–দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল। ওরা অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরেই বৃদ্ধটি ফিরে এল। হাতে একটা পুঁটুলি। ঘরে ঢুকে পুঁটলি খুলে খাবার বের করল। সেই ভুট্টার রুটি। বুনো ফলের তরকারি। খিদের জ্বালায় তিনজনেই উবু হয়ে বসে খেতে লাগল। বৃদ্ধটি হাসতে লাগল। তিনজন ক্ষুধার্তকে খাইয়ে বৃদ্ধটি খুশীই হয়েছে বোঝা গেল। খাওয়ার পর চীনেমাটির পাত্রগুলো নিয়ে যাচ্ছে তখন ফ্রান্সিস ভাঙা ভাঙা নাহুয়াতল ভাষায় ধন্যবাদ জানিয়ে বলল-রাজা হুয়েমাক কোথায়?
বৃদ্ধটি দরজার কাছ থেকে আঙুল তুলে দেখাল। ফ্রান্সিসরা দেখল রাজপ্রাসাদের সিঁড়ির ওপর রাজা হুয়েমাক হাতবাঁধা অবস্থায় বসে আছেন। রাজবৈদ্য রাজার কাঁধের ক্ষতে ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছে। বৃদ্ধটি একনাগারে কী বলে গেল। ফ্রান্সিস মোটামুটি বুঝল। বলল–জানো, কালরাতে রাজা হুয়েমাককে রাজবৈদ্য চিকিৎসা করতে চেয়েছিল। রাজা রাজি হননি। বলেছেন–আমার প্রজাদের আগে চিকিৎসা কর। তারপর আমাকে। তাই এখন সকালে চিকিৎসা হচ্ছে। হ্যারি বলল সত্যি–এরকম মানুষ কম দেখা যায়। বৃদ্ধটি চলে গেল। ফ্রান্সিস ভাবল, এই সুযোগ। রাজাকে চিঠিটা দিয়ে আসি। কিন্তু দেখল–দুজন শত্রুসৈন্য রাজার দুপাশে দাঁড়িয়ে বর্শাহাতে পাহারা দিচ্ছে। অন্য উপায় ভাবতে হবে। তখনই দেখল শাঙ্কো ওর তীরগুলো খাপে গুছিয়ে রাখছে। ফ্রান্সিস ডাকল–শাঙ্কো শিগগির তীর ধনুক নিয়ে এসো। বিপদ আঁচ করে শাঙ্কো তীর ধনুক বাগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল ভয় নেই। তারপর শাঙ্কোর হাত থেকে তীরটা নিল। চিঠিটা কোমরবন্ধনী থেকে বের করল। চিঠিটা একটা তীরের ফলায় জড়ালো। তারপর রাজা হুয়েমাক যে ওদের যে নতুন পোশাক পরতে দিয়েছিল তারই স্কুল থেকে সুতো ছিঁড়ে নিল। তীরের ফলার সঙ্গে চিঠিটা বেঁধে দিল। তারপর তীরটা শাঙ্কোর হাতে দিয়ে বলল–ঐ দেখ রাজা হুয়েমাক সিঁড়িতে বসে আছে। ঠিক তীর ছুঁড়ে রাজার সামনে চিঠিটা ফ্যালো। পারবে তো? শাঙ্কো মাথা ঝাঁকাল। তারপর নিশানা ঠিক করে শাঙ্কো তীরটা ছুঁড়ল। ঠিক রাজা হুয়েমাকের পায়ের কাছে তীরটা পড়ল। রাজা দুএকবার এদিক ওদিক তাকালেন। তারপর বাঁধা হাতদুটো বাড়িয়ে তীরটা তুলে নিলেন। সুতোর বাঁধন খুলে চিঠি বার করলেন। খুর মন দিয়ে বারকয়েক পড়লেন। এতক্ষণ ফ্রান্সিস রুদ্ধনিঃশ্বাসে তাকিয়ে ছিল। এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–যাক রাজাকে নির্দেশটা দিতে পেরেছি। রাজার পাহারাদার একজন দেখল রাজা চিঠি পড়ছে। পাহারাদারটা মুখ নামিয়ে দেখল চিঠিটা। স্পেনীয় ভাষায় লেখা। ও মাথামুণ্ড কিছুই বুঝল না। তবু চিঠিটা ছিনিয়ে নিল। রাজার এতক্ষণে বারকয়েক পড়া হয়ে গেছে। চিঠিটা নিয়ে পাহারাদার সৈন্যটি রাজপ্রাসাদে ঢুকল। দেখল রাজা কালহুয়াকান সিংহাসনে হাত পা গুটিয়ে শুয়ে আছেন। সৈন্যটি মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে চিঠিটা রাজার হাতে দিল। তারপর কী বলে গেল। বোধহয় কী করে চিঠিটা পেয়েছে তাই বলল। রাজা কালহুয়াকান সিংহাসনে উঠে বসলেন। চিঠিটা পড়বার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুই পড়তে পারলেন না। তখন চিঠিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার হাত-পা গুটিয়ে শুয়ে পড়লেন। সৈন্যটি চলে এল।
