–কিন্তু গেরুয়া পাহাড়ের গুহায় গিয়েছিলে কেন? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
ওটা আমার ফাঁদ পাতার জায়গা। গুহার বাইরে ঘেঁড়া জামা ঝুলিয়ে রাখি, জাহাজ এলে জাহাজের লোকেরা সেই সংকেত দেখে আমাকে উদ্ধার করে। আমি গুপ্তধনের লোভ দেখিয়ে জাহাজের লোকদের এখানে নিয়ে আসি। তাদের বলি দেওয়া হয়। রাজাও আ : ওপর খুশি হয়। আমিও নিশ্চিন্তমনে গুপ্তধন খুঁজি।
–এর আগেও নিরীহ মানুষদের লোভ দেখিয়ে নিয়ে এসেছো?
–হ্যাঁ, তবে এর আগেরবারগুলোতে দশ পনেরো জন করে এনেছি। এবার তোমরা তিনজন মাত্র। বোধহয় কয়েদ রয়েছে কিছু।
ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আস্তে আস্তে বলতে লাগল–বারিনথাস, মৃত্যুর মুখ থেকে তোমাকে আমরা ফিরিয়ে এনেছি, ওষুধ দিয়েছি, সেবা-শুশ্রূষা করে তোমাকে সুস্থ করেছি। খাদ্য দিয়েছি, আশ্রয় দিয়েছি। যে পোশাকটা পরে। আছো সেটাও আমরাই দিয়েছি। বদলে আমাদের হত্যা করবার জন্যে নিয়ে এলে! কী অকৃতজ্ঞ! কী সাংঘাতিক মানুষ তুমি!
নির্বিকার বারিনথাস বলল-নইলে গুপ্তধন খুঁজবো কী করে।
ফ্রান্সিস বলল–আমাদের ভাগ্যে যাই ঘটুক তোমাকে একটা অনুরোধ করে যাই–এমন কাজ আর করো না। এতে মানুষ মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাবে। আমরা জানোয়ারেরও অধম হয়ে যাবো।
বারিনথাস হাসল শুধু।
বারিনথাস সৈন্যদের উচ্চস্বরে কী আদেশ করল। সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের টেনে নিয়ে চলল।
ফ্রান্সিস খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল। তখনো ওর ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়ছে। হ্যারি চলতে চলতে বলল–ফ্রান্সিস, বারিনথাসকে ওষুধ দেবার কথা বলবো?
–না, ওরকম একটা জঘন্য প্রকৃতির মানুষের কোনো সাহায্য আমি চাইবো না।
–এত রক্ত পড়ছে–তুমি দুর্বল হয়ে পড়বে।
–শরীরের দিক থেকে, মনের দিক থেকে নয়। হ্যারি, আমরা লড়াই করবো মনের জোরে।
ঘরটা রাজবাড়ির দক্ষিণ কোণায়। দেওয়ালগুলো পাথর গেঁথে তৈরি। তখনও ফ্রান্সিসদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়নি। অবশ্য তরোয়াল তীর ধনুক হাতে থাকা সত্ত্বেও ফ্রান্সিস তখন লড়াই করার কথা নিজে ভাবছিল না। ও আহত। ওদিকে সৈন্যরা সংখ্যায় জনা দশেক। এই অবস্থায় একবার লড়াইয়ে নামলে ওরা তিনজন বাঁচবে না। বরং বন্দী করে রাখলে পরে পালানোর উপায় বার করা যাবে। বুদ্ধি খাঁটিয়ে সেই কাজটিই করতে হবে। এখন ওরা যা করতে চাইছে সেটা মেনে নেওয়াই ভালো।
ওরা কয়েদ ঘরের কাছাকাছি চলে এসেছে ঠিক তখনই দুজন অশ্বারোহী সৈন্যদের কাছে এসে থামল। অশ্বারোহী সৈন্য দুজন ঘোড়া থেকে নামল। সৈন্যদের কাছে এসে ওরা হাত পা নেড়ে ওদের ভাষায় কী বলল। সৈন্যটি বর্শা উঁচিয়ে মুখ হাত দিয়ে থাবড়াতে থাবড়াতে উলুধ্বনির মত এক অদ্ভুত শব্দ করতে লাগল। তারপর শব্দ থামিয়ে ছুটল ঐ শহরের চারপাশে গাঁথা পাথুরে দেয়ালের দিকে।
