–হ্যারি–সেতু পেরিয়ে আসার সময় মনে আছে একটা বনের মধ্যে দিয়ে আমরা এসেছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ–একেবারে শুকনো পাতা ঝরা বন।
–তার মানে দীর্ঘকাল এই চোলুলায় বৃষ্টি হচ্ছে না। দেখনি পাথরের বাড়ি ঘরগুলোয় কেমন ধুলোটে আস্তরণ পড়ে গেছে। তাই এই অঞ্চলে জলকষ্ট দেখা দিয়েছে। হয়তো অনেক দূর থেকে জল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ধারে কাছের ঝর্ণাগুলো বোধহয় শুকিয়ে গেছে।
–ঠিক বলেছো। হ্যারি বলল।
অনেক রাত তখন। হঠাৎ ঘোড়র পায়ের শব্দে ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও কান পেতে রইল। বেশ কয়েকটা ঘোড়ার পায়ের শব্দ এসে বাইরের প্রান্তরটায় থামল। লোকজনের হাঁক ডাক শোনা গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে বাইরে লোকজনের ছুটোছুটির শব্দ পাওয়া গেল। ফ্রান্সিস উঠে বসল। মশালের আলোয় দেখল হ্যারি আর শাঙ্কো নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে উঠল। তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে দরজার কাছে গেল। দরজার হুড়কো খুলল। দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল। দেখল চাঁদের নিস্তেজ আলোয় সামনের খোলা জায়গাটায় অনেক লোকজন জড় হয়েছে। অনেকের হাতে মশাল। অনেকে মশাল হাতে ছুটোছুটি করছে। আহত লোকজনের গোঙানি শোনা যাচ্ছে। তাহলে তুলার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যোদ্ধারা ফিরে এসেছে।
ঘুম ভেঙে হ্যারি আর শাঙ্কো এসে ফ্রান্সিসের পাশে দাঁড়াল। হ্যারি বলল–কী ব্যাপার?
–তুলাতে যুদ্ধ হচ্ছিল আমরা দেখে এসেছিলাম। এদিকে ফেরার পথের দড়ির সেতুটা আমরা কেটে দিয়েছিলাম। তাই ননোয়াক্লা যোদ্ধারা অনেক ঘুরে পুয়েবেলা নদী পেরিয়ে এসেছে। অনেকেই যুদ্ধে আহত। যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরার পথেও অনেকে মারা গেছে বোধহয়। ফ্রান্সিস বলল।
–আমার খুব চিন্তা হয়েছিল আবার কোন ঝামেলায় পড়লাম। হ্যারি বলল?
–চলো আমরা যতটা পারি ওদের সাহায্য করি। ফ্রান্সিস বলল।
ওরা তিনজনে লোকজনের ভীড়ের দিকে গেল। দেখল একজন স্ত্রীলোক একজন মৃত ননোয়াক্লা যোদ্ধার বুকের ওপর পড়ে পাগলের মত কাঁদছে। আরো কয়েকজন স্ত্রীলোক বুক চাপড়ে কাঁদছে। তাদের স্বামীপুত্র বা আত্মীয়স্বজন কেউ হয়তো ফিরে আসেনি।
কোয়েতজাল মন্দিরের সামনের পাথরের সিঁড়ির ওপর আহতদের শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজবদ্যি তার শিষ্য বদ্যিদের নিয়ে আহতদের চিকিৎসা করছে। ওর দম ফেলার ফুরসত নেই।
ফ্রান্সিসরা দেখে আশ্চর্য হল রাজা হুয়েমাক সঙ্গে কয়েকজন গণ্যমান্য সঙ্গী নিয়ে ঘুরে ঘুরে আহতদের দেখছেন। কাউকে উৎসাহিত করছেন কাউকে সমবেদনা জানাচ্ছেন। রাজার গায়ে রাজকীয় পোশাক নেই। রাতে যে সাধারণ পোশাক পরে ঘুমিয়েছিলেন তাই পরেই চলে এসেছেন। রাজার সঙ্গী একজন রাজার সঙ্গে চলতে চলতে কী বলে যাচ্ছিল। ঐ সঙ্গীটি বোধহয় সেনাপতি। রাজাকে হয়তো যুদ্ধের বিবরণ দিচ্ছিল। রাজা শুনছিলেন আর মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছিলেন।
