ফ্রান্সিসদের নিয়ে যোদ্ধার দল একটা বড় পাথরের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়িটার সামনে পাথরে বাঁধানো সিঁড়ি উঠে গেছে। সবাই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। একটা বিরাট দরজা সামনে। এবড়ো খেবড়ো কাঠের দরজা। দরজার কাঠ ভালো করে চাঁছা হয়নি। দরজার দুদিকে দেয়ালে মশাল জ্বলছে। বর্শা হাতে দুজন দ্বারী দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ঢুকল ওরা।
পাথরে বাঁধানো মেঝে। বিরাট লম্বাটে ঘর। দুদিকে মশাল জ্বলছে। মশালের আলোয় দেখা গেল ঘরের শেষ দিকে একটা কাঠের সিংহাসন। রঙ-বেরঙের মোটা কাপড়ে ঢাকা। পালকের গদী। যোদ্ধাদের দলনেতা ফ্রান্সিসদের সিংহাসনের সামনে দাঁড়াতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস আস্তে বলল, বোধহয় রাজার বাড়ি–এটা রাজ দরবার।
-আমারও তাই মনে হচ্ছে। হ্যারিও গলা নামিয়ে বলল।
যোদ্ধারা সবাই পিছিয়ে দাঁড়াল। সামনে রইল শুধু দলনেতা।
একটু পরেই ও পাশের পাথরের থামের দিক দিয়ে একজন ঢুকল। তার পরনে নানারঙের জমকালো পোশাক। মাথায় লাল কাপড়ের ফেট্টি। তাতে নানারকম রঙীন পাখির পালক গোঁজা। বোঝা গেল ইনিই রাজা। ততক্ষণে সব যোদ্ধারা দলপতি দুহাত সামনে মেলে মেঝেয় হাঁটুগেড়ে মাথা নিচু করল। রাজা আস্তে আস্তে গিয়ে সিংহাসনে বসলেন। এবার সবাই উঠে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিস রাজাকে দেখছিল। রাজার বয়েস হয়েছে। চোখে মুখে বয়েসের ছাপ পড়েছে। তবে বেশ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। এই বয়েসেও শরীর ঋজু। চলাফেরা বসায় বেশ স্বচ্ছন্দ।
রাজা একটুক্ষণ ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে রইল। ওদিকে যোদ্ধাদের দলনেতা তাদের ভাষায় কী বলে যেতে লাগল। দলনেতা থামল। রাজা মৃদু হাসলেন। ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বললেন–তোমরা–বিদেশী? ফ্রাসিস এটা ভাবেনি। ও ভহিন কা করে রাজাকে সব কথা বলবে। এখন রাজা স্পেনীয় ভাষা বলার ও একটু চমক!ল। খুশও ইল যে রাজা স্পেনীয় ভাষা জানেন। রাজা বললেন–আমাকে সম্মান। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–হ্যারি শাঙ্কো-একটু মাথা নইয়ে শ্রদ্ধা জানাও। তিনজনেই একটু মাথা নুইয়ে আবার সোজা করল। রাজা বললেন–গুনলাম কেন এসেছো? ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে স্পেনীয় ভাষায় সব ঘটনা বলল। রাজা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন–বারিনথাস—স্পেনীয় ভাষা শিখিয়েছে। বারিনথাস মন্দ–। তুলার রাজা-কালহুয়াকান–ছোটভাই। বারিনথাস–ভাইর মন বিষিয়ে–আমাকে দেশত্যাগী। এখানে নতুন রাজ্য স্থাপন–চোলুলা। আমি রাজা হুয়েমাক। যোদ্ধাদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল–আমার প্রজা শ্রদ্ধা করে–ভালোবাসে। একটু থেমে রাজা বললেন–আজ তুলায়-যুদ্ধ হয়েছে–আমার যোদ্ধা–কালহুয়াকানের যোদ্ধা–ফলাফল এখনও জানি না। ফ্রান্সিস বলল, রাজা হুয়েমাক আমরা পালাবার সময় যুদ্ধক্ষেত্রের কাছ দিয়েই এসেছি। দেখেছি আপনার সৈন্যদলকে যুদ্ধ করতে। কিন্তু–
–কিন্তু? রাজা হুয়েমাক সপ্রশ্নদৃষ্টিতে তাকালেন?