পাথরের সিঁড়িতে রাজা হুয়েমাক বসে আছেন।
একটু পরেই একজন সৈন্যদের দলনেতা ঘোড়ায় চড়ে সিঁড়ির কাছে এল। দুতিনজন সৈন্য এগিয়ে গেল। দলনেতা তাদের কী বলল। তারা খুব হাসাহাসি করল। একজন ছুটে গিয়ে একটা লম্বা দড়ি নিয়ে এল। ফ্রান্সিস ঘরের দরজার আড়াল থেকে সবই লক্ষ্য করছিল। সৈন্যটা দড়ির একটা প্রান্ত আহত রাজা হরেমাকের হতে বাঁধল। ফ্রান্সিস ডাকল—হ্যারি দেখে যাও। ওরা যে খেলা আমাদের সঙ্গে খেলেছিল সেই একই খেলা খেলছে রাজা হুয়েনাকের সঙ্গে। হ্যারি শাঙ্কো দুজনেই এগিয়ে এল। দেখতে লাগল দরজার আড়াল থেকে।
রাজা হুয়েমাকের হাতে দড়ি বেঁধে সৈন্যটি দড়ির অপর প্রান্ত ঘোড়সওয়ার দলনেতার হাতে দিলে। দলনেতা দড়িতে এক হ্যাঁচকা টান দিল। রাজা হুয়েমাক কিছু ভাবছিলেন। চমকে উঠে দাঁড়ালেন। দলনেতা ঘোড়া চালাতে লাগল। দড়িবাঁধা রাজাও হাঁটতে লাগলেন ঘোড়ার পেছনে পেছনে। হঠাৎ দলনেতা ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দিতেই আহত রাজা মাটিতে পড়ে গেলেন। দলনেতা মাটিতে ধুলোয় হিঁচড়ে নিয়ে চলল রাজাকে। শত্রুসৈন্যরা উল্লাসে চীৎকার করতে লাগল। রাজাকে হিঁচড়ে নিয়ে দলনেতা ঘোড়াটাকে ঐ মাঠের মত জায়গাটায় পাক খাওয়াতে লাগল। রাজার পোশাক ছিঁড়েখুঁড়ে গেল। সারা গায়ে ধুলো৷ কাঁধে বর্শার জখম। তবু রাজা নিঃশব্দে এই অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে লাগলেন। দেখতে দেখতে বেদনায় দুঃখে ফ্রান্সিসের চোখে জল এল। ও চোখ বন্ধ করে বলল–শাঙ্কো–মারো ঐ ঘোড়সওয়ারকে। শাঙ্কো বলল–অত দূরে তীর যাবে না।
–ফ্রান্সিস তারপর খুব নিবিষ্টমনে তাকিয়ে ঘোড়সওয়ারকে দেখল। ঐ তো–সেই দাড়িগোঁফওলা দলপতি। বলল–হ্যারি–সেই লোকটা না?
–হ্যাঁ। হ্যারিও দেখতে দেখতে বলল?
–শাঙ্কো-পাথরের বাড়ির আড়ালে আড়ালে কাছে চলে যাও।
ঐ নরপশুটাকে হত্যা করা চাই। শাঙ্কো বিছানা থেকে কাপড়টা নিয়ে গা মাথা ঢাকল। তীর ধনুক নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পাথরের বাড়িগুলোর আড়ালে আড়ালে এগিয়ে চলল। সব সৈন্যরা তখন ঐ কাণ্ড দেখতে ব্যস্ত। খুব মজা পাচ্ছে। শাঙ্কোর দিকে কারো চোখ পড়ল না। শাঙ্কো মন্দিরের সামনে পাথরের সিঁড়ির একপাশে মাথা নীচু করে বসে পড়ল। তারপর ধনুক বাগিয়ে ধরল। একটার বেশী তীর ছোঁড়া যাবে না। কাজেই নিশানা নিখুঁত হতে হবে। একটু সময় নিল শাঙ্কো তারপর তীর ছুঁড়ল। নির্ভুল নিশানা। তীরটি দলনেতার বুক ভেদ করল। দুহাত ওপরে তুলে সে ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে গেল। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে মন্দিরের ওপাশে চলে গেল। এক মুহূর্ত। সৈন্যরা তখনও ভাবছে কী হল? তারপরই অনেকে ছুটে গেল দলনেতার দিকে। আর কিছু সৈন্য এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে লাগল। কে তীর ছুড়ল? কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারল না ওরা। গা মাথা কাপড়ে ঢাকা শাঙ্কো ততক্ষণে ঘরে চলে এল। ওদিকে কয়েকবার এপাশ ওপাশ করে দলনেতা মারা গেল। রাজা হুয়েমাক মাটি থেকে উঠলেন। টলতে টলতে হাঁটতে লাগলেন। ওভাবেই, হাঁটতে হাঁটতে কোনরকমে এসে পাথরের সিঁড়িতে শুয়ে পড়লেন। তার পায়ের পোশাক তখন ছিন্নভিন্ন, রক্ত ধুলোয় ভরা সারা শরীর।
