কিছুক্ষণ পরে রাজা হুয়েমাক উঠে বসলেন। পাহারাদার যে সৈন্যটি রাজা কালহুয়াকানের কাছে চিঠিটা নিয়ে গিয়েছিল তাকে জিজ্ঞেস করলেন–ওদের রাজা কোথায়? সৈন্যটি বলল–সিংহাসনে বসে আছেন। রাজা হুয়েমাক রাজপ্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলেন। তার পা কাঁপছে তখনো। ফ্রান্সিস দরজার আড়াল থেকে সব দেখছিল।
কিছু সময় গেল। রাজা হুয়েমাক ফিরে এলেন। আবার সিঁড়িটায় বসলেন।
বেলা বাড়তে লাগল। ওদিকে রাজবৈদ্যর দুই বৃদ্ধ সঙ্গী কোত্থেকে ভুট্টার রুটি তরকারি বিরাট কাঠের পাত্রে করে নিয়ে এসেছে। বন্দীননোয়াক্লা যোদ্ধাদের খাইয়ে দিল। আহতদেরও খেতে দিল। রাজা হুয়েমাকও খেলেন। তবে সামান্য নিলেন।
রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যরা একটা জাগুয়ার শিকার করে আনল। জাগুয়ারের চামড়া ছাড়িয়ে মাংস কাটল। আগুন জ্বেলে তাই পুড়িয়ে খেতে লাগল। খাওয়া দাওয়া হতে হতে আরও বেলা হল।
রাজপ্রাসাদ থেকে রাজা কালহুয়াকান বেরিয়ে এলেন। সিঁড়িতে বসা রাজা হুয়েমাককে কী বললেন। রাজা হুয়েমাক উঠে দাঁড়িয়ে বন্দী যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে চীৎকার করে বলতে লাগলেন। আমার সন্তানতুল্য প্রজারা–সর্ব প্রথমে আমি যাবো। তারপর তোমরা আসবে। আমরা আগে ঐ শুকনো বন পেরিয়ে পুয়েবেলা নদীর সেতুর কাছে গিয়া অপেক্ষা করবো। তারপর রাজা কালহুয়াকান ও তার সৈন্যদল আসবেন কিন্তু সাবধান কেউ পালিয়ে যাবে না। আমার প্রতিশ্রুতির মূল্য তোমরা দেবে ঐ বিশ্বাস আমার আছে। রাজা থামলেন। ফ্রান্সিস হেসে বলল–রাজা হুয়েমাক এই কথাগুলো আমাকে লক্ষ্য করে বললেন। উনি জানেন যে আমরা এই ঘরেই থাকি।
রাজা হুয়েমাক প্রান্তরে নামলেন। এগিয়ে চললেন বনের দিকে। পেছনে বন্দীরা আসতে লাগল। বনের কাছে এসে রাজা চেঁচিয়ে কী বলতে লাগলেন। ফ্রান্সিস অস্পষ্ট শুনে বলল-রাজা ঠিক ঠিক আমার নির্দেশ পালন করছে। বনের আত্মগোপনকারী সব প্রজাদের তার সঙ্গে যাবার জন্য বলছেন।
রাজা হুয়েমাক বন্দীদের নিয়ে শুকনো বনে ঢুকলেন। শুকনো গাছগাছালি ঝরাপাতার বনের নীচে তখনও একটু অন্ধকার রয়েছে। রাজার নির্দেশে একজন বন্দী চেঁচিয়ে রাজার কথাগুলো বলতে বলতে চলল। বনের আড়াল আবডাল থেকে স্ত্রীলোক-বৃদ্ধ-ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে এসে বন্দীদলের সঙ্গে চলল। কিছু আহত যোদ্ধাও এসে যোগ দিল। ছেলেমেয়ে কোলে মায়েরাও এসে যোগ দিল।
একসময় বন শেষ হল। রাজা হুয়েমাক তার প্রজাদের নিয়ে পুয়েবেলা নদীর সামনে এসে দাঁড়ালেন।
ওদিকে রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যরাও তৈরী হল। সবার আগে দুটো ঘোড়া রাখা হল। প্রথম সাদা ঘোড়াটায় রাজা কালহুয়াকান উঠলেন। রাজপ্রাসাদ থেকে একটা লম্বাটে কালো কাঠের সিন্দুক কয়েকজন সৈন্য কাঁধে করে নিয়ে এল। পেছনের ঘোড়াটার পিঠে বাক্সটা দড়ি দিয়ে বেঁধে দিল। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসরা সবই দেখছিল। বাক্সটা দেখে ফ্রান্সিস বলল–বাক্সটায় নিশ্চয়ই রাষ্ট্র: হুয়েমাকের ধনসম্পত্তি আছে।
এবার রাজা কাহিয়াকানের সৈন্য ঘোড়াগুলোকে লাগাম ধরে টেনে নিয়ে চলল। পদাতিক সৈন্যরা হেঁটে চলল।
