ফ্রান্সিসরা নিজেদের ঘরে ফিরে এল। ঘরের দরজা বন্ধ করে শুয়েছে সবে তখনই শুনল দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কার শব্দ। নিশ্চয়ই কালহুয়াকানের সৈন্যরা। এই ঘরের দরজা বন্ধ দেখে ধরে নিল ভেতরে মূল্যবান কিছু আছে। দরজায় ধাক্কা দেওয়া চলল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি দ্রুত বিছানা থেকে উঠল। তরোয়াল হাতে নিল। ফ্রান্সিস জ্বলন্ত মশালটা মেঝেয় চেপে নিভিয়ে ফেলল। ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। শাঙ্কোও উঠে দরজার হুড়কোটা খুলো দিয়েই দ্রুত পিছিয়ে এল। চার-পাঁচজন রাজা কালহুয়াকানের সৈন্য এক ধাক্কায় দরজা খুলে ঢুকল। প্রথম সৈন্যটার বুকে লাল করে হ্যারি তরোয়াল চালাল। সৈন্যটির বর্শা হাতেই রয়ে গেল। ঘাড়ে গভীর ক্ষত নিয়ে সে মেঝেয় গড়িয়ে পড়ল। পরের সৈন্যটি অন্ধকারেই বর্শা ছুঁড়ল। বর্শা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। ফ্রান্সিস এক লাফে এগিয়ে এসে সৈন্যটার বুকে তরোয়াল বিধিয়ে দিল। সৈন্যটা দুহাত শূন্যে তুলে চিৎ হয়ে মেঝেয় পড়ে গেল। পরেরটাকে ঘায়েল করল শাঙ্কোর ছোঁড়া তীর। আহত সৈন্যটা দোর গোড়াতেই পড়ে গেল। পরের সৈন্যটি আর ভয়ের চোটে ঘরেই ঢুকল না। এক লাফে বাইরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ফ্রান্সিসরা ধরাধরি করে মৃত সৈন্যদের দরজার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঘরে ফিরে হ্যারি আর শাঙ্কো বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে থেকেই বলল–ঘরের দরজা বন্ধ করো না। তাহলেই কালহুয়াকানের সৈন্যরা ভাববে এ ঘর লুঠ হয়ে গেছে। আর ঢুকবে না। শাঙ্কো তীর ধনুক পাশে রেখে শুয়ে পড়ল। হ্যারি তরোয়াল হাতে বিছানায় বসে রইল। ফ্রান্সিস বলল–তোমরা সজাগ থেকো–আমি একটু ঘুরে আসছি।
–এত রাতে কোথায় যাবে? হ্যারি জানতে চাইল।
–রাতেই সুবিধে। এক্ষুনি আসছি। ফ্রান্সিস কথাটা বলে দরজার বাইরে এল। সাবধানে চারিদিকে অন্ধকারে নজর রেখে চলল প্রাসাদের সিঁড়ির দিকে। দেখল এখানে ওখানে আগুন জ্বেলে কালহুয়াকানের সৈন্যরা হৈ হৈ করে খাওয়া দাওয়া করছে। সেই আলোয় দেখল কোয়েতজাল মন্দিরের সিঁড়িতে আহত ননোয়াক্লা সৈন্যরা শুয়ে বসে আছে। প্রান্তরে হাতবাঁধা বন্দীরা সারি বেঁধে বসে আছে। এরই মধ্যে সেই রাজবৈদ্যকে দেখল ফ্রান্সিস। রাজবৈদ্য সঙ্গে দুজন বৃদ্ধকে নিয়ে আহত সৈন্যদের চিকিৎসা করছে। সঙ্গী বৃদ্ধের হাতে ওযুধের দুটো থলি। রাজবৈদ্য নিচু হয়ে একজন ননোয়াক্কা সৈন্যর ক্ষতে ওষুধ লাগাচ্ছে তখনই একজন কালহুয়াকানের সৈন্য রাজন্যৈর দিকে বর্শা উঁচিয়ে ছুটে এল। বর্শা ছোঁড়ার আগেই ফ্রান্সিস সৈন্যটার বুকে বর্শা বিধিয়ে দিল। সৈন্যটা বর্শা ফেলে মাটিতে উবু হয়ে পড়ে গেল। রাজবৈদ্য উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস রাজবৈদ্যকে চাপাস্বরে ভাঙা ভাঙা নাহুয়াল ভাষায় বলল–রাজা হুয়েমাক–খুঁজছি-কোথায়? রাজবৈদ্য মাথা নাড়ল। ও জানে না।
ফ্রান্সিস আবার অন্ধকারে সাবধানে চলল। সামনেই কোয়েতজালের মন্দির। ফ্রান্সিস ভেবে দেখল এই ডামাডোলের মধ্যে রাজা হুয়েমাককে পাওয়া যাবে না। তাছাড়া তিনি এতক্ষণে বন্দী। কালহুয় কানের সৈন্যরা নিশ্চয়ই তাকে পাহারা দিচ্ছে। অথচ রাজাকে একটা নির্দেশ দিতেই হবে। কী করে এই নির্দেশটা রাজা হুয়েমাকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়? আচ্ছা চিঠি পাঠালে কেমন হয়? ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে কোয়েতজালের মন্দিরে ঢুকে পড়ল। একপাশে রাজার পাঠকক্ষ। এখানে শত্রুসৈন্যরা নেই। মন্দিরে আর পাহারা দেবার কী আছে। ফ্রান্সিস অন্ধকারে পা টিপে টিপে পাঠকক্ষে ঢুকল। দেখল মশাল জ্বলছে। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে একটা ভেড়ার সাদা চামড়া টেনে নিল। দোয়াতের কালিতে কলম ঢুকিয়ে লিখল–
মহানুভব রাজা হুয়েমাক–
একটা প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছি। আপনি রাজা কালহুয়াকানকে বলবেন সব বন্দীদের সঙ্গে নিয়ে আপনি হেঁটে শুকনো বন পেরিয়ে প্রথমে পুয়েবেলা নদীর সেতুর কাছে যাবেন। আপনাদের পেছনে আসবেন রাজা কালহুয়াকান ও তার সৈন্যরা। আপনি রাজা কালহুয়াকানকে প্রতিশ্রুতি দেবেন যে আপনি নিজে বা কোন বন্দী পালাবেনা। শুকনো বনে আত্মগোপনকারী সবাইকে ডেকে নিয়ে যাবেন। বনে কেউ যেন না থাকে।
ইতি ফ্রান্সিস।
চিঠিটা লিখে ফ্রান্সিস পাঠকক্ষ থেকে বেরিয়ে এল। এখন চিন্তা এই চিঠি হুয়েমাকের কাছে কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়। রাজা হুয়েমাককে কোথায় রাখা হয়েছে কে জানে। রাজা হুয়েমাকের এখানে কোন কয়েদ ঘরও নেই। অগত্যা কাল সকালে চেষ্টা করতে হবে।
ফ্রান্সিস সতর্কভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে নিজেদের ঘরে নিয়ে এল। হ্যারি শাঙ্কো দুজনেই জেগে ছিল। ফ্রান্সিস ঢুকতেই হ্যারি বলল–তোমার কোন বিপদ হয়নি তো?
না। শত্রুসৈন্যরা আর এখানে এসেছিল? ফ্রান্সিস বলল?
–না। রাত বেশী নেই। শুয়ে পড়। হ্যারি বলল।
ওরা বিছানায় শুল বটে। কিন্তু ভালো ঘুম হল না কারোরই। রাতে খাওয়া হয়নি। ভোরেই উঠে পড়ল ওরা। খিদেও পেয়েছে। আবার সকালের আলোয় দেখল রাজবৈদ্যর একজন সঙ্গী যাচ্ছে। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাকল–শুনুন। বৃদ্ধটি থামল। এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে ফ্রান্সিসকে দেখতে পেল। এগিয়ে এসে দোর গোড়ায় দাঁড়াল। ফ্রান্সিস হাতের ভঙ্গী করে বলল–খাবার। বৃদ্ধটি হাসল। তারপর চলে গেল।
–ও কি খাবার আনতে পারবে? শাঙ্কো বলল?
