বারিনথাস এবার ঘোড়া দুটোকে দড়ি দিয়ে পাথরের একটা খণ্ডের সঙ্গে বেঁধে রাখল। তিনজনে এরপর গেরুয়া পাহাড় পেরিয়ে জাহাজে ফিরে এল।
পরের দুতিনদিন ধরে বারিনথাস নতুন ঘোড়াটাকে পোষ মানাল। ঘোড়াটা শান্ত হলো। বারিনথাস ঘোড়াটার মুখে দড়ির লাগাম পরাল-পিঠে মোটা কাপড়ের জিন বাঁধল।
রওনা হবার দিন এসে গেল। সেদিন সকাল থেকেই ফ্রান্সিস খুব ব্যস্ত। জল, ময়দা, খাবার দাবার, ঘোড়ার খাদ্য ছোলা সব জড়ো করল। তরোয়াল, তীর ধনুক, বর্শাও নিল। জাহাজ থেকে গেরুয়া পাহাড়ে নামল। বারিনথাস বারবারই বলছিল–আরো ঘোড়া পোষ মানিয়ে বেশি লোক নিয়ে চলো। কিন্তু ফ্রান্সিস রাজী হয়নি।
চার পাঁচজন ভাইকিং বন্ধু ওদের মালপত্র বয়ে নিয়ে চলল।
তখন দুপুর। ওরা ঘাসের প্রান্তরে এসে পৌঁছল। দুটো ঘোড়া পাথরে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। বারিনথাস নতুন ঘোড়াটার পিঠে উঠল। হ্যারি ওর পেছনে বসল। বন্ধুরা কিছু মালপত্র ঘোড়াটার পিঠের দুপাশে ঝুলিয়ে দিল। পুরোনো ঘোড়াটার পিঠে উঠল ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো। বন্ধুরা ঐ ঘোড়ার পিঠেও বাকী মালপত্র ঝুলিয়ে দিল।
যাত্রা শুরু করার আগে ফ্রান্সিস বন্ধুদের উদ্দেশে বলল–তোমরা সজাগ থেকো। রুপোর থামদুটো পাহারা দিও। যদি আমাদের কোনো বিপদ হয় তোমাদের এখানে খবর পাঠাবো। তবে আমরা তো লড়াই করতে যাচ্ছি না। কাজেই বিপদে পড়ার আশঙ্কা নেই। এবার তোমরা জাহাজে ফিরে যাও।
ফ্রান্সিস ঘোড়া ছোটাল। বন্ধুরা হাত নেড়ে বিদায় জানাল। তারপর জাহাজে ফিরে এল।
সন্ধ্যে নাগাদ একটা পাহাড়ী এলাকায় এল ফ্রান্সিসরা। রাতে পথ চলা যাবে না। একটা বড় কঁকড়া পাতাঅলা গাছের নিচে ওরা ঘোড়া থেকে নেমে বসল। আজ রাতের মতো এখানেই আশ্রয়। বিশ্রাম।
চকমকি পাথর ঠকে আগুন জ্বালাল শাঙ্কো। রান্না করল শাঙ্কো। খাওয়া দাওয়া সেরে ঘোড়া দুটোকে গাছের সঙ্গে বাঁধল। একটা পাত্রে জল ছোলা খেতে দিল। ঘাসের ওপর কম্বল পেতে ওরা শুল। ফ্রান্সিস বাদে ওরা তিনজন ঘুমিয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিসের চোখে ঘুম নেই। ও উঁচু গাছটার ঝুপসি ডালপাতার দিকে তাকিয়ে রইল। চারদিকে অন্ধকার। কৃষ্ণপক্ষ চলছে বোধহয়। নানা চিন্তা মাথায়। স্ট্রোমো কেমন দেশ। কোনো বিপদ হবে কিনা। গুপ্তধন শেষপর্যন্ত উদ্ধার করা যাবে কিনা। এসব ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিস একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে আবার সব বাঁধা ছাঁদা করে ঘোড়ার পিঠে উঠল ওরা। বারিনথাস রওনা হবার সময়ই বলল, ঘোড়া জোরে ছুটিও না। কোনো কারণে ঘোড়া অসুস্থ হয়ে পড়লে সর্বনাশ। এই পথে ঘোড়াই একমাত্র সম্বল। তাই ওরা ঘোড়া জোরে ছোটাচ্ছিল না।
বিচিত্র প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে ওরা চলল। কোথাও উঁচু পাহাড়। কোথাও গভীর খাদ। অনেক নিচে রুপোলি ফিতের মতো পাহাড়ী নদী বয়ে চলেছে। কোথাও লালরঙের ধুলোর প্রান্তর। তার মধ্যে ছড়ানো পাথর। ঘোড়া ছুটছে। পেছনে উঠছে লাল ধুলোর ঝড়। কোথাও পেয়েছে ছোট নদী। ঘোড়াগুলো পেট ভরে জল খেয়ে নিয়েছে। ওরাও জল খেয়েছে। চামড়ার থলেয় জল ভরে নিয়েছে।