রাজা কালহুয়াকান বনে ঢুকলেন। কিন্তু ঘোড়া থেকে নামলেন না। দুতিনজন সৈন্য কুড়ুল হাতে সামনের গাছপালার ডাল পাতা কাটতে কাটতে চলল। পথ পরিষ্কার হতে লাগল। রাজা কালহুয়াকান ঘোড়ার পিঠে চড়ে চললেন। পেছনের বাক্স পিঠে ঘোড়াটাও চলল পেছনে পেছনে।
সব সৈন্যদের নিয়ে রাজা কালহুয়াকান বনের মধ্যে দিয়ে চললেন।
ফ্রান্সিস ঘর থেকে দেখল প্রান্তর জনশূন্য। ও আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। ঘরের কোনা থেকে দুটো তেলে-ভেজা মশাল নিল। সঙ্গে চকমকি পাথর। বলে উঠল–্যারি শিগগির চলো, শাঙ্কো তীর ধনুক নিয়ে এসো।
তৈরী হয়ে ওরা ঘরের বাইরে এল। তারপর দ্রুত ছুটল বনের দিকের মন্দিরের সিঁড়িতে শুয়ে থাকা বসে থাকা ননোয়াক্লা যোদ্ধারা ওদের ছুটে যেতে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
বনের কাছাকাছি পৌঁছল ওরা। ফ্রান্সিস উঁচু হয়ে বসল। একটু ধুলো মাটি থেকে নিয়ে হাত উঁচু করে আস্তে আস্তে ফেলল। দেখল ধুলোগুলো উত্তর দিকে ঘেঁষে পড়ল। তার মানে হাওয়া উত্তরমুখী। ফ্রান্সিস বলে উঠল–এটাই চাইছিলাম। তারপর ফ্রান্সিস চকমকি ঠুকে একটা মশাল জ্বালাল। অন্য মশালটা থেকে তেলে ভেজা কাপড়ের টুকরো ছিঁড়ে নিল। একটা তীরের ফলায় জড়ালো। জ্বলন্ত মশাল থেকে তীরের ফলায় জড়ানো কাপড়ে আগুন লাগাল। জ্বলন্ত তীরটা শাঙ্কোর হাতে দিয়ে বলল-এই তীরটা বনের পেছন দিকে ছোড়ো। এইবার হ্যারি ও শাঙ্কো বুঝতে পারল, হ্যারি হেসে বলল-সাবাস ফ্রান্সিস। শাঙ্কো দ্রুত হাতে তীর ছুঁড়ল। জ্বলন্ত তীর উড়ে গিয়ে বনের পেছন দিককার গাছগাছালিতে গিয়ে পড়ল। শুকিয়ে যাওয়া গাছগাছালিতে সঙ্গে সঙ্গে আগুন লেগে গেল। তারপর আবার তীরে কাপড় জড়াল ফ্রান্সিস। আবার আগুন লাগাল। বলল–এবার যত দূরে পারো তীর ছোঁড়ো। আবার আগুন মুখে তীর ছুড়ল। প্রায় বনের মাঝামাঝি পড়ল। ওখানেও আগুন লেগে গেল। উত্তুরে হাওয়ার মুখে আগুন ছড়াতে লাগল। তারপর শাঙ্কো দ্রুতহাতে আরো আগুনজ্বালা তীর ছুঁড়ল। সমস্ত বনেই আগুন লেগে গেল। বনে আগুন ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
ওদিকে আগুন আর ধোঁয়ার বেড়াজালে পড়ে গেল কালহুয়াকানের সৈন্যরা। কালহুয়াকান নিজেও। পাগলের মত সৈন্যরা বনের মধ্যে ছুটোছুটি করতে লাগল। কিন্তু চারদিকেই আগুন আর ঘন ধোঁয়া। আগুন ছড়াতে লাগল। উঁচু উঁচু গাছগুলোকে পেঁচিয়ে আগুনের কুণ্ডলী ওপরের দিকে উঠতে লাগল। রাজা কালহুয়াকান ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। পালাতে গেলেন। কিন্তু কোনদিকে পালাবেন? চারদিকেই আগুন আর গাঢ় ধোঁয়া। বনের মাথায় আকাশে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে লাগল। দুতিনজন সৈন্য ঘোড়ার পিঠে উঠে আগুনের বলয় পার হতে গেল। কিন্তু ঘোড়াসুদ্ধ পুড়ে মরল। প্রাণভয়ে ভীত ঘোড়াগুলো পাগলের মত এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগল। ছুটন্ত ঘোড়ার পায়ের নীচেও অনেক সৈন্য মারা পড়ল। আগুনের শিখা ওপরে আকাশের দিকে অনেকটা উঠে গেল। বিকেলের আকাশে বন থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে লাগল।
