–উঁ? ফ্রান্সিস মুখ ফিরিয়ে হ্যারির দিকে তাকাল?
–এখন শরীর কেমন লাগছে। ? হ্যারি বলল?
–ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। বলল ভালো। আচ্ছা আমার কী হয়েছিল?
–সে সব কথা পরে হবে খন। তোমার খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই? হ্যারি বলল।
–ভীষণ। ফ্রান্সিস বলল?
–আমরা খাবার রেখে দিয়েছি। খাবে এসো। হ্যারি বলল।
তিনজনেই খেতে বসল। পাখির মাংসের ঝোল। বীন, টম্যাটোর তরকারি। ভুট্টার রুটি। তিনজনেরই খিদে পেয়েছিল। পেট পুরে খেল। জল খেয়ে শুয়ে পড়ল। তিনজনেই ক্লান্ত। এদিকে ফ্রান্সিসকে সুস্থ দেখে হ্যারি আর শাঙ্কো নিশ্চিন্ত হল। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল ওরা। ফ্রান্সিস শুধু জেগে রইল। মনে পড়ল–তুলার কোয়েতজাল মন্দির–দেবমূর্তি ভাঙা হল–সুড়ঙ্গ–সিঁড়ি-গোলমত ফোকর। কিন্তু গুপ্তধন খুঁজে বার করা যায়নি। এসব ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।
দিন চারেক কাটল। রাজবৈদ্যর চিকিৎসায় ফ্রান্সিস এখন অনেকটা সুস্থ। তবে শরীরের দুর্বলতা এখনও সম্পূর্ণ কাটেনি। হ্যারি ও শাঙ্কো এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। শুধু ঘরে বসে থাকতে শাঙ্কোর ভালো লাগে না। ও শিকার করতে যেতে চায়। কিন্তু ফ্রান্সিস ওকে যেতে দেয় না। একবার বিপদে পড়েছে। অনেক কষ্টে ওকে মুক্ত করে ফিরিয়ে এনেছে। আবার কিছু হলে? ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলেছে–আরো তীর তৈরী কর। হয়তো পরে কাজে লাগবে। শাঙ্কো দুবেলা তাই করে। বেশ কিছু তীর তৈরী করেছে এর মধ্যে।
রাজা হুয়েমাক প্রতিদিন ফ্রান্সিসদের ঘরে আসেন। ওদের খোঁজখবর নেন। নানা কথা হয়। সেদিন সকালে ফ্রান্সিসকে বললেন–চলো-আমার পড়ার ঘর তোমাকে দেখাবো। ফ্রান্সিস বেশ আগ্রহ বোধ করল। সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকতে ভালোও লাগে না।
রাজার সঙ্গে ফ্রান্সিসচলল। লম্বা লম্বা পাথরবাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে ওরা কোয়েতজাল দেবতারমন্দিরে ঢুকল। এখানে প্রতিদিন দেবতার পুজো হয়; ফ্রান্সিস দেখল এখানকার কোয়েতজালের মুর্তিটাও তুলার মন্দিরের মূর্তির মতই। উচ্চতাও প্রায় এক। মূর্তির বেদীতে বুনো ফুল ফুলের মালা ছড়ানো।
রাজা হুয়েমাক মূর্তির সামনে কিছুক্ষণ হাঁটু গেড়ে বসল। দুহাত ওপরে তোলা। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল–তুলার রাজা কালহুয়াকান–নরবলি–পূজা–আমি মানি না–মনে করি–কোয়েতজাল শুধু জীবনের দেবতা–মৃত্যুর নয়। ফ্রান্সিস রাজা হুযেমাকের এই মনোভাবের মনে মনে প্রশংসা করল। রাজা বললেন এখানে কয়েদ ঘর নেই–মানুষ সৎ-বিশ্বাস করি।
মন্দিরের পাশেই একটা বড় ঘর। ফ্রান্সিসকে নিয়ে রাজা সেই ঘরে ঢুকলেন। সাদাসিদে ঘর। কয়েকটা লম্বাটে পাথরের ওপর কিছু চামড়াবাঁধা বই। ফ্রান্সিস বইগুলো খুলে দেখল ভেড়ার সাদা চামড়ার পাতা। হাতে লেখা বই। ভাষা স্পেনীয়। পাথরের ওপর একটা চীনে মাটির দোয়াত কালি। পাশে মোটা ঘাস কেটে তৈরী কলম। পাশে কয়েকটা ভেড়ার সাদা চামড়া। বোঝা গেল এই কালি কলম চামড়ায় লেখা হয়। রাজা বললেন–এই ঘরে পড়ি–লিখি।
–বইগুলো কোথায় পেলেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–বারিনথাস–প্রথমে ভালো–পরে মন্দ। স্পেনীয় ভাষা-শিখেছি। রাজা বললেন।
-এখন আপনি ক পড়েন–কী লেখেন? ফ্রান্সিস বলল?