তিন চার দিন কেটে গেল। ফ্রান্সিস বারিনথাসকে বলল-চলো, রাতেও আমরা এগিয়ে যাই। আমার বন্ধুরা বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত। কাজেই বেশি দেরি করতে পারবো না।
বারিনথাস রাজী হলো। ওরা রাতেও ঘোড়া ছোটাতে লাগল।
পাঁচদিনের দিন বিকেলে ওরা সবুজ গাছগাছালিভরা একটা জায়গায় এল। দেখলে দূরে দূরে কয়েকটা পাথরের বাড়িঘর। কোন কোন বাড়ি রোদে পোড়া হঁটে তৈরী। এদিকে ওদিকে তুলো গাছের ক্ষেত। বাড়ির সামনে মেয়েরা দাঁড়িয়ে বসে আছে। বাচ্চা ছেলেপুলেরা এদিকে ওদিকে খেলছে। সবাই অবাক চোখে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল।
বারিনথাস ঘোড়া থামাল। ফ্রান্সিসও ঘোড়া থামাল। বারিনথাস বলল–স্ত্রোমো দেশ শুরু হলো। এরা তলতেক উপজাতির মানুষ।
সেই রাতটা ওখানেই একটা গাছের নিচে ওরা রইল। বারিনথাস কাছাকাছি কোনো তলতেক-এর তাবু থেকে খরগোশের মাংসের ঝোল নিয়ে এল। কয়েকদিনের পর ভালো খাবার পেট ভরে খেল সবাই। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালে উঠেই সব গোছগাছ করে নিয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো। দুপুরের দিকে ওরা রাজধানী তুলায় পৌঁছল। দূর থেকে পাথরে গড়া বাড়ি চোখে পড়ল। বারিনথাস বলল–ঐ বাড়িটাই কোয়েতজাল দেবতার মন্দির। মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছতে বারিনথাস আঙুল দিয়ে মন্দিরের পেছনে একটা উপত্যকা মতো নিচু জায়গা দেখাল। বলল–এটাই হচ্ছে বিষাক্ত উপত্যকা।
–একটু ভালো করে দেখতে হয়। কথা বলে ফ্রান্সিস ঘোড়া থেকে নামল। উপত্যকার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। বারিনথাস ঠিকই বলেছে। ঐ দুপুরেও জায়গাটায় কুয়াশা ছড়িয়ে আছে। যেন ধোঁয়া উঠছে। জলের রঙ সঠিক বোঝার উপায় নেই। জলাভূমি মত। সাজের চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু আশ্চর্য-কাঠি কাঠি ঘাসের মতো গাছ আছে আর তাতে অজস্র গাঢ় বেগুনি রঙের ফুল ফুটে আছে। উপত্যকাটার একপাশে একটা ছোট পাহাড় উঠে গেছে। অন্যপাশে কোয়েতজাল দেবতার পাথরের মন্দির।
বারিনথাস হাত উঁচিয়ে বলল–ঐ দেখ, পাথরে ফণিমনসার গাছ।
ফ্রান্সিস দেখল সত্যিই উপত্যকাটার মাঝামাঝি জায়গায় একটা কালো পাথর। তার ওপর একটা ফণিমনসার গাছ।
তুলা নামেই রাজধানী। তেমন কিছু জমজমাট জায়গা নয়। তুলার চারপাশে। এক মানুষ উঁচু পাথুরে দেয়াল। বোধহয় শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্যে। পাথরের বাড়িঘর এলাকাটায়। এখানে বেশি সংখ্যক লোকজনের বাস। পাথরের দেয়ালের বাইরে বাজার মতো বসেছে। লোকজন কেনাকাটা করছে। মেয়ে পুরুষ সকলের গায়েই মোটা সুতোর পোশাক। নানা বিচিত্র রঙের পোশাক সেসব। পোশাক থেকে সুতোর ঝালর ঝুলছে। এমন সময় দেখা গেল একদল সৈন্য এগিয়ে আসছে। সৈন্যদের গায়ে কোনো পোশাক নেই। পরনে পা পর্যন্ত ঢাকা এক ধরনের পোশাক। খালি গায়ে মুখে লাল হলুদ সবুজ উল্কি আঁকা। মাথায় লাল কাপড়ের ফেট্টি। তাতে অনেক পাখির পালক গোঁজা। সৈন্যদের হাতে লোহার ছুঁচোবলামুখ বর্শা।
