–হ্যাঁ।
–এই জন্যে নিশ্চয়ই ব্ৰেণ্ডন তলতেক সৈন্যদের বা অন্য লোকদের সাহায্য নিয়েছিলেন?
–হ্যাঁ, বইটিতে লেখা আছে ব্ৰেণ্ডন সেনাপতি ও সৈন্যদের সাহায্য নিয়েছিলেন?
–তাহলে তো তাদের এই গুপ্ত ভাণ্ডারের হদিশ জানার কথা।
–কিন্তু ব্রেনের পরামর্শে রাজা কালহুয়াকান সেই সেনাপতি ও সৈন্যদের বিষাক্ত উপত্যকায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন।
–রাজা নিজেও কি জানতেন না? তিনি তো তার বংশধরদের বলে যেতে পারতেন।
–এখানেই ব্ৰেণ্ডন আর ধর্মযাজকের মতো নির্লিপ্ত থাকেননি। তিনি একটা চাল চেলেছিলেন। তিনি ধনসম্পদের নেশায় পাগল হয়ে উঠেছিলেন। রাজাকে বলেছিলেন-আমি দেশে যাচ্ছি। ফিরে এসে আপনাকে জানাব কীভাবে আমি ধনভাণ্ডার লুকিয়ে রেখেছি। রাজাও ওকে বিশ্বাস করে দেশে যেতে দিয়েছিলেন। ব্ৰেণ্ডনের মতলব ছিল দেশে ফিরে আরও লোকজন নিয়ে সেই ধনভাণ্ডার চুরি করবে। দেশে নিয়ে যাবে। কিন্তু ব্ৰেণ্ডনের এই আশা অপূর্ণই থেকে গেছে। বয়েসও হয়েছিল। কঠিন অসুখে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। তখনই ন্যাভিগেশিও গ্রন্থের লেখকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ব্রেন লেখককে তার সমুদ্রযাত্রার কাহিনী বিভিন্ন দ্বীপ দেশের কাহিনী, স্ট্রোমো দেশের কাহিনী মুখে মুখে বলেছিলেন। লেখক সেই কাহিনী লিখেছিল। তারপর ব্লেণ্ডন মারা গেলেন। রাজা কালহুয়াকানের আর জানাই হলো না সেই গুপ্ত ধনভাণ্ডারের হদিস।
–তাহলে দেখা যাচ্ছে–ফ্রান্সিস বলল–একমাত্র ব্রেনই জানতেন কোথায় এবং কীভাবে লুকোনো আছে সেই ধনভাণ্ডার।
–ঠিক তাই। বারিনথাস বলল?
–এবার বলুন তো, কীভাবে যাবো আমরা? হ্যারি বলল।
–এই পাহাড়ের ওপাশে আছে বহুদূর বিস্তৃত সবুজ ঘাসের প্রান্তর। সেখানে অনেক বুনো ঘোড়া ভেড়া চরে বেড়ায়। সেই ঘোড়া ধরতে হবে। পোষ মানাতে হবে। সেসব ঘোড়ার পিঠে মোটা কাপড়ের জীন বাঁধতে হবে। তারপর সেইসব ঘোড়ায় চড়ে যেতে হবে, বারিনথাস বলল।
ফ্রান্সিস বলল–এ তো সময়সাপেক্ষ।
-হ্যাঁ, দিনকয়েক ঘোড়াগুলোকে পোষ মানাতেই যাবে। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–তাহলে কালকেই আমরা ঐ প্রান্তরে যাবো। ঘোড়া ধরতে পোষ মানাতে আপনি কিন্তু সাহায্য করবেন।
-নিশ্চয়ই করবো।
-চলি।
ফ্রান্সিস ও হ্যারি চলে গেল।
পরদিন দুপুরে বারিনথাসকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো চলল সবুজ প্রান্তরের উদ্দেশে। বারিনথাস সঙ্গে নিল লম্বা দড়ি। গোল করে পাকানো। ফ্রান্সিস বলল–দড়ি নিলেন ঘোড়া বাঁধবার জন্যে?
