সৈন্যরা এসে ওদের ঘিরে দাঁড়াল। বারিনথাস ডান হাত ওপরে তুলে নাহুয়াত ভাষায় কী বলে গেল। সৈন্যদের মুখে হাসি দেখা গেল। কথাটা শুনে ওরা খুশি হয়েছে বোঝা গেল। সকলৈ সরে গেল।
ফ্রান্সিস ফিসফিস্ করে বলল-হ্যারি ওদের এত খুশি হবার কারণ কী?
–বোধহয় বারিনথাস বলল,আমরা বন্ধু,শত্রু নই। তাছাড়া বারিনথাস পলাতক বন্দী। অথচ ও বেশ নির্ভয়েই সৈন্যদের সঙ্গে কথা বলল। আত্মগোপনের কোনো চেষ্টাই করল না।
বারিনথাসের পিছু পিছু ওরা চলল। কোয়েতজাল দেবতার মন্দিরের পাশে একটা পাথরের বাড়ি। ছাউনিটা এই এলাকায় যে লম্বা লম্বা ঘাস হয় তাই দিয়ে তৈরি। বারিনথাস বলল–এটা রাজবাড়ি। চলো–সব আগে রাজার সঙ্গে দেখা করার নিয়ম।
যেতে যেতে ফ্রান্সিস বলল-বারিনথাস তোমার বাড়ি কোনটা?
বারিনথাস আঙুল দিয়ে রাজবাড়ির ডানপাশে একটা পাথরের বাড়ি দেখাল।
রাজবাড়িতে ঢুকল ওরা ঘোড়া থেকে নেমে আলো থেকে অন্ধকার ঘরে ঢুকে ওরা প্রথমে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। অন্ধকার সয়ে আসতে দেখল একটা তুলো কাপড়ের আসনে জাগুয়ারের চামড়ার ওপর রাজা বসে আছেন। খাড়া নাক। গায়ের রঙ তামাটে। মাথায় পাখির পালকের মুকুট। কপালে হলুদ কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা। রাজা ফ্রান্সিসদের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন।
বারিনথাস দুহাত ওপরে তুলে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর মাথা মেঝের ওপর রাখল। উঠে বসল। তারপর নাহুয়াতল ভাষায় কী বলে গেল; রাজার মুখে হাসি ফুটল। ফ্রান্সিস অস্ফুটস্বরে ডাকল হ্যারি।
হ্যারি চাপাস্বরে বলল–লক্ষ্য করেছি-কী ব্যাপার বুঝতে পারছি না।
-বারিনথাস বলেছিল রাজা ওকে পেলে মেরে ফেলবে। এখন দেখছি রাজা ওর কথা শুনে খুব খুশী। ওকে কিছু বলছে না।
এবার রাজা ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে কী বলল। বারিনথাস দোভাষীর কাজ করতে লাগল। তাতে রাজা ও ফ্রান্সিসের কথাবার্তা এইরকম দাঁড়াল।
রাজা–তোমরা জানো তোমাদের এখানে কেন আনা হয়েছে?
ফ্রান্সিস–আমাদের আনা হয়নি। আমরা নিজেরাই এসেছি।
রাজা–কেন?
ফ্রান্সিস–প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তধন বের করবো তাই।
রাজা–সেই গুপ্তধন কোথায় আছে জানো?
ফ্রান্সিস–না। তবে শুনেছি বিষাক্ত উপত্যকার মাঝখানে।
রাজা–বিষাক্ত উপত্যকা কেমন জায়গা জানো?
ফ্রান্সিস–জানি।
রাজা–পারবে গুপ্তধন উদ্ধার করতে?
ফ্রান্সিস–আগে সব দেখি শুনি তারপর বলতে পারবো।
রাজা (হেসে)-যদি ততদিন বাঁচো।
ফ্রান্সিস–তার মানে?
রাজা–কোয়েতজাল দেবতা যেমন জীবনের দেবতা তেমনি মৃত্যুরও দেবতা।
ফ্রান্সিস বারিনথাসের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল–এসব কথার মানে কী?
–রাজার মেজাজের কিছু স্থিরতা নেই। ভুলে যাও এসব কথা।
ফ্রান্সিস দ্রুত চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল। দেখল–ঘরের দরজার কাছে দুজন সৈন্য পাহারা দিচ্ছে। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে দ্রুত বলে উঠল–হ্যারি শাঙ্কো পালাও–আমার পেছনে।
ফ্রান্সিস এক লাফে দরজার কাছে চলে এল। পেছনে হ্যারি আর শাস্কো। দরজায় পাহারাদার সৈন্য কিছু বোঝবার আগেই ফ্রান্সিস দুজনকেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। তারপর এক লাফে বাইরের চত্বরে গিয়ে দাঁড়াল। পেছনে হ্যারি আর শাঙ্কো। ঠিক তখনই দরজার পাহারাদার একজন উঠে দ্রুত হাতে বর্শা চূড়ল। বর্শা গিয়ে বিধল ফ্রান্সিসের বাঁ পায়ে। ফ্রান্সিস হাত দিয়ে এক টানে বর্শাটা খুলে ফেলল। গলগল করে রক্ত ছুটল। ফ্রান্সিস বসে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়াল। ছুটতে যাবে দেখল ততক্ষণে রাজবাড়ির পাহারাদার সৈন্যরা ওদের ঘিরে ফেলেছে। ফ্রান্সিস আবার দুহাতে পা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ল। শাঙ্কো তখন তীর ছোঁড়ার জন্য তৈরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিস দেখল সেটা। বলে উঠল–শাঙ্কো, ধনুক নামাও। এখন লড়াই নয়।
শাঙ্কো ধনুক নামাল। হ্যারি ছুটে এসে ফ্রান্সিসের পায়ের জখমের জায়গার ওপরে দুহাত দিয়ে চেপে ধরল–যদি রক্তপড়া বন্ধ করা যায়। রক্ত পড়া একটু কমল বটে কিন্তু একেবারে বন্ধ হলো না।
এর মধ্যে রাজা কালহুয়াকান বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে বারিনথাস। রাজা চিৎকার করে বারিনথাসকে কী বললেন। বারিনথাস ফ্রান্সিসদের কাছে এসে দাঁড়াল। হেসে বলল–পালাতে গিয়ে ভু করলে। রাজার রাগ বাড়িয়ে দিলে। এবার চললা গারদ ঘরে। ওখানেই থাকতে হবে কয়েকদিন।
–কয়েকদিন কেন?
–সেটাও কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝবে। বারিনথাস হেসে বলল।
ফ্রান্সিস এক ঝটকায় দ্রুত উঠে দাঁড়াল। রাজার দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠল–আমাদের নিয়ে কী করতে চান?
রাজা একবার ফ্রান্সিসদের দিকে ক্রুদ্ধ নজরে তাকিয়ে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। বারিনথাস হেসে বলল–তাহলে এবার আসল কথাটা বলি। আর চারদিন পর অমাবস্যা পড়বে। সেই রাতে কোয়েতজাল দেবতার বেদীতে তোমাদের বলি দেওয়া হবে।
তিনজনেই ভীষণভাবে চমকে উঠে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বারিনথাসের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল–তাহলে এইজন্যেই তুমি আমাদের প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তধনের লোভ দেখিয়েছিলে?
–হ্যাঁ?
–আমার আরো বন্ধুদের আনতে বলেছিলে?
–ঠিক তাই। আমার কাজই এই। রাজা আমাকে এখানে থাকতে দিয়েছেন একটি চুক্তিতে–তিন মাস অন্তর অমাবস্যার রাতে নরবলি দেবার জন্যে আমি মানুষ যোগাড় করে আনবো। আমিও এ কাজে রাজী হলাম এইজন্যে যে আমি তাহলে এখানে থাকতে পারবো। গুপ্তধন খুঁজতে পারবো। তারপর একদিন গুপ্তধন উদ্ধার করে নিয়ে পালাতে পারবো।
