ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল–হ্যারি শাঙ্কো শিগগির এই কাছিটা কাটো। বলেই ও কাছির একটায় তরোয়ালের কোপ দিল। হ্যারিও তরোয়াল দিয়ে ঘা দিল। তরোয়ালের কোপে দড়ির ছিবড়ে বেরিয়ে গেল। শাঙ্কো তীর ধনুক কাঁধে ঝুলিয়ে কোমরে গোজা ছুরিটা বের করল। বলল-ফ্রান্সিস সেতুটা কাটতে চাইছো কেন?
সেতুটা কেটে এদিকের কাছি দুটো ধরে আমরা ঝুলে পড়বো। ঝুল খেয়ে ওপারের খাদের নীচের দিকে ঝোঁপ জঙ্গলে গিয়ে পড়বে। তারপর দড়ির সেতু বেয়ে ওপরে উঠে পালাবো। দড়ির সেতু ভেঁড়া হলে তিলতেক সৈন্যরা নদীখাত পেরোতে পারবে না।
শাঙ্কো হেসে বলল–সাবাস সাবাস। শাঙ্কো ওর ছোরা দিয়ে ঘষে ঘষে একটা কাছি কেটে ফেলল। অন্য কাছিটা তখন প্রায় কাটা হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস তারোয়াল কোমরে গুঁজল। হ্যারিও তরোয়াল কোমরে গুজল। ফ্রান্সিস বলল–কাছি আর দড়ির জাল ধরে ঝুলে পড়। হ্যারি আর শাঙ্কো খাদের মুখের কাছে কাটা কাছি আর জাল ধরে ঝুলে পড়ল। ফ্রান্সিসও ছুটে এসে ঝুলে পড়ল। ঠিক তখনই দুজন তলতেক সৈন্য ঘোড়া থেকে নেমে ছুটে এল ওদের ধরতে। কিন্তু ততক্ষণে তিনজনের ভারে অন্য অল্প কাটা কাছিটাও ছিঁড়ে গেছে। ছেঁড়া দড়ির সেতু ধরে ঝুলে নেমে তিনজন ওপারে পাথুরে দেয়ালের নীচের দিকে ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়ল।
তলতেক সৈন্যরা নদীখাতের মুখে দাঁড়াল। নীচে শুকিয়ে দেখল ফ্রান্সিসরা তলায় ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে ঝুলছে। সৈন্যরা ভাবতেও পারেনি ফ্রান্সিসরা এভাবে ওদের হাত থেকে পালাবে। তলতেক দৈন্যরা নদীখাদ-এর পাশ দিয়ে এদিক ওদিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দেখে এল। না : নদীখাদ পার হবার কোন উপায় নেই। সৈন্যরা কিছুক্ষণ ওখানে বিশ্রাম নিল। তারপর দল বেঁধে চলে গেল।
ছেঁড়া কাছি দড়ি ধরে ঝুলে নেমে ফ্রান্সিস হ্যারি শাঙ্কো ঝোঁপ জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়ল। তাতে ওদের হাত পা ছড়ে গেল। ফ্রান্সিসের আহত পায়েও একটা গাছের ডাল লাগল। আবার ঘা খাওয়া জায়গাটা থেকে রক্ত পড়তে লাগল। কিন্তু ফ্রান্সিস দাঁত চেপে সহ্য করতে লাগল। যাক–মৃত্যুর হাত থেকে তো বাঁচা গেছে। পায়ের ক্ষত শুকিয়ে যাবে। কিন্তু রাজা কালহুয়াকানের কয়েদ ঘরে বন্দী হলে জীবিত অবস্থায় আর ওরা বেরিয়ে আসতে পারতো না।
ফ্রান্সিস নীচের দিকে তাকালো। ছোট আঁকাবাঁকা নদীটা অনেক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যে উচ্চতায় ওরা দড়ির সেতু ধরে ঝুলছে সেখান থেকে হাত ফস্কে নীচে পড়লে ওদের শরীর গুঁড়িয়ে যাবে। নদীটার জলস্রোতে অনেক বড় বড় পাথরের বাধা। তীব্র গতিতে বয়ে যাওয়া নদীর জল সেই পাথরগুলোতে ঘা খাচ্ছে। জল ছিটকে উঠছে। তাই শব্দও হচ্ছে। ফ্রান্সিস স্পষ্ট সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।