–হ্যাঁ। দ্যাখো দড়ি দিয়ে ফাঁস তৈরি করেছি। এই ফঁসকে বলে ল্যামসা। বুনো ঘোড়ার গলায় ফাস ছুঁড়ে বাঁধতে হয়। শিখে গেলে তোমরাও পারবে।
গৈরিক পাহাড়ের পাথরের খাঁজে খাঁজে পা দিয়ে ওরা পাহাড়টা পার হলো। ফ্রান্সিস দেখল, দূরে বিস্তৃত সবুজ ঘাসের প্রান্তর। মাঝে মাঝে ছড়ানো ছিটানো পাথর।
ওরা এক সময় প্রান্তরের মুখে এসে দাঁড়াল। দেখল অনেক বুনো ঘোড়া ভেড়া চরে বেড়াচ্ছে। বারিনথাস ঘোড়াগুলোর দিকে যেতে যেতে বলল–আমার ঘোড়াটাও এই দলের মধ্যে আছে।
বারিনথাস ঘোড়াগুলোর কাছে যেতেই ঘোড়াগুলো এদিক ওদিক সরে গেল। বারিনথাস তীক্ষ্ণস্বরে শিস দিল। দেখা গেল একটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়েছে। সেটার পিঠে মোটা কাপড়ের জিন বাঁধা। মুখে দড়ির লাগাম। বারিনথাস আস্তে আস্তে ঐ ঘোড়াটার কাছে গেল। ঘোড়াটার চোয়ালের কাছে চোখের কাছে আলবার্তো চাপড় মেরে মেরে আদর করতেই ঘোড়াটা চি-হি-হি করে ডেকেউঠল। বারিনথাস তখন মাটি থেকে একটা বেশ বড়সড় পাথর তুলে ল্যাপোর অন্য প্রান্তে বাঁধল। তারপর পেটের কাছে নিয়ে লাফিয়ে ঘোড়াটার পিঠে উঠে বসল। তাকে ছোটাল বুনো ঘোড়াগুলো যেখানে ঘাস খাচ্ছিল সেইদিকে। মুহূর্তে বারিনথাস বুনো ঘোড়ার দঙ্গলের একেবারে কাছে পৌঁছে গেল। বুনো ঘোড়াগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে ছুট লাগাল। বারিনথাস একটা গায়ে সাদা ছিট ছিট ছুটন্ত ঘোড়ার পেছনে ছুটল। বুনো ঘোড়াটা ছুটছে। বারিনথাস পেছনে পেছনে ছুটল। এবার বারিনথাস হাতের দড়িটা শূন্যে ঘোরাতে লাগল। ঘোরাতে ঘোরাতে একসময় ছুঁড়ে দিল সাদা ছিট ছিট ঘোড়াটার গলায়। মুহূর্তে ল্যাসোর ফাঁস জড়িয়ে গেল ঘোড়াটার গলায়। বারিনথাস এবার বাঁ হাতে কোলের কাছে ধরা দড়ি বাঁধা পাথরটা মাটিতে ফেলে দিল। বুনো ঘোড়াটা দড়ি বাঁধা পাথর টানতে টানতে ছুটল। বারিনথাস এবার নিজের ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিল। বুনো ঘোড়াটার গতি তখন অনেক কমে গেছে। আরো কিছুক্ষণ ছুটোছুটি করল ঘোড়াটা। তারপর ক্লান্ত হয়ে আস্তে আস্তে একসময় দাঁড়িয়ে পড়ল। বারিনথাস বুনো ঘোড়াটার কাছে এল। ল্যাসোর দড়িটা ধরে টানতে টানতে ফ্রান্সিসদের দিকে আসতে লাগল। ফ্রান্সিস দেখল ক্লান্ত বুনো ঘোড়াটার মুখ দিয়ে গাজলা উঠছে।
বারিনথাস নিজের ঘোড়া থেকে নামল। বুনো ঘোড়াটার চোখের কাছে চোয়ালে আলবার্তো চাপড় মেরে আদর করতে লাগল। ঘোড়াটা শান্ত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে রইল। বারিনথাস লাগাম জিন ছাড়াই এক লাফে ঘোড়াটার পিঠে চড়ে বসল। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াটা ছুটল। কিন্তু জোরে নয়। ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ওটা। বারিনথাস এপাশ ওপাশ কঁকুনি খেতে খেতে বসে রইল। কখনো ঘোড়াটার গলা জড়িয়ে ধরল, কখনো ঘোড়াটার ঘাড়ের লম্বা লম্বা কেশর টেনে ধরল। ঘোড়াটাকে কিছুক্ষণ ছুটিয়ে বারিনথাস তার পিঠ থেকে নামল। তারপর ওটার গলায় দড়ি পরিয়ে। হাঁটিয়ে নিয়ে এল ফ্রান্সিসদের কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-এটা আর দুএকদিনের মধ্যেই পোষ মেনে যাবে। তোমরা দুজন আমার পুরোনো ঘোড়াটায় চড়ে যাবে।
