একটু পরেই মোটা মত একটা লোক এল। লোকটা তখনও বেশ হাঁপাচ্ছে। বোধহয় রাজার ডাক পেয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে। ওর হাতে একটা পুটুলি। বোঝা গেল বদ্যি।
বদ্যিকে হ্যারি ফ্রান্সিসের পায়ের ক্ষতস্থানটা দেখাল। বদ্যি পুঁটুলিটা পাশে রেখে বসে পড়ল। ক্ষতস্থানটা ভালো করে দেখল। তখনও ক্ষতস্থান থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। এবার বদ্যি পুঁটুলি খুলল। দুটো চ্যাপ্টামত পাথর বের করল। সে দুটো মেঝেয় রেখে পুঁটুলি থেকে দুটো ছোট গোল শুকনো ফল বের করল। তারপর বের করল একটা কাঠের মুখটাকা পাত্র। ফল দুটো একটা চ্যাপ্টা পাথরে রেখে অন্য পাথরটা দিয়ে চেপে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলল। এবার কাঠের পাত্র থেকে একটা তেলের মত জিনিস গুড়োটায় ঢালল। মাখাল। তারপর ওটা নিয়ে আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের ক্ষতস্থানে চেপে চেপে লাগিয়ে দিতে লাগল। ওষুধটা লাগাতেই ফ্রান্সিস যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। সবটা ওষুধ লাগাতেই ফ্রান্সিসের জ্বালা যন্ত্রণা অনেক কমে গেল। একটা ঠাণ্ডা ভাব ক্ষতস্থানটায়। ফ্রান্সিস বদ্যির দিকে তাকিয়ে হাসল। বদ্যিও হাসল। তারপর সব জিনিসপত্র পুঁটুলিতে ভরল। উঠে দাঁড়িয়ে রাজাকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। তারপর চলে গেল। রাজা ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বললেন–এই যোদ্ধারা-অনুগামী–ননোয়াক্লা–তোমাদের বিশ্রাম-ব্যবস্থা করবে। রাজা যযাদ্ধাদের দলনেতাকে কী বললেন। দলনেতা এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসকে আস্তে ধরে ধরে তুলল। ফ্রান্সিসের ডান হাতটা নিজের কাঁধে দিয়ে হ্যারি আর শাঙ্কোকে পেছনে পেছনে আসতে ইঙ্গিত করল। দলনেতা ফ্রান্সিসকে ধরে নিয়ে চলল।
ওরা রাজবাড়ির বাইরে এল। সিঁড়ি দিয়ে নামল। তারপর ডানদিকে চলল। এদিকেও একটা পাথরের সিঁডিওলা বাড়ি। ফ্রান্সিসরা ঠিক বুঝল না এটা কীসের। বাড়ি। হ্যারি দলনেতাকে ইঙ্গিতে বাড়িটা দেখিয়ে জানতে চাইল এটা কী। দলনেতা কী বলে গেল। তার মধ্যে কোয়েতজাল কথাটা ওরা বুঝল। তার মানে এখানেও জীবন ও মৃত্যুর দেবতা কোয়েতজালের মন্দির আছে।
বেশ কয়েকটা বড় পাথরের ঘর বাড়ি ছাড়িয়ে একটা বাড়ির সামনে এসে দলনেতা থামল। বাড়ির দরজাটা চ্যালা কাঠের। দলনেতা গিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল। ভেতরে ঢুকল। ফ্রান্সিসরাও ভেতরে ঢুকল! একজন সৈন্য একটা মশাল জ্বেলে ঘরের পাথুরে দেয়ালের খাঁজে রাখল। দেখা গেল ঘরটা মোটামুটি পরিচ্ছন্ন। একপাশে শুকনো ঘাসের বিছানা। তার ওপর মোটা সুতীর কাপড় বিছানো।
দলনেতা ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসদের জানাল এই ঘরেই ফ্রান্সিসরা থাকবে। ওদের খাবারদাবার এই ঘরে নিয়ে আসা হবে। এখানেই ওরা খাবে থাকবে। দলনেতা তার সৈন্যদের নিয়ে চলে গেল। শুধু একজন সৈন্যকে রেখে গেল ফ্রান্সিসদের দেখাশোনা করার জন্যে।
ফ্রান্সিস আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। কোমর থেকে তরোয়াল খুলে হ্যারিকে দিল। তারপর আস্তে আস্তে ঘাসের বিছানায় বসল। তারপর শুয়ে পড়ল। হ্যারি ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোর তুলনায় বরাবরই দুর্বল। হ্যারিও খুব ক্লান্তিবোধ করছিল। ও বিছানায় পা ছড়িয়ে বসল। শাঙ্কোও বসল। ফ্রান্সিস ক্লান্তস্বরে বলল–হ্যারি-রাজা হুয়েমাকের সব কথা বুঝলে?