ফ্রান্সিসরা আহতদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একজন আহত ননোয়াক্লা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে কী বলল। ফ্রান্সিসরা বুঝল না। তখন যোদ্ধাটি ইঙ্গিতে ওকে তুলে বসিয়ে দিতে বলল। শাঙ্কো সেটা বুঝতে পেরে দ্রুত গিয়ে যোদ্ধাটিকে বসিয়ে দিল। লোকটি তখন হাতের ইঙ্গিতে জল খেতে চাইল। ফ্রান্সিস বলল-শাঙ্কো যাও আমাদের ঘর থেকে জলের হাঁড়িটা নিয়ে এসো। শাঙ্কো দ্রুত ছুটে গিয়ে জলের হাঁড়িটা নিয়ে এল। পিপাসার্ত আহত যোদ্ধাটি সাগ্রহে জল খেল। ওকে জল খেতে দেখে চার পাশের আহত যোদ্ধাদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল–মাজাপান–মাজাপান। ফ্রান্সিসরা কথাটার অর্থ বুঝল না। কিন্তু অন্য আহতদের তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে জলের হাঁড়িটার দিকে ইঙ্গিত করছে দেখে বুঝল–ওরা মাজাপান মানে পানীয় জল চাইছে। ফ্রান্সিস জলের হাঁড়ি নিয়ে এগিয়ে গেল। কিন্তু কয়েকজনকে জল দিতেই হাঁড়ির জল শেষ হয়ে গেল। তখনও আহতদের মধ্যে গুঞ্জন চলছে–মাজাপান মাজাপান। ফ্রান্সিস অসহায় দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাচ্ছে তখনই দেখল রাজা হুয়েমাক ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফ্রান্সিস বলল, রাজা–আহতরা জল চাইছে। রাজা চিন্তাগ্রস্ত মুখে বললেন–জানি–নিরুপায়–বহুদিন–বৃষ্টি নেই-খরা ঝর্ণা সরোবর–শুকনো–অনেক দূরে-ঝর্ণা-জল-আনতে গেছে। ফ্রান্সিস বলল–রাজা এই সমস্যাটার কথা আহত ননোয়াক্লাদের বলুন। ওরা ভীষণ তৃষ্ণার্ত। রাজা আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বললেন–স্বাভাবিক ঘোড়ার পিঠে শুয়ে রাজপথ হেঁটে–আহতরা এসেছে। কথাটা শেষ করে রাজা নাহুয়াতল ভাষায় সেনাপতিকে কী বললেন। সেনাপতি চীৎকার করে কী বলতে লাগল। তার মধ্যে রাজা হুয়েমাক কথাটা ফ্রান্সিসরা বুঝল। সব চাকার কান্নাকাটি থেমে গেল। শুধু মৃদু গোঙানির শব্দ শোনা যেতে লাগল। রাজা হুয়েমাক সিঁড়িগুলোর মাথায় গিয়ে দাঁড়ালেন। দুহাত ওপরে তুলে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বেশ কিছুক্ষণ বক্তৃতার মত বললেন নাহুতল ভাষায়। রাজার কথা এতক্ষণ সবাই। চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনল। রাজার বক্তৃতা শেষ হলে আবার সবাই নিজের কাজ করতে লাগল। বোঝা গেল রাজা হুয়েমাক যুদ্ধ, জলের সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা এসব নিয়েই বলেছেন।
তখনই একজন ঘোড়সওয়ার সেখানে ঘোড়া ছুটিয়ে এল। তার পেছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা আর একটা ঘোড়া। সেটার পিঠে একটা বেশ বড় পীপে। বোঝাই গেল জলের পীপে। জনতার মধ্যে চাঞ্চল্য জাগল। মাটির আর চীনেমাটির বাটি নিয়ে অনেকে এ য়ে এল। পীপে থেকে জল বিতরণ শুরু হল। রাজা হুয়েমাক তখনও সঙ্গীদের নিয়ে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। বোধহয় বাকী রাতটুকু এখানেই থাকবেন। আহতদের মধ্যে জল বিতরণ শুরু হল। ফ্রান্সিস আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল রাত আর বেশি নেই। চলো–যতটুকু পারা যায় ঘুমিয়ে নি। তিনজনে নিজেদের ঘরে ফিরে এল। শুয়ে পড়বার আগে ফ্রান্সিস বলল—হ্যারি–হুয়েমাক একজন আদর্শ রাজা।
