–বলো কি!
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–থাক ওসব কথা। আপনি বিশ্রাম করুন। পরে কথা হবে।
ফ্রান্সিস ও হ্যারি নিজেদের কেবিন ঘরে চলে এল।
তখন রাত হয়েছে। ফ্রান্সিস জাহাজের ডেকে পায়চারি করছে। সমুদ্রের হু হু হাওয়ায় ওর মাথার চুল এলোমেলো হচ্ছে। মাথার ওপর নির্মেঘ আকাশ। পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়। চাঁদ উজ্জ্বল। চাঁদের নরম আলো পড়েছে গৈরিক পাহাড়ে, সমুদ্রে।
এ সময় হ্যারি ডেকে উঠে এল। ফ্রান্সিস হ্যারির কাছে এল। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস,–ভাইকিং বন্ধুরা তো দেশে ফেরার জন্যে উদগ্রীব। কী করবে এখন?
–এখন দেশে ফেরা হবে না।
–কিন্তু ওরা কি শুনবে?
–শুনতে হবে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–তলতেকের দেশ স্লোমোতে যাব। কালহুয়াকান রাজাদের গুপ্তধন উদ্ধার করতে হবে।
-পারবে?
–ওখানে সব দেখেশুনে তবে বুঝতে পারবো?
–তুমি কি এজন্যে, বারিনথাসের সাহায্য নেবে?
–হ্যাঁ–তা তো নিতেই হবে। ওর সঙ্গে এই নিয়ে কালকে কথা বলবো। ও কেন ফিরে এলো, একা, একা গুহায় পড়ে রইল, এসব এখনও শোনা হয়নি।
–তাহলে আগে কথাবার্তা বলে তারপর সিদ্ধান্ত নাও?
–বেশ, তাই হবে।
পরদিন। ফ্রান্সিস আর হ্যারি বারিনথাসের কেবিনঘরে এল। বারিনথাস তখন ন্যাভিগেশিও বইটা পড়ছিল। ওদের দেখে বই বন্ধ করে উঠে বসল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি ওর বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস বলল–এখন কেমন বোধ করছেন?
-খুব ভালো।
–আমাদের স্ট্রোমো দেশে নিয়ে যেতে পারবেন?
–এ্যাঁ? বারিনথাস বেশ চমকে উঠল।
-শুনুন–আমি স্থির করেছি আমরা কয়েকজন ঐ দেশে যাবো। আপনি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। প্রথম রাজা কালহুয়াকানের ধনসম্পদ আমরা খুঁজে বের করবো।
–অসম্ভব। বারিনথাস মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল–আমি দীর্ঘ পনেরো বছরের আপ্রাণ চেষ্টাতেও পারিনি।
–আমি এখুনি অসম্ভব বলতে রাজী নই। ফ্রান্সিস বলল-ওখানে যাবো। সব দেখবো তারপর ভাববো। যদি বুঝি অসম্ভব, তখনই অসম্ভব বলবো। তবে একটা কথা জানবেন–একটা ক্ষীণ সূত্র থাকেই যেটা ধরে চিন্তা করে সমাধান বের করা যায়।
–দেখবেন চেষ্টা করে। বারিনথাস বলল?
–এবার বলুন তো আপনি তুলা থেকে চলে এলেন কেন?
–সে অনেক ব্যাপার। আমি যে সেই গুপ্ত ভান্ডারের খোঁজে আছি এটা কী করে রাজা টের পেয়ে গেল। আমাকে তখন থেকে চোখে চোখে রাখতে লাগল। আমি এর মধ্যে তলতেক উপজাতির রীতিনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। আমি নাহুয়াতল ভাষাও অনর্গল বলতে পারি। কিন্তু শত চেষ্টা করেও গুপ্তধনের হদিস করতে পারলাম না। যা হোক–কী যে দুর্বুদ্ধি হলো আমার। সেনাপতির দলে ভিড়ে গেলাম। সেনাপতি মড়যন্ত্র করেছিল রাজাকে সিংহাসন থেকে উচ্ছেদ করতে। সেনাপতি অনেক মূল্যবান মুক্তো মণিমাণিক্য দেবার লোভ দেখিয়ে আমাকে দলে টানল। কিছু অনুগামী সৈন্য নিয়ে সেনাপতি রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। রাজা কালহুয়াকান নিষ্ঠুর হাতে সেই বিদ্রোহ দমন করলেন। বিদ্রোহী সেনাপতি ও সৈন্যদের সঙ্গে আমিও বন্দী হলাম। এখন তলতেক উপজাতিদের একটা ধর্মীয় রীতি প্রচলিত আছে, প্রতি তিন মাস অন্তর অমাবস্যার রাতে ওরা কোয়েতজাল দেবতার মন্দিরে নরবলি দেয়। অন্য উপজাতিদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় যাদের বন্দী করা হয় তