–হ্যাঁ দেখেছি। ঘোড়া ছোেটাও। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
ঘোড়ায় চড়ে ছুটছে ওরা। পেছনে তলতেক সৈন্যরা। ফ্রান্সিস ওর বাঁ পাটা দেখল। রক্ত পড়ছে তখনও। ঘোড়ায় চড়ার ঝাঁকুনিতে রক্ত বেশী বেরোচ্ছে। পা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। বেশ দুর্বল লাগছে শরীরটা। শাঙ্কো আর হ্যারি তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস একটু পেছনেই পড়ে গেল। শাঙ্কো ঘোড়ার চলার গতি কমালো। ফ্রান্সিসদের কাছাকাছি পিছিয়ে এল। ফ্রান্সিস আহত। ঘোড়া থেকে যদি পড়ে যায়? এতে তলতেক সৈন্যদের সঙ্গে ওদের ধরে ফেলবে। ওর নিজের এই আহত শরীর। পারবে কি তলতেক সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই চালাতে?
তলতেক সৈন্যদের সঙ্গে ওদের দূরত্ব আরো কমে এল। তলতেক সৈন্যদের মধ্যে একজন লোহামুখ বর্শা ছুঁড়ল। সেটা ফ্রান্সিসদের থেকে বেশ দূরে এসে মাটিতে গেঁথে গেল।
একটা ঘাসে ঢাকা উপত্যকার মধ্যে একটা পায়ে চলা রাস্তার ওপর দিয়ে ওরা ছুটছে তখন। শাঙ্কো আর হ্যারির ঘোড়া আগে ছুটছিল। উত্রাইটা পেরোতেই হঠাৎ শাঙ্কো দেখল–সামনে গভীর খাদ। খাদের অনেক নীচে একটা পাহাড়ী নদী বয়ে চলেছে। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার মুখের রাশ প্রাণপণে টেনে ধরে চেঁচিয়ে উঠল–ফ্রান্সিস সামনে খাদ। থামো। ফ্রান্সিস তখন ঠিক ওদের পেছনে। শাঙ্কোর কথাটা কানে যেতে ফ্রান্সিসও প্রাণপণে ঘোড়ায় রাশ টেনে ধরল। ঠিক খাদের মুখে ওরা থেমে গেল।
ফ্রান্সিস দেখল–নদীর খাদটার ওপর দিয়ে একটা দড়ির সেতু বাঁধা। শক্ত পাকানো দড়ি দিয়ে তৈরী সেতুটা। এপারে সেতুটা দুটো মোটা কাছির মত দড়ি দিয়ে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বাঁধা। দেখল ওপারে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে কাছি দুটো টান টান বাঁধা। মাঝখানে সেতুটা হাত পাঁচেক দড়ির জাল বোনা। ওটার ওপর দিয়ে অনায়াসে হেঁটে পার হওয়া যায়। অনেক নীচে দেখল ছোট্ট পাহাড়ী নদী এঁকে বেঁকে চলেছে। খাদটার দুপাশের পাহাড়ে ঘন বন। নীচেও দুপাশে অনেকটা জায়গায় বন জঙ্গল। দড়ির সেতুটা দিয়ে মানুষ হেঁটে যেতে পারে। কিন্তু ঘোড়া যেতে পারবে না।
ফ্রান্সিস পেছনে তাকাল। একজন ঘোড়সওয়ার তলতেক সৈন্য অনেক কাছে চলে এসেছে। ফ্রান্সিস দ্রুত ভাবতে লাগল কী করবে এখন। হঠাৎ মনে একটা চিন্তা ধাক্কা দিল। হ্যাঁ–এ ছাড়া উপায় নেই। ফ্রান্সিস ঘোড়া থেকে নামল। শাঙ্কো আর হ্যারিও নামল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো-সামনেরটার মোকাবিলা আমি করছি। তুমি পেছনেরগুলোকে ঠেকাও।
শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে তীর ধনুক হাতে নিল। নিশানা করল পেছনের একজন সৈন্যকে। ছুঁড়ল তীর। নিখুঁত নিশানা। ঘোড়াসুদ্ধ সৈন্যটা লাফিয়ে উঠে মাটির ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। তীরটা ওর বুকে লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে তিন চারজন সৈন্য ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল।
এদিকে খুব কাছে এগিয়ে আসা সৈন্যটা ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়ল। ফ্রান্সিস মাথা নীচু করে দ্রুত সরে গেল। লক্ষ্যভ্রষ্ট বর্শাটা একটা পাথরের গায়ে লেগে ছিটকে পড়ল। পাথরের গায়ে আগুন ছিটকোল। ফ্রান্সিস এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে তরোয়াল খুলে চালাল সৈন্যটার ডান উরু লক্ষ্য করে। উরু কেটে রক্ত ছুটল। সৈন্যটা চিৎকার করে দুহাতে আহত উরুটা চেপে ধরল। ও তখন বুঝতে পারে নি সামনে খাদ, দড়ির সেতু। লাগাম ছাড়া হতেই ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠল। পড়ল গিয়ে দড়ির সেতুটার ওপর। প্রচও জোরে দুলে উঠল সেতুটা। দড়িতে পা আটকে ঘোড়াটা কাত হয়ে গেল। সৈন্যটা লাফিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে গেল। কিন্তু পারল না। ঘোড়াটা পাক খেল। ঘোড়াসুদ্ধ সৈন্যটা ছিটকে পড়ল। গভীর খাদের শূন্যতার মধ্যে দিয়ে নীচে পড়তে লাগল। মৃত্যুমুখী সৈন্যটা ভয়ার্ত চীৎকার করে উঠল। সেই চীৎকারের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল পাহাড়ের গায়ে গায়ে। ঘোড়া আর সৈন্যটা আছড়ে পড়ল অনেক নীচে পাহাড়ী নদীটার ওপর। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে গেল। সৈন্যটার অন্তিম চীৎকার তখনও খাদের দুপাশের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
ওদিকে শাঙ্কো তীর মেরে আর একটা সৈন্যকে ঘায়েল করছে। বাকী কয়েকজন সৈন্য এবার দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস দেখল–ঐ সৈন্যদের পেছনে আরো সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে ধুলো উড়িয়ে আসছে।
ফ্রান্সিস নদীখাদের দিকে তাকাল। দড়ির জালের সেতু। লোক চলাচলের জন্য। শক্ত দড়ির জাল। ওপারে যাওয়া যায়। কিন্তু লাভ নেই। পেছনে আরো সৈন্য আসছে। এখন লড়াই করতে যাওয়া বোকামি। একমাত্র উপায় দড়ির সেতুটা কেটে ফেলা। কিন্তু ওপারে গিয়ে সেতুর দড়ি কাটার সময় নেই। সৈন্যরা অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। দড়ির সেতুটাও কাটতে হবে আবার সৈন্যরা এসে পৌঁছোবার আগে ওপরে পৌঁছতে হবে। কিন্তু কীভাবে? ফ্রান্সিস একটু আগেই সেটা ভেবে রেখেছিল। সেইভাবেই কাজ শুরু করতে হবে। তার আগে ও নদীখাদটার মুখে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল সেতুটা ছিঁড়ে ফেলে ওপারে নীচে গিয়ে কোথায় লাগবে। দড়ির সেতুটার মোটামুটি মাপটা ভেবে নিয়ে দেখল দড়ির সেতুর এই মাথাটা যেখানে ঝুলে। গিয়ে লাগবে সেখানে ঝোঁপ আর জঙ্গল। ও নিশ্চিত, হল। ওদের আহত হবার ভয় নেই। ও ফিরে এসে দাঁড়াল। দড়ির সেতুর যে মোটা কাছি দুটো একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা ছিল সেখানে। দেখল তলতেক সৈন্যরা তীরের আক্রমণের ভয়ে সন্তর্পণে গতি কমিয়ে এগিয়ে আসছে।
