ফ্রান্সিস দ্রুত পায়ে এসে রাজপ্রাসাদে ঢুকল। দেখল রাজদরবারে গণ্যমান্যরা বসে আছেন। রাজা হুয়েমাক কাঠের সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। দুটিচোখে দুশ্চিন্তা। রাজা ফিরে তাকিয়ে ফ্রান্সিসকে দেখলেন। অনেক পরিষ্কার স্পেনীয় ভাষায় বললেন–ফ্রান্সিস রাজা কালহুয়াকান আমার রাজ্য আক্রমণ করতে আসছে। ওরা ভোরবেলা একটা একটা করে ঘোড়া পুয়েবেলা নদীর সেতুর ওপর দিয়ে পার করে এপারে এসেছে। তারপর পদাতিক সৈন্যরা এসেছে। শুকনো বনের মধ্যে দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে আসা অসুবিধে। তাই বনের পাশ দিয়ে অনেক দূরে ঘোড়া দুটিয়ে সৈন্যদল আসছে। পেছনে পদাতিক সৈন্যরা। বিকেলের মধ্যেই এসে পড়বে?
–তাহলে আপনার সৈন্যদের তৈরী হতে বলুন। ফ্রান্সিস বলল।
–সে আদেশ আমি দিয়েছি–আমার সন্তানতুল্য প্রজাদের ভাগ্যে যা ঘটবে আমার ভাগ্যেও তাই ঘটুক।
–আপনার উপযুক্ত সিদ্ধান্তই আপনি নিয়েছেন। ফ্রান্সিস বলল—
ভাবছি যুদ্ধ না করে সন্ধির প্রস্তাব করবো কিনা। রাজা বললেন।
আতেও আপনি বা আপনার প্রজারা রেহাই পাবে না।
কালহুয়াকানের মত নরপশু সন্ধির প্রস্তাব মানবে না। বলি দেবার জন্যে অনেক বন্দী পাবে। এতেই ওর আনন্দ। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক বলেছো। মরতে যখন হবেই তখন লড়াই করেই মরবো। রাজা বললেন। তারপর রাজা নাহুয়া ভাষায় গণ্যমান্যদের নিজের সিদ্ধান্তের কথা বললেন। গণ্যমান্যরা উঠে দাঁড়ালেন। তারপর মাথা নীচু করে রাজাকে সম্মান জানিয়ে চলে গেলেন। ফ্রান্সিস বলল–মহামান্য রাজা–আপনার এই বিপদে আমরা মাত্র তিনজন কী সাহায্য আর আপনাকে করতে পারবো। তাছাড়া আমি নিজে এখনো সুস্থ নই। আমার বন্ধুরা থাকলে–যাকগে দেখি কী করতে পারি। ফ্রান্সিস মাথা একটু নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানিয়ে চলে এল।
ফ্রান্সিস নিজেদের ঘরে ফিরে এল। হ্যারি আর শাঙ্কোকে সব বলল। হ্যারি বলল–কিন্তু তোমার যা শরীরের অবস্থা
–না তরোয়াল নিয়ে আমি যুদ্ধ করতে পারবো না। তুমিও খুব সুস্থ নও। এক শাঙ্কো। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকাল। বলল–এবার বুঝলে কেন তোমাকে অনেক তীর তৈরী করতে বলেছিলাম।
ফ্রান্সিস বিছানার ধার থেকে তরোয়াল তুলে কোমরে গুজল। হ্যারিও তরোয়াল নিল। শাঙ্কো ধনুক নিল। কাঁধের খাপে অনেক তীর নিল।
ওরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। ঠিক তখনই একদল ননোয়াক্লা যোদ্ধা যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে বেড়িয়ে গেল বনের বাঁদিক লক্ষ্য করে। সামনের প্রান্তরে পদাতিক সৈন্যরা সারি বেঁধে দাঁড়াতে লাগল।
ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কোকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াতে লাগল আর নাহয়া ভাষায় ভেঙে ভেঙে বলতে লাগল–খাদ্য নাও-শুকনো বনে–পালিয়ে যাও।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নারী শিশু বৃদ্ধারা হাতে খাবারের পুটুলি নিয়ে শুকনো বনের দিকে ছুটে পালাতে লাগল। সন্ধের আগেই চোলুলা জুনহীন হয়ে গেল।
সন্ধের সময়ই–কালহুয়াকানের অশ্বারোহী সৈন্যরা চোলুলায় পৌঁছল। পদাতিক ননোয়াক্লা সৈন্যরা যুদ্ধ করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে কালহুয়াকানের পদাতিক
একটা পাথরের বাড়ির আড়াল থেকে এতক্ষণ শাঙ্কো নিখুঁত নিশানায় তীর ছুঁড়ে বেশ কিছু কালহুয়াকানের ঘোড়সওয়ার সৈন্য মেরেছে। কিন্তু অন্ধকার নেমে এল তখনই। অন্ধকারে শাঙ্কো নিশানা ঠিক করতে পারল না। ও তীর ছোঁড়া বন্ধ করল। অনর্থক তীর নষ্ট করল না।
ননোয়াক্লা যোদ্ধারা বীরের মত কালহুয়াকানের অশ্বারোহী সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করল। কিন্তু কালহুয়াকানের পদাতিক সৈন্যরা আসতেননোয়াক্লা যোদ্ধাদের প্রতিরোধ ভেঙে গেল। তারা হেরে যেতে লাগল। আহত আর মুমুর্যদের আর্তনাদে প্রান্তর ভরে উঠল। পরাজিত ননোয়াক্লা সৈন্যদের দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে বন্দী করা হল। প্রান্তরে দাঁড় করিয়ে রাখা হল।
ওদিকে রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যরা রাজপ্রাসাদে ঢুকল। রাজসভার গণ্য মান্যদের বন্দী করা হল। রাজা হুয়েমাকের দেহরক্ষীরা যখন লড়াই করছে তখন রাজা ছুটে এলেন। বললেন–তোমরা পালাও। আমি একা লড়াই করবো। করলেনও তাই। তার বাঁ কাঁধে বর্শা বিধল। আহত হয়ে তিনি প্রাসাদের সিঁড়ির ওপর পড়ে গেলেন। আহত রাজা হুয়েমাক বন্দী হলেন।
যুদ্ধে রাজা কালহুয়াকানের সৈন্যরা জিতল। ওরা মুখে হাতের থাবড়া দিয়ে শব্দ করতে লাগল। চীৎকার করতে লাগল। তারপর জনশূন্য বাড়িগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লুঠপাট চলল অবাধে।
যুদ্ধজয়ী রাজা কালহুয়াকান একটা সাদা ঘোড়ার পিঠে বসে এসব দেখছিলেন। এবার ঘোড়া থেকে নেমে এলেন। কালহুয়াকানের পরনে রাজবেশ। দুকানে অলঙ্কার। গলায় দামী পাথরের মালা। তিনি রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন। সোজা গিয়ে রাজা হুয়েমাকের সিংহাসনে বসলেন। সঙ্গে ছিল গণ্যমান্যরা। তারা মাথা নীচু করে সম্মান জানিয়ে রাজা কালহুয়াকানের সামনে দাঁড়াল। রাজা কালহুয়াকান রাজসভাগৃহের চারদিকে তাকাতে তাকাতে হা হা করে হেসে উঠলেন। তাঁর অনেকদিনের বাসনা পূর্ণ হল। রাজা হুয়েমাককে চোলুলা থেকে তাড়িয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। রাজা হুয়েমাকের এই রাজধানী চোলুলা দখল করার কল্পনাও তার অনেকদিনের।
বিজয়ী কালহুয়াকানের সৈন্যদের বিজয়োল্লাস আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে রাত বাড়তে লাগল।
