ফ্রান্সিস বলল–কোনো লাভ নেই ওকে ডেকে। ও এখন গুপ্তধনের লোভে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। ওকে বাধা দিতে গেলে ও তোমাকেই মেরে ফেলবে।
ততক্ষণে বারিনথাস ঐ মুখটার কাছে পৌঁছে গেছে। পাগলের মতো এলো। পাথাড়ি কুড়ুলের ঘা মারতে শুরু করল। একটু পরেই কুচি পাথর পড়তে শুরু করল। তারপরই গাঢ় সবুজ রঙের বিষাক্ত জলের ধারা। জলের ধারা প্রথমেই পড়ল বারিনথাসের মুখে, শরীরে, বারিনথাসের শরীর থেকে ধোঁয়া উঠতে লাগল। সতীক্ষ্ণ আর্ত চিৎকার করে বারিনথাস সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নীচে ধুলোর মধ্যে পড়ে গেল। দুএকবার ঝাঁকুনি খেয়ে বারিনথাসের দেহ স্থির হয়ে গেল। তখনও বিষাক্ত জলের ধারা নামছে। তবে পরিমাণে বেশী নয়।
এদিকে বারিনথাসের এই ভয়াবহ মৃত্যু দেখে রাজা ও সৈন্যরা ভয় পেয়ে গেল। চারিদিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ রাজা ছুটলেন সুড়ঙ্গ থেকে বেরোবার সিঁড়ির দিকে। তার পেছনে সৈন্যরাও হাতের কুড়ুল ফেলে দিয়ে ছুটল। শাঙ্কো ধনুকে তীর পরাল। ওদের দিকে নিশানা করল। ফ্রান্সিস ডান হাত তুলল–শাঙ্কো, তীর ছুঁড়ো না। ওদের যেতে দাও।
রাজা ও সৈন্যরা পালিয়ে গেল। শাঙ্কো ধনুক নামাল।
হ্যারি বলল–ঐ বিষাক্ত জলে সুড়ঙ্গ ভেসে যাবে না তো?
অনেক দিন লাগবে। দেখছো না এক হাঁটু ধুলো, সব জল শুষে নেবে। ফ্রান্সিস বলল–তবু আমাদের তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে।
–এখন কী করবে?
–দেবমুর্তির আর একটা হাত খুঁজতে হবে। চলো সুড়ঙ্গর শেষ পর্যন্ত দেখি।
আবার চলল তিনজনে। ধুলোর মধ্যে তিনজনেরই হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। তবে অসুস্থ ফ্রান্সিসের কষ্ট হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তবু ও তা বুঝতে দিল না। বাঁ পাটা টেনে টেনে দাঁতে দাঁতে চেপে ও হাঁটতে লাগল।
একটু এগিয়ে আবার পাথরের সিঁড়ি। ওপরে সেই গোলমতো জায়গাটা পর্যন্ত উঠে গেছে। ওরা দাঁড়াল না। হাঁটতে হাঁটতে সুড়ঙ্গের শেষ পর্যন্ত গেল। আবার পাথুরে সিঁড়ি উঠে গেছে। ওপরটায় সেই গোলমতো জায়গা।
সুড়ঙ্গ শেষ। ফ্রান্সিস বলল–দেখা যাচ্ছে তিনটি সিঁড়ি আছে। তিনটি সিঁড়ির মাথায় গোলমতো জায়গা। একটা তো দেখা গেল। বিষাক্ত উপত্যকার জল বেরিয়ে এল। বাকী রইলো দুটি। কুড়লের ঘা দিয়ে পরীক্ষা করবার উপায় নেই। আস্তরণ ভেঙ্গে বিষাক্ত জল নেমে আসতে পারে। কাজেই আগে দেখতে হবে কোন গোল জায়গাটায় ঘা মারবো। একটু থেমে বলল–হ্যারি, ছড়ার পরের অংশটা বলো তো।
হ্যারি বলতে লাগল–
এক হাত ধুলিময়
মুখ নয় কথা কয়
আঙুল তুলে হে–
কোন ভুলে হে–
পাথরেতে মনসা গাছ
কিম্ভুত কিম্ভুত।
ফ্রান্সিস বলল-চলো ফেরা যাক। মশালগুলো ভালো করে ধরো। তোমরা চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে চলো। আমিও দেখছি।
ওরা ফিরে আসতে লাগল। তখনই হঠাৎ ফ্রান্সিসের মাথাটা ঘুরে উঠল। চোখের সামনে দুলতে লাগল সুড়ঙ্গের পাথরে দেওয়াল, ধুলোর ঢিবি, সিঁডি, সিঁডির মাথায় গোলমত জায়গাগুলো। ধুলোর ওপর গড়িয়ে পড়ে যেতে যেতে ফ্রান্সিস কোনরকমে পাশের পাথুরে দেওয়ালে হাত রেখে নিজেকে সামলাল। ধুলোর ওপর দিয়ে ছুটে এসে শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে ধরে ফেলল। হরি বলল–ফ্রান্সিস–আর নয়। এখন পালাই চলো। তোমার শরীরের যা অবস্থা তাতে তোমার চিকিৎসা এখুনি প্রয়োজন। নইলে তোমাকে বাঁচানো যাবে না।