–হ্যাঁ–কিছু কিছু বোঝা গেল। আগে হুয়েমাক কালহুয়াকান উপাধি নিয়ে তুলার রাজা ছিলেন। বারিনথাস ওঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। ছোটভাইকে সেই ষড়যন্ত্রে সঙ্গী করে নেয়। তারপর ছোটভাই তলতেক সৈন্যদের রাজা হুয়েমাকের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে। অবশ্যই তাকে সাহায্য করে বারিনথাস। রাজা হুয়েমাক তার অনুগত ননোয়াক্লা যোদ্ধাদের নিয়ে তুলা থেকে পালিয়ে আসেন এই চোলুলায়। নতুন বসতি গড়ে তোলেন অনুগত যোদ্ধা আর প্রজাদের নিয়ে। তুলায় রাজা হন তার ছোটভাই রাজ পরিবারের প্রচলিত পদবী কালহুয়াকান নামে পরিচিত হন। ফ্রান্সিস বলল–তুমি ঠিক বুঝতে পেরেছো কী ঘটেছিল। তবে এই সবকিছুর পেছনে কলকাঠি নেড়েছে বারিনথাস। তাই রাজা হুয়েমাক বলেছিলেন–বারিনথাস মন্দ যদিও এই বারিনথাসের কাছে উনি স্পেনীয় ভাষা শিখেছেন। শাঙ্কো বলল–তাহলে তো এই চোলুলায় অধিবাসীরাও তলতেক উপজাতির লোক।
–হ্যাঁ ঠিকই বলেছে। তবে এখানে রাজা হুয়েমাকের অনুগামী যোদ্ধাদের নাম ননোয়াক্লা। ফ্রান্সিস বলল।
একটু রাত হতেই দুজন লোক ফ্রান্সিসদের ঘরে এল। চীনেমাটির থালায় খাবার নিয়ে এল ওরা। একটা মাটির বড় হাঁড়িতে করে জল। খাবার হচ্ছে ভুট্টার রুটি, কীসের মাংস, ধান টিয়া টমেটো। তিনজনে আস্তে আস্তে খাওয়া শেষ করল। তিনজনেরই প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। জল খেতে গিয়ে মুস্কিল হল। জলের পরিমাণ কম। তিনজনে খাওয়ার পর আর সামান্য জল রইল। শাঙ্কো ইঙ্গিতে হাঁড়ি তুলে জল চাইল। লোক দুটি মাথা নাড়ল। বোঝা গেল আর জল দিতে পারবে না। ফ্রান্সিস বলল–ঠিক আছে এই জলেই আমরা চালিয়ে নেব। লোক দুটো এঁটো বাসনপত্র নিয়ে চলে গেল।
ঘরের কোনায় অনেক বড় বড় শুনো ঘাস জড়ো করা ছিল। সেসব এনে ছড়িয়ে পেতে বিছানাটা বড় করা হল। তার উপর কাপড় পেতে তিনজনে শুয়ে পড়ল। হ্যারি ডাকল-ফ্রান্সিস?
–হুঁ। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে পাশ ফিরল?
–এখন কেমন আছো? হ্যারি বলল?
–অনেকটা ভালো।
–খাওয়া দাওয়া তো মোটামুটি ভালোই কিন্তু খাবার জল এত কম দিচ্ছে কেন? হ্যারি বলল।
