীন ক্ষুধার্ত মানুষগুলো কি পারবে? হ্যারি বলল।
এর মধ্যে বৃদ্ধ লোকটি ওদের খাবার দিয়ে গেল। খেয়েদেয়ে ফাঁসিস উঠে দাঁড়াল। বলল-চলো, আগুনের অবস্থাটা দেখে আসি।
তিনজনে ঘরের বাইরে এল। চলল আগুনে পোড়া বনের দিকে। বনের কাছে এসে দেখল তখনও বনের কোন কোন জায়গা থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। কিন্তু কিছু পোড়া কালো গাছ তখনও দাঁড়িয়ে আছে। মাটির ওপর স্থূপাকার শুকনো পাতা পুড়ে গেছে। কিন্তু তখনও ওসব জায়গায় ধিকি ধিকি আগুন জ্বলছে। কী করে পোড়া বন পার হওয়া যায়? কী করেই বা রাজা হুয়েমাকের কাছে যাওয়া যায়? শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস রাজা হুয়েমাকের আর তার প্রজাদের বিপদ কিন্তু এখনও কাটেনি।
–ও কথা বলছো কেন? হ্যারি জিজ্ঞাস করল।
–ভেবে দেখ–রাজা কালহু যাকান হয়তো সমস্ত সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করতে আসেনি। কিছু সৈন্য রাজধানী তুলাতে হয়তো রয়েছে। তারা আগুনের খবর পেয়েছে নিশ্চয়ই। এর মধ্যে তারা রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যদের কী হল নিশ্চয়ই জানতে আসবে। ওরা সশস্ত্র হয়েই আসবে। পুয়েবেলা সেতুর কাছে নিশ্চয়ই রাজা হয়ে মাক ও তার নিরস্ত্র সৈন্য লোকজনদের দেখবে। তখন তারা আক্রমণ করলে কেউ বাঁচবে না। ফ্রান্সিস মন দিয়ে শাঙ্কোর কথাগুলো শুনল। বলল–তুমি ঠিক বলেছো। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজা হুয়েমাক আর তার প্রজাদের এখানে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু কী করে? হ্যারি এতক্ষণ একটা ভাঙা পাথরের বাড়ির দিকে তাকিয়েছিল। হঠাৎ ওর মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেল। ও বলল–আচ্ছা ফ্রান্সিস–একটা কাজ করলে হয় না? ঐ ভাঙা বাড়িটা থেকে পাথরের টুকরো এনে যদি পোড়া বনের মধ্যে পেতে আমার এগিয়ে যাই তাহলে বনের শেষে পৌঁছোতে পারবো না? ভেবে দেখ পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে আমাদের পা পোড়ার কোন ভয় নেই। রাজা হুয়েমাক আর তার প্রজারাও ঐ পাথরের ওপর পা রেখে চলে আসতে পারবে। ফ্রান্সিস হেসে বলল-সাবাস হ্যারি। হ্যাঁ এটা সম্ভব। তবে ঐ ভাঙা বাড়িতে যত পাথরের খণ্ড পাবো তাতে কি সবটা বন পেরুনো যাবে?
-কাজটা তো শুরু করি–এগিয়ে তো যাই তারপর দেখা যাবে। হ্যারি বলল।
তিনজনেই কাজে লেগে পড়ল। ফ্রান্সিস বনের ধারে দাঁড়াল। শাঙ্কো ভাঙা বাড়িটা থেকে পাথরের খণ্ড তুলতে লাগল। দিতে লাগল হ্যারির হাতে। হ্যারি সেটা এনে ফ্রান্সিসকে দিতে লাগল। ফ্রান্সিস পোড়া বনের মধ্যে সেগুলো পাততে লাগল। ফাঁক ফাঁক করে। তারপর পাতা পাথরে পা দিয়ে বনের মধ্যে এগোতে লাগল। কিছুক্ষণ পর পর জায়গা পরিবর্তন করতে লাগল নিজেদের মধ্যে। আস্তে আস্তে বনের মধ্যে বেশ দূরে এগিয়ে গেল ওরা। তখন বেলা হয়েছে। ফ্রান্সিসরা পাতা পাথরে পা রেখে রেখে ফিরে এল। দেখল দুতিনজন আহত ননোয়াক্লা যোদ্ধা উঠে এসে ওদের কাজকর্ম দেখছে। ফ্রান্সিস ভাঙা ভাঙা ওদের ভাষায় বলল–পারবে সাহায্য করতে? আমরা বিশ্রাম করবো। যোদ্ধাদের মধ্যে একজন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর তিনজন যোদ্ধাই ফ্রান্সিসদের মত পাথর পাতার কাজে লেগে পড়ল। ফ্রান্সিসরা একটু বিশ্রাম নিল। তারপর আবার কাজে লেগে পড়ল।
