পাথরের ওপর বসে তিনজনে একটু জিরিয়ে নিল। ফ্রান্সিসের পায়ের ক্ষতস্থান থেকে তখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পছে। ফ্রান্সিস বেশ দুর্বল বোধ করছে। কিন্তু হাত পা ছেড়ে বিশ্রাম করার সময় এখন নয়। সামনে এগোনো ছাড়া উপায় নেই। পেছনের সেতু তো ওরা কেটে ফেলেছে।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। বলল-চলো ঐ বনের দিকেই যাওয়া যাক। লোকালয় নিশ্চয়ই পাবো। কারণ এই পথটা দিয়ে তোক চলাচল করে। হ্যারি আর শাঙ্কোও উঠে দাঁড়াল। হ্যারি বলল, ফ্রান্সিস তুমি পারবে হাঁটতে? কতটা হাঁটতে হয় কে জানে। ফ্রান্সিস হাসল-না পারলে চলবে কেন। শাঙ্কো বলল–আমরা তোমাকে ধরে নিয়ে যাবো?
–না-না। চলো। ফ্রান্সিস খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল। হ্যারি আর শাঙ্কো চলল। হ্যারি বলল–এখন আমাদের দুটো জিনিস দরকার। ফ্রান্সিসের চিকিৎসা আর খাদ্য। আশ্রয় না জুটলেও ক্ষতি নেই। গাছতলায় শুয়ে পড়বে।
ওরা যখন বনের কাছে পৌঁছল তখনও সন্ধ্যে হয়নি। কিন্তু বনের বিরাট বিরাট গাছগাছালি আর ঝোঁপের নীচে এর মধ্যেই অন্ধকার জমাট বেঁধেছে। এতক্ষণ ওরা যা লক্ষ্য করেনি এবার সেটা লক্ষ্য করল। বনের সমস্ত গাছের লতার পাতা শুকিয়ে হলুদ হয়ে গেছে। গাছ লতার শুকনো পাতা নীচে মাটিতে স্তূপ হয়ে জমে আছে। অনেক গাছ-গাছালিতে একটা পাতাও নেই। শুকনো আঁকাবাঁকা ডাল উঁচিয়ে আছে আকাশের দিকে। মাঝে মাঝে শুকনো গরম হাওয়া ছুটে আসছে। শুকনো ডাল পাতায় শব্দ তুলছে। ওরা তিনজনেই অবাক হয়ে শুকনো বনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তখনই হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস এখানে প্রচণ্ড খরা চলছে। বোধহয় কয়েক বছর এদিকে এক ফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি। তাই বনটার এই অবস্থা।
ফ্রান্সিস বলল–ঠিকই বলেছো। অনাবৃষ্টির জন্যেই এই অবস্থা। এখন সমস্যা হল এই বনে বা ধারে-কাছে যারা থাকে তাদের তো পোচনীয় অবস্থা। আশ্রয় ও খাদ্য পাওয়া যাবে কি?