এ সময় হঠাৎ হ্যারি বলে উঠল–ফ্রান্সিস–আমার মাথাটা কেমন ঘুরছে। ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি তুমি নীচের দিকে তাকিও না। তারপর বলল–হ্যারি শাঙ্কো–এবার দড়ির ফোকরে হাত-পা ঢুকিয়ে আঁকড়ে ধরে ওপরের দিকে উঠতে থাকো। ফ্রান্সিস প্রথম কিছুটা উঠে দেখাল কী ভাবে উঠতে হবে। হ্যারি আর শাঙ্কো সেভাবে উঠতে লাগল। উঠতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল। একদিকে নদীখাদের শুন্যতা অন্যদিকে তীব্র হাওয়া। দড়ির সেতুটা দোল খেতে লাগল।
আস্তে আস্তে ওরা উঠতে লাগল। একসময় ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি এখন কেমন আছো? হ্যারি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–একটু ভালো। কিন্তু ফ্রান্সিস আর কতটা উঠতে হবে? ফ্রান্সিস মাথা উঁচু করে দেখল। বলল–আর কিছুটা। কোন দিকে তাকিও না। শুধু উঠতে থাকো। সামনে দড়ির দিকে তাকিয়ে থাকো।
আবার আস্তে আস্তে সেতুর দড়ির জালে হাত পা রাখতে রাখতে ওরা উঠতে লাগল। হ্যারি কোনদিকে তাকাচ্ছিল না।
হঠাৎ দড়ির জাল শেষ। সামনেই একটা বড় পাথর। এবার টান দেওয়া দুটো কাছি বেয়ে বেয়ে ওরা পাথরটার ওপর টেনে-হিঁচড়ে শরীরটাকে নিয়ে উঠল। পা রাখল পাথরটায়। শাঙ্কো আর হ্যারি তখনও হাঁপাচ্ছে। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছে। ফ্রান্সিসও পরিশ্রান্ত। তবে শাঙ্কো আর হ্যারির মত কাহিল হয়ে পড়েনি। ওকে দুর্বল করে দিচ্ছিল পায়ের ক্ষতের যন্ত্রণাটা।
পাথরটার ওপর বসল তিনজনে–ভীষণ হাঁপাতে লাগল। পশ্চিম দিলে নদী খাদের কোনাকুনি সূর্য দিগন্তের অনেক কাছে নেমে এসেছে। সন্ধ্যে হতে খুব দেরী নেই। হ্যারি বলল
–ফ্রান্সিস-এ আমরা কোথায় এলাম?
–কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু বিশ্রাম করে চলো হাঁটতে থাকি?
–কোনদিকে? শাঙ্কো বলল।
-ঐ উত্তরদিকে। ফ্রান্সিস আঙুল তুলে দেখাল। ও দিকে দেখা গেল গম্ভীর বনাঞ্চল।
–কিন্তু ওদিকে কোথায় যাবো? শাকো বলল।
ফ্রান্সিস বলল–একটু বুদ্ধি খাটাও শাঙ্কো। এই পাথরটার ওপাশে তাকিয়ে দেখ–একটা অস্পষ্ট পায়ে চলা পথ। তার মানে এখান দিয়ে দড়ির সেতু পেনি লোকজন যাতায়াত করে। এই অস্পষ্ট পথটা ধরে যদি আমরা বনের মধ্যে এগোতে থাকি নিশ্চয়ই মানুষজনের বসতি পাবো সেটা বনের মধ্যেও হতে পারে, বনের শেষেও হতে পারে।
-কিন্তু সেই মানুষজন তো আমাদের সঙ্গে শত্রুতাও করতে পারে?–হ্যারি বলল।
–সেটাই স্বাভাবিক হ্যারি। ফ্রান্সিস বলল–আমরা বিদেশী বিধর্মী আমাদের এরা কেউ ডেকে খাদ্য ও আশ্রয় দেবে না। যদি দেয় ভালো, না দিয়ে আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার জন্য লড়াইয়ে মতে হবে। অবশ্য যদি ওরা সংখ্যায় অল্প হয়। সংখ্যায় বেশী হলে বনের আড়ালে আড়ালে পালাবো।