কিন্তু এতটা এগিয়ে মানে আর একটামাত্র সুত্র। তাহলেইসব রহস্যের সমাধান। ফ্রান্সিস ক্লান্তস্বরে বলল।
–না ফ্রান্সিস–এখন আমরা পালিয়ে গেরুয়া পাহাড়ে চলে যাবো। শাঙ্কো বলল।
–না-না–চোলুলা যাবে। চিকিৎসা হবে, বিশ্রাম নেব-সুস্থ হয়ে আবার আসবো শেষ সূত্রটা সমাধানের জন্যে। ফ্রান্সিস খুব দুর্বলকণ্ঠে বলল।
–বেশ-এখন ভাবছি সুড়ঙ্গের বাইরে বেরুলে রাজা কালহুয়ানের সৈন্যরা যদি আক্রমণ করে? হ্যারি বলল।
–যে কজন সৈন্য এখানে নেমেছিল তারা বারিনথাসের ভয়াবহ মৃত্যু দেখেছে। এতক্ষণে অন্য সৈন্যরা সে খবর পেয়েছে। আমার তো মনে হয় ভয়ে ওরা কেউ ধারে কাছে নেই। তবু শাঙ্কো তীর ধনুক নিয়ে তুমি সামনে থাকো। কথাগুলো বলে ফ্রান্সিস হাঁপাতে লাগল। যন্ত্রণায় ওর মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। ভালো করে তাকাতে পারছে না পর্যন্ত।
ওরা আস্তে আস্তে মন্দিরের চত্বরে ওঠার সিঁড়ির কাছে গেল। প্রথমে উঠতে লাগল শাঙ্কো তীর ধনুক বাগিয়ে। তারপরে ডানহাতে খোলা তরোয়াল আর বা হাতে ফ্রান্সিসকে ধরে ধরে হ্যারি উঠতে লাগল।
মন্দিরের চত্বরে উঠে ওরা দেখল কোথাও কোন সৈন্যের চিহ্নমাত্র নেই। আস্তে আস্তে কোয়েতজালের মূর্তির কাছে এল ওরা। দেখল একা রাজা কালহুয়াকান দেবমূর্তির বেদীর কাছে মাথা নীচু করে বসে আছে। দুহাত ওপরে তোলা। রাজা ওদের দিকে ফিরেও তাকাল না। মুখে বিড় বিড় করে কী বলছে।
ওরা আস্তে আস্তে মন্দিরের বাইরের দিকে চলল। শাঙ্কো চারদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছিল। ফ্রান্সিস খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলল। নিজেকে ওর এত ক্লান্ত এত দুর্বল মনে হচ্ছিল যে পারলে ওখানেই শুয়ে পড়ে।
মন্দিরের বাইরে এল ওরা। মন্দিরের সিঁড়ি, সামনের প্রাঙ্গণ কোথাও কোন সৈন্য বা পাহারাদার কেউ নেই। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–শাঙ্কো এই সুযোগ। শিগগির তিনটে ঘোড়া জোগাড় কর।
শাঙ্কো ধনুকটা কাঁধে ঝুলিয়ে, তীরগুলো কাঁধের খাপে রেখে ছুটে গেল। লোকেরা এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে তখনই দেখল আগুনেপোড়া গারদঘরের ওপাশে তিন চারটে ঘোড়া একটা খুঁটিতে বাঁধা। ঘোড়াগুলোর পিঠে খড়ভরা মোটা কাপড়ের জিন। শাঙ্কো ছুটে গেল। দড়িগুলো খুঁটি থেকে দ্রুতহাতে খুলে নিল। তারপর তিনটে ঘোড়াকে টানতে টানতে মন্দিরের সিঁড়ির কাছে নিয়ে এল। প্রথমে হ্যারি আর শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে একটা ঘোড়ায় তুলে দিল। তারপর কোমরে তরোয়াল খুঁজে হ্যারি আর একটা ঘোড়ার পিঠে উঠল। শাঙ্কোও দ্রুত অন্য ঘোড়ার পিঠে উঠল। এখানে ওখানে তলতেক স্ত্রীপুরুষরা জটলা করছিল। ওরা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। কেউ কোন কথা বলল না। ওরা বোধহয় বারিনথাসের অপমৃত্যুর কথা আলোচনা করছিল।