–স্পেনীয় ভাষার অক্ষরে-নাহুয়াতুল ভাষা–তৈরী–চেষ্টা।
ফ্রান্সিস শুনে খুব খুশী হল। বলল–সত্যি আনন্দের কথা।
আপনি সত্যি আপনার প্রজাদের কথা ভাবেন।
প্রজাসন্তান। বিদেশের জ্ঞান-চাই। রাজা বললেন। তারপর বললেন–
–স্পেনীয় অক্ষর লেখ। রাজা একটা সাদা চামড়া এগিয়ে দিল। ফ্রান্সিস কলম দিয়ে স্পেনীয় বর্ণমালা লিখে দিল। রাজা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। জোরে পড়লেন। ফ্রান্সিস হেসে বলল
–আপনি স্পেনীয় ভাষা মোটামুটি শিখেছেন।
–আরো ভালো-শেখাবেন? রাজা বললেন?
–ঠিক আছে–আমি যতটুকু জানি শেখাবো। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা খুশীর হাসি হাসলেন। বললেনকাল সকাল–।
–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস পরদিন থেকে সকালে রাজার ঘরে আসতে লাগল। ও রাজাকে আরো ভালোভাবে স্পেনীয় ভাষা শেখাতে লাগল। নিজেও নাহুয়াল ভাষা শিখতে লাগল। কিছুদিনের মধ্যে রাজা হুয়েমাক স্পষ্ট স্পেনীয় ভাষা বলতে শিখলেন। ফ্রান্সিস মোটামুটি নাহুয়ালভাষা শিখল।
সেদিন দুপুরের দিকে। ফ্রান্সিস আর হ্যারি ঘরে রয়েছে। ঘরের দরজায় বসে শাঙ্কো লোহার ফলা দিয়ে তীর তৈরী করছে। হঠাৎ দেখল একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা শুকনো বনটা থেকে বেরিয়ে ছুটে রাজবাড়ির দিকে আসছে আর চীৎকার করে কী বলছে। শাঙ্কো বুঝল একটা কিছু হয়েছে। ও ছুটে ফ্রান্সিসের কাছে গেল। বলল ফ্রান্সিস একজন যোদ্ধাকে বনের দিক থেকে দৌড়ে আসতে দেখলাম–বোধহয় কিছু হয়েছে।
–যোদ্ধাটা কোথায় গেল?
–রাজবাড়িতে।
তিনজনেই দরজায় এসে দাঁড়াল। সত্যি একটা কিছু হয়েছে। লোকজন ছুটোছুটি করছে। সকলের মুখেই ভয়।
ঠিক তখনই রাজবাড়ি থেকে একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা ছুটতে ছুটতে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। ফ্রান্সিস এই যোদ্ধাটাকে চেনে। দেখা হলেই এই যোদ্ধাটা হাসে। রাজা হুয়েমাক এই দেহরক্ষী যোদ্ধাটিকে দিয়েই বরাবর ফ্রান্সিসকে ডেকে পাঠায়। আজকে যোদ্ধাটি কিন্তু হানছে না। বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও ফ্রান্সিসকে কিছু বলল। ফ্রান্সিস এখন নাহুয়াল ভাষা একটু বোঝে। রাজা ডাকছেন–এটুকু বুঝল। ও বলল-আমি আসছি।
