একটু পরেই ফ্রান্সিস এল। সঙ্গে হ্যারি। সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ওপরে মেঘহীন আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছে। সমুদ্রের শোঁ শোঁ হাওয়া আর ঢেউয়ের মৃদু গর্জন। এ ছাড়া চারদিকে কোনো শব্দ নেই।
ফ্রান্সিস একবার সবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর বলতে লাগল। ভাইসব, এখান থেকে ঘোড়ায় চড়ে দিন আট দশেকের পথ। তারপর একটা দেশ। নাম স্ত্রোমো। রাজধানীর নাম তুলা। সেখানে আছে এক উপত্যকা। নাম বিষাক্ত উপত্যকা। নাম শুনেই বুঝতে পারছো সেই উপত্যকা কত মারাত্মক। বিষাক্ত জলাভূমি ওটা। কোনো প্রাণী ঐ উপত্যকায় পড়লে মুহূর্তে তার মৃত্যু হয়। এই জলাভূমির মাঝখানে রয়েছে একটা পাথরের চাই আর একটা ফণিমনসার গাছ। আর এখানেই রয়েছে তলতেক উপজাতির প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্তধন। ফ্রান্সিস একটু চুপ করল। তারপর বলতে লাগল–ভাইসব, ঐ গুপ্ত ধনভাণ্ডার আমরা খুঁজে বের করবো। সেইজন্যে আমি হ্যারির সঙ্গে আলোচনা করে স্থির করেছি আমরা তিনজন–আমি হ্যারি আর আমাদের তীরন্দাজ শাঙ্কো ঐ গুপ্তধন, উদ্ধারে যাবো। ফ্রান্সিস চুপ করল। কেউ কোনো কথা বলল না। ফ্রান্সিস বলল–ভাইসব, তোমাদের কিছু বলবার থাকলে বলো।
একজন ভাইকিং বলল–তোমরা ফেরা না পর্যন্ত তো আমরা দেশে ফিরতে পারবো না।
–হ্যাঁ, তোমাদের এখানেই থাকতে হবে।
–কিন্তু ফ্রান্সিস, বিস্কো বলল–আমরা অনেকদিন দেশ ছাড়া। আমাদের মনের অবস্থাটা একবার বিবেচনা করো।
–বিস্কো, তুমি আমাকে জানে। আমাকে সংকল্পচ্যুত করা কঠিন হয়ে যাবে। যখন স্থির করেছি–যাবোই। তারা জাহাজ নিয়ে চলে যাও… … … আরামে দিন কাটাও।
–কিন্তু তোমরা তিনজন?
–আমরা স্ত্রোমো যাবো। এখনই বলতে পারছি না গুপ্তধন খুঁজে বের করতে পারবো কিনা। পারি বা না পারি ফিরে এসে এখানে থাকবো। কোনো জাহাজ নিশ্চয়ই পাবো। তখন দেশে ফিরে যাবো।
বিস্কো চেঁচিয়ে উঠলো–না, তোমাদের রেখে আমরা দেশে ফিরে যাবো না। সব ভাইকিং চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো।
ফ্রান্সিস হাসল। বলল–আমি গর্বিত যে তোমাদের মতো বন্ধু আমি পেয়েছি। ঠিক আছে। তাহলে দুএকদিনের মধ্যে আমরা রওনা হবো।
এবার হরি বলল–আমরা কী ভাবে যাবো?
–বারিনথাস আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। ও সঙ্গে থাকলে দোভাষীর কাজটা ও চালাতে পারবে।
–কিন্তু ভুলে যেও না ফ্রান্সিস-বারিনথাস পলাতক বন্দী। ও রাজা কালহুয়াকানের সুনজরে নেই।
ফ্রান্সিস একটু ভাবল মাথা নিচু করে। তারপর বলল–কথাটা ঠিকই বলেছো। ঠিক আছে, আগে স্রোমোতে চলো তো, তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবো।
সভা ভেঙে গেল। ভাইকিংরা সব কথাবার্তা বলতে বলতে কেবিনে চলে গেল।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিস হ্যারির কেবিনে এল। ওর হাতে ন্যাভিগেশিও বইটা। হ্যারি বলল–বইটা দেখলে?
