দ্রুত ঘোড়া ছোটাল তিনজনে। প্রাচীরের বাইরে এল। দেখল তলতেক সৈন্যরা বসে আছে, দাঁড়িয়ে আছে, গল্পগুজব করছে। ওরা ফ্রান্সিসদের ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে। দেখল। ওরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। কারণ তখনও ওরা রাজার আদেশ পায়নি।
বাঁদিকে বিষাক্ত উপত্যকাকৈ রেখে ওরা উত্তর দিকে পুয়েবেলা নদীর সেতুর উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছোটাল। একটা বিস্তৃত প্রান্তরে এসে পড়ল। ফ্রান্সিস কষ্ট করে পেছনে তাকাল। না তলতেক সৈন্যরা পিছু ধাওয়া করেনি। ফ্রান্সিস এতক্ষণ শরীরের জ্বর যন্ত্রণা দাঁত চেপে সহ্য করছিল। আর পারল না। মাথাটা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে যেন। হঠাৎ চোখের সামনে সাদা রঙের ফুলকি মত দেখল। অবসাদে শরীর ছেড়ে দিল। ছিটকে পড়ল ঘোড়া থেকে।
হ্যারি আর শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া থামাল। নেমে পড়ল ঘোড়া থেকে। দুজনে ধরাধরি করে তুলল ফ্রান্সিসকে। ফ্রান্সিসের ঘোড়াটা ওরা ছেড়ে দিল। শাঙ্কো নিজে ঘোড়ায় উঠল। নীচে থেকে হ্যারি ফ্রান্সিসের প্রায় অচেতন শরীরটা শাঙ্কোর সামনের। দিকে ঠেলে ধরল। শাঙ্কো দুহাতে ফ্রান্সিসকে ওর সামনে তুলে নিল। হ্যারি ওর ঘোড়ায় উঠল। ঘোড়া ছোটাল আবার। শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে বাঁ হাতে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে রাখল। ডান হাতে লাগাম ধরল। ঘোড়া ছোেটাল।
ফ্রান্সিসের যেন মনে হল শরীরটা খুব হালকা হয়ে গেছে। কোনো জ্বালা যন্ত্রণা নেই আর। ও যেন স্বপ্ন দেখতে লাগল–ওদের বাড়ির সেট এ সেই নীল ফুলের গাছটা। গেট এ দাঁড়িয়ে আছে ওর বাবা আর মারিয়া। অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মা যেন বাগান থেকে ছুটে আসছে। চারদিকে উজ্জ্বল রোদ। দুরন্ত হাওয়া বইছে। ও যেন ঘোড়ায় চড়ে ওদের দিকে চলেছে। ওর শরীরটা দুলছে। বাবা মারিয়া ও দূরে মা–হাসছে। ফ্রান্সিস এগিয়ে চলেছে। আস্তে আস্তে।
সামনেই পুয়েবেলা নদীর সেতু। শাঙ্কো আর হ্যারি ঘোড়া থামাল। শাঙ্কো ঘোড়া থেকে নামল। তারপর ফ্রান্সিসকে ঘোড়ার ওপর শুইয়ে দিল। ফ্রান্সিসকে ধরে ধরে ঘোড়াটাকে আস্তে আস্তে চালিয়ে নিয়ে সেতুটা পার হল। হ্যারিও ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে সেতু পার করাল।
তারপর আবার ঘোড়ায় চড়ল দুজনে। যখন ওরা সেই শুকনো পাতাঝরা বনে ঢুকল তখন বিকেল হয়ে এসেছে। কিছুদিন আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। তবু বনের গাছ-গাছালি ঝোঁপঝাড় সব শুকিয়ে আগের মত হয়ে গেছে। বনের গাছ গাছালি লতাপাতার মধ্যে দিয়ে ঘোড়া চালানো যায় না। দুজনে ঘোড়া থেকে নামল। বনের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে ঘোড়া হাঁটিয়ে নিয়ে এল। বন শেষ হল। ঘোড়া চালিয়ে ওরা চোলুলায় ঢুকল। ওদের পাথরের ঘরটার সামনে এসে থামল। হ্যারি দেখল চোলুলার