শুধু যে দুজন সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল সেই দুজন রইল। তারা সামনের একটা গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে ঘোড়া দুটো বাঁধতে লাগল। তখনই ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল-হ্যারি-শাঙ্কো–এই সুযোগ। ঘোড়া দুটো বাঁধবার আগেই ঘোড়া দুটো ছিনিয়ে নিতে হবে। একটায় আমি অন্যটায় শাঙ্কো আর হ্যারি তুমি জলদি।
সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো ছুটে গিয়ে সৈন্য দুটোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সৈন্য দুজন ভাবতেও পারে নি যে ওরা এভাবে আক্রান্ত হবে। ফ্রান্সিস একজন সৈন্যের ঘাড়ে তরোয়ালের বাঁট দিয়ে ঘা মারল। সৈন্যটা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। শাঙ্কো অন্য সৈন্যটার মাথা দুহাতে ধরে গাছের গায়ে ঠুকে দিল। ঐ সৈন্যটাও গাছের গোড়ায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস আহত পা নিয়েও লাফিয়ে একটা ঘোড়ার পিঠে উঠল। তরোয়ালটা কোমরে জল। লাগাম হাতে নিয়ে ঘোড়ার পেটে পা দিয়ে জোরে খোঁচা মারল। ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠে ছুটল। শাঙ্কোও ততক্ষণে আর একটা ঘোড়ায় উঠে পড়েছে। হ্যারিও সেই ঘোড়ার পিঠের সামনের দিকে লাফিয়ে শাঙ্কো বাঁ হাতে হ্যারিকে সামনে বসিয়ে নিয়ে ঘোড়া ছোটাল।
একটু পরেই তুলা শহরের পাথুরে দেয়াল ছাড়িয়ে ওরা বাইরের প্রান্তরে চলে এল। দেখল তলতেক সৈন্যরা কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। হয়তো অন্য কোন উপজাতির সৈন্যদের সঙ্গে। ওরা দেখল দুদলের কিছু সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করছে। বাকিরা মাটিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছে। ফ্রান্সিস দ্রুত দেখে নিল অন্য উপজাতির যোদ্ধারা অনেকেই বন্দী হয়েছে। উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন যোদ্ধা মাটিতে পড়ে আছে। আহতদের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। তবে তলতেক যোদ্ধারা প্রায় জয়ের মুখে। অন্য উপজাতির লোকেরা ঘোড়ায় চড়ে পালাচ্ছে।
কয়েকজন তলতেক সৈন্য ফ্রান্সিসদের দেখল। ঘোড়া চালাতে চালাতে শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস কোনদিকে? ফ্রান্সিস বলে উঠল-বাঁ দিকে–ঐ পাহাড়ের দিকে। বিষাক্ত উপত্যকাকে বাঁ পাশে রেখে ওরা উত্তরের পাহাড়টা লক্ষ্য করে ঘোড়া ছোটাল।
এতক্ষণে যে কজন তলতেক সৈন্য ফ্রান্সিসদের দেখেছিল তারা বুঝল যে বন্দীরা পালাচ্ছে। এবার ওরা ঘোড়া ছুটিয়ে ফ্রান্সিসদের ধাওয়া করল। কিন্তু ফ্রান্সিসরা। ততক্ষণে অনেকটা চলে গেছে।
ফ্রান্সিস ঘোড়া ছোটাচ্ছে। কিন্তু খুব একটা দ্রুত ঘোড়া ছোটাতে পারছে না। বর্শা বেঁধা বাঁ পাটা অসাড় লাগছে। তবু ও প্রাণপণে ঘোড়া ছোটাতে লাগল। কারণ ততক্ষণে ফ্রান্সিস দেখেছে পেছনে কিছু দূরে তলতেক সৈন্যরা ধুলো উড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে। ঘোড়া ছোটাতে ছোটাতে শাঙ্কো বলে উঠল, ফ্রান্সিস–সৈন্যরা আসছে।