–হ্যাঁ। প্রাচীন ল্যাটিন ভাষা। পড়তে তো পারবো না। তবে কোয়েতজাল দেবতার ছবিটা ভালো করে দেখেছি। আচ্ছা হ্যারি ফ্রান্সিস বইটা হ্যারির সামনে এগিয়ে ধরল। একেবারে শেষ পাতাটা দেখিয়ে বলল–দেখ তো, এই শেষ কটা লাইন কেমন অন্যভাবে সাজানো বলে মনে হচ্ছে না–যেন ছড়া বা কবিতার মতো।
হ্যারি মনোযোগ দিয়ে জায়গাটা দেখল। বলল–তোমার অনুমান সত্যি। এটা আগের লেখা গদ্যের মতো নয়, মনে হচ্ছে ছড়া জাতীয় কিছু।
–হ্যারি চলো, বারিনথাসের সঙ্গে এই নিয়ে কিছু কথা বলবো।
দুজনে যখন বারিনথাসের কেবিনঘরে ঢুকল, বারিনথাস তখন একটা ভাঙা আয়নায় মুখ দেখছে। ওদের দেখে আয়নাটা রেখে দিল। দুজনে বসল।
–আপনার বইটা।
বারিনথাস বইটা নিয়ে বিছানায় রাখল।
ফ্রান্সিস বলল–বইটা ভালো করে দেখলাম। আচ্ছা, দেবতা কোয়েতজালের মূর্তিটা একটু অদ্ভুত না?
–কেন বলো তো?
–কোয়েতজালের হাত দুটো পেছনে। এরকম দেমূর্তি বড় একটা দেখা যায়।
–এটা তোমার নজরে পড়েছে তাহলে? হ্যাঁ ঠিকই–দেবমূর্তির হাত দুটো পেছনে।
মুখটা কঙ্কাল।
–হ্যাঁ, কোয়েতজালের জীবন ও মৃত্যুর দেবতা?
–মূর্তিটা কত বড়?
–একজন সাধারণ মানুষের উচ্চতার সমান।
–একটা কথা–ফ্রান্সিস বলল। তারপর বিছানা থেকে বইটা নিয়ে বারিনথাসের হাতে দিল। শেষ পাতাটা বের করে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল-এটা কী লেখা বলুন তো?
বারিনথাস হাসল। বলল–এটা একটা উদ্ভট ছড়া। মাথামুণ্ডু বোঝার উপায় নেই।
–তবু–ছড়াটা অনুবাদ করে বলুন তো?
–ছড়াটা কিন্তু ল্যাটিন ভাষায় লেখা নয়। তলতেক উপজাতির মুখের ভাষা নাহুয়াতল–সেই ভাষায় লেখা। স্পেনীয় বর্ণমালায়।
–আপনি তো ঐ ভাষা জানেন। অনুবাদে অর্থ বলুন।
বারিনথাস বলল–ঠিক অক্ষর সাজিয়ে অনুবাদ করলে এইরকম দাঁড়ায়–
অদ্ভুত অদ্ভুত!
ব্ৰেণ্ডনের ছড়া!
পা আছে হাত নেই
মাথা
এক হাত পিঠে বাঁধা
টলমল টলমল
অতল তল, অতল তল।
এক হাত ধূলিময়
মুখ নয় কথা কয়
আঙুল তুলে হে–
কোন ভুলে হে–
পাথরেতে মনসা গাছ
কিম্ভুত কিম্ভুত!
ছড়াটা শেষ হতে ফ্রান্সিস বলল–ছড়াটা আর কয়েকবার বলুন।
বারিনথাস বার পাঁচেক ছড়াটা বলল। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে গভীর মনোযোগ দিয়ে ছড়াটা শুনল।
একটু পরে হ্যারি বলল–কিছু বুঝলে?
ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকাল–না। তবে এই ছড়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্ৰেণ্ডনের এই ছড়াটা অর্থহীন উদ্ভট নয়। অবশ্য সমস্ত ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারবো দেবমন্দির-মূর্তি-বিষাক্ত উপত্যকা-রাজবাড়ি দেখার পর। মোট কথা, ওদেশে গেলে। এবার ফ্রান্সিস বারিনথাসের দিকে তাকাল–আচ্ছা, একটা ব্যাপার। যাজক ব্রেণ্ডন রাজাকে ধনভাণ্ডার লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিলেন তো?