-চলো এগিয়ে যাই তো। দেখা যাক অবস্থাটা। হ্যারি বলল। ওরা বনের মধ্যে দিয়ে এগোতে লাগল। একে অন্ধকার। তার ওপর জমে থাকা শুকনো পাতায় হাঁটু অব্দি ডুবে যাচ্ছে। কাজেই চলার গতি কমে গেল। তবু চলল ওরা। রাত নামার আগে যদি একটা আশ্রয়, কিছু খাদ্য জল পাওয়া যায়। শুকনো ঝরা পাতার টিবির ওপর দিয়ে ওরা হেঁটে চলল। ফ্রান্সিসের কষ্ট–তে লাগল সবচেয়ে বেশী। একে কাটা ঘা তার ওপর শুকনো ডালপাতার ঘষটানি। যন্ত্রণা মাঝে মাঝে অসহ্য হয়ে উঠছে। তবু ফ্রান্সিস দাঁত চেপে কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগল। ও যদি শারীরিক কষ্ট বিন্দুমাত্রও প্রকাশ করে তাহলে হ্যারি শাঙ্কো দুজনেই অস্থির হয়ে পড়বে। কাজেই ফ্রান্সিস নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল। নিজের জ্বালা যন্ত্রণার কথা বলল না।
হঠাৎ দুপাশের শুকনো পাতায় জোরে শব্দ উঠল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে তরোয়াল খুলে ফেলে ডাকল–হ্যারি–শাঙ্কো। হ্যারিও ততক্ষণে তরোয়াল কোমর থেকে খুলে ফেলেছে। শাঙ্কোও তীর ধনুক নিয়ে তৈরী। বুনো জন্তু-জানোয়ারের আশঙ্কাই করছিল ওরা। কিন্তু বুনো জন্তু-জানোয়ার নয়। ঝরা পাতায় শব্দ তুলে জমাট অন্ধকারের মত একদল মানুষ ওদের ঘিরে ধরল। অন্ধকারে ফ্রান্সিসরা অনুমান করতে পারল না ওরা সংখ্যায় কত। মুহূর্তে লোকগুলো ওদের বুকের কাছে বর্শা উঁচিয়ে ধরল। ফ্রান্সিস এক মুহূর্ত ভাবল। তারপর তরোয়াল নামাল। চেঁচিয়ে বলল–হ্যারি শাঙ্কো-লড়াই নয়। হ্যারি তরোয়াল নামাল। শাঙ্কো তীর ধনুক নামাল।
লোকগুলোর মধ্যে একজন বর্শা হাতে এগিয়ে এল। ওদের ভাষায় চীৎকার করে কী বলল। ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝল না। চুপ করে রইল। সেই সবার সামনে এগিয়ে আসা লোকটা নিজের লোকদের দিকে ফিরে কী বলল। দুতিনজন এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসদের পিঠে বর্শার খোঁচা দিয়ে হাঁটতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা হাঁটতে লাগল। পেছনে লোকগুলো। শুকনো পাতায় জোর মড়মড় শব্দ উঠল। সবাই চলল।
শাঙ্কো চাপাস্বরে বলল–এরা কী করতে চায় আমাদের নিয়ে?
–কিছুই বুঝছি না। ফ্রান্সিস বলল?
–এদের হাতে মশাল-টশাল থাকলে তবু এদের ভালোভাবে জানতে পারতাম।
-পাগল হয়েছে শাঙ্কো। হরি বলল-এই শুকনো খটখটে বনে মশাল তো দূরের কথা এককণা আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়লে সমস্ত বন জ্বলে যাবে।
–দেখাই যাক না কোথায় নিয়ে যায়। একটা উন্মুক্ত প্রান্তরে এসে দাঁড়াল ওরা। এবার ফ্রান্সিসরা লোকগুলোকে দেখল। তলতেকদের মতই মোটা সূতীর কাপড় গায়ে কোমরে। মাথায় কাপড়ের ফেট্টি। তাতে পালক গোঁজা। হাতে বর্শা। বোঝা গেল এরা যোদ্ধা। প্রান্তরের পরেই দেখা গেল–পাথরের বাড়িঘর। ছাতগুলো পাথরের না। ঘাস পাতার। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। এখানে ওখানে মশাল জ্বলছে।
এই যোদ্ধাদের আসতে দেখে বাড়িঘর থেকে লোকজন বেরিয়ে এল। তাদের হাতে মশাল। স্ত্রীলোক, বৃদ্ধরা এই যোদ্ধাদের ঘিরে ধরল। তাদের ভাষায় নানা কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল। যোদ্ধারা ঐ ভীড়ের মধ্যে পথ করে ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল। যেতে যেতে যোদ্ধারা ভীড় করে আসা লোকজনদের কী বলতে লাগল। দু একজন স্ত্রীলোক চীৎকার করে কেঁদে উঠল। অন্যদের চোখমুখেও দুশ্চিন্তার ছাপ দেখা গেল। ফ্রান্সিসরা বুঝল কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু ঠিক বুঝল এখানকার মানুষগুলো এত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হল কেন? কী জানতে চাইছে ওরা?