–কিন্তু আপনার সৈন্যরা বোধহয় হেরে গেছে। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা আস্তে আস্তে মাথা নিচু করলেন। তারপর আস্তে আস্তে মুখ তুললেন। তাঁর দুচোখ ছলছল করছে। ভারী গলায় বললেন–
–মারা গেছে? সবাই?
–না-না। ফ্রান্সিস বলে উঠল–অনেক যোদ্ধাকে আমরা আত্মরক্ষার জন্যে সরে যেতে দেখেছি।
–কিন্তু কেউ ফিরল না–এখনও। রাজা বিষণ্ণস্বরে বললেন।
এবার ফ্রান্সিস সমস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পারলো। যে যোদ্ধারা শুকনো বনের মধ্যে ছিল ওরা অপেক্ষা করছিল যারা যুদ্ধে গেছে তাদের জন্যে। হয়তো সেই যযাদ্ধারা আহত হয়ে ফিরে এলে এরা তাদের জায়গায় যেতো। কিন্তু ফ্রান্সিসরা দড়ির সেতু কেটে ফেলেছিল। তাই পরাজিত যযাদ্ধারা কেউ এই পথে ফিরতে পারেনি। সেইজন্যে বৃদ্ধ বৃদ্ধারা স্ত্রীলোকেরা এই যযাদ্ধাদের ঘিরে সাগ্রহে জানতে চাইছিল সেই যোদ্ধারা কেউ ফিরছে কি না। এই যোদ্ধারা বলেছিল কেউ ফেরে নি। তাই স্ত্রীলোকদের মধ্যে কান্নার রোল উঠেছিল। ফ্রান্সিস বলল–রাজা হয়েমাক–আপনাকে আমি বলেছি একটা পাহাড়ি নদী পেরিয়ে আমরা এসেছি।
–পুয়েবেলা নদী। রাজা বললেন।
–নদীটার ওপর দিয়ে কীভাবে এসেছি বলিনি। নদীটার ওপর একটা দড়ির সেতু ছিল। আমরা সেটা কেটে ফেলে–ঝুলতে ঝুলতে এপারে এসেছি। সেটা নেই তাই আপনার সৈন্যদল আসতে পারেনি।
রাজা বললেন–সেতু নেই–অনেক ঘুরে-আসবে। দেরী হবে। প্রজারা ভালোবাসে–তুলা থেকে নির্বাসিত–আমি–সঙ্গে এসেছে–আমার সন্তানতুল্য-কোয়েতজাল রক্ষা করবেন। রাজা মাথা নীচু করলেন।
ফ্রান্সিস একটু নিশ্চিন্ত হল। কথার ও ব্যবহারে বোঝা যাচ্ছে রাজা হুয়েমাক ময়টা ভাল। ওদের কোন ক্ষতি করবে না! এতক্ষণে ফ্রান্সিস পায়ের যন্ত্রণার তীব্রতা অনুভব করল। ও পায়ের দিকে তাকাল। দেখল চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। ফ্রান্সিস বাজার দিকে তাকিয়ে বলল–রাজা হুয়েমোক–আমি খুব অসুস্থ একটু বিশ্রাম করতে চাই। রাজা বললেন–কী অসুখ? হ্যারি বলে উঠল–পালাতে গিয়ে আমার বন্ধুর পায়ে বর্শা বিঁধেছে। হ্যারি নীচু হয়ে ফ্রান্সিসের পায়ের স্থান দেখাল। রাজা দ্রুত কী বলে উঠলেন দুজন যোদ্ধা বেরিয়ে গেল। রাজা বললেন–বদ্যি-চিকিৎসা বসো। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে মেঝেতেই বসে পড়ল। আহত পাটা অসাড় লাগছে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। হ্যারিও ওর পাশে বসল।