অনেক স্ত্রী-পুরুষ ছুটে আসছে। হ্যারি আর শাঙ্কো দুজনেই তখন ভীষণ পরিশ্রান্ত। ওরা দুজনে ঘোড়া থেকে নামল। ধরাধরি করে ফ্রান্সিসের অচেতন দেহটা ওরা ঘোড়ার পিঠ থেকে নামাল। নিয়ে চলল ঘরের মধ্যে। ঘরে ঢুকে ঘাসের বিছানায় ফ্রান্সিসকে শুইয়ে দিল। ফ্রান্সিসের কপালে হাত দিল হ্যারি। জুরে গা পুড়ে যাচ্ছে। ক্লান্ত হ্যারি আর শাঙ্কো ফ্রান্সিসের পাশে শুয়ে পড়ল। হ্যারি চোখ বুজল। শুনতে পাচ্ছে দরজার কাছে দাঁড়ানো স্ত্রী-পুরুষরা ওদের ভাষায় কী বলাবলি করছে। একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধাই বোধহয় চীৎকার করে হ্যারিদের কী জিজ্ঞেস করল। হ্যারির কোন কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। ও বুঝতেও পারল না কী জিজ্ঞেস করছে। ক্লান্ত স্বরে হ্যারি বলল-রাজবৈদ্যকে ডাকো। কিন্তু ওর কথা কেউ ভালো শুনতে পেল না আর শুনলেও বুঝতো না।
কতক্ষণ এভাবে কেটেছে হ্যারি জানে না। হঠাৎ দরজার কাছে দাঁড়ানো লোকজনদের চ্যাঁচামেচি বন্ধ হয়ে গেল। সবাই সরে দাঁড়াল। রাজা হুয়েমাক ঘরে কলেন। কাছে এসে বিছানায় বসলেন। আস্তে আস্তে বললেন–বন্ধুরা–শরীর ভালো নেই? হ্যারি রাজার গলা শুনে কষ্ট করে উঠে বসল। মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানাল। ক্লান্তস্বরে বলল–ফ্রান্সিস ভীষণ অসুস্থ। রাজবৈদ্যকে ডাকুন। রাজা দরজার দিকে তাকিয়ে কী বলে উঠলেন। একজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা ছুটে চলে গেল। তার মুখ গম্ভীর হল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন–তোমরা?
আমরা ভালো। শুধু ভীষণ ক্লান্ত আমরা। হ্যারি বলল। রাজা উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–বিশ্রাম–খাবার। তারপর বললেন–চারজন ননোয়াক্লা যোদ্ধা–বন্দী ছিল।
-ওরা পালিয়েছে–চলে আসবে। হ্যারি বলল।
রাজা হাসলেন। বললেন–আমার সন্তান।
তারপর রাজা হুয়েমাক চলে গেলেন।
একটু পরেই রাজবৈদ্য এল। ফ্রান্সিসের কপালে গলায় হাত দিয়ে পরীক্ষা করল। তার আগের মতই শুকনো ফল গুঁড়িয়ে ওষুধ তৈরী করল। ওষুধের লেই লাগিয়ে দিল ফ্রান্সিসের পায়ের কাটা জায়গায়। ফ্রান্সিস একটু কঁকিয়ে উঠল। তারপর রাজবেদ্য ফ্রান্সিসকে হ্যারির শাঙ্কোর ছড়ে যাওয়া কনুই হাঁটু জল ন্যাকড়ায় ভিজিয়ে আঠামত ওষুধ লাগিয়ে দিল। তারপর হ্যারিকে চারটে কালো কালো বড়ি দিল। ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে খাইয়ে দিতে বলল। রাজবৈদ্য চলে গেল।
দুজন পাহারাদার ওদের খাবার দিয়ে এল। ঘরে মশাল জ্বালিয়ে দিল। রাত হল। হ্যারি ইঙ্গিতে ওদের খাবার রেখে খেতে বলল। ওরা খাবার-জল রেখে চলে গেল।
রাত বাড়তে লাগল। হ্যারির ক্লান্তি অনেকটা দূর হয়েছে। কনুই হাঁটুর জ্বালাও অনেকটা কমেছে। শাঙ্কোও উঠে বসল। ওরও শরীর ভালো লাগছে এখন। হ্যারি ফ্রান্সিসের কপালে হাত দিল। জ্বর কমেছে অনেক। তখনই ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর চোখ মেলে তাকাল। হ্যারি ডাকল–ফ্রান্সিস?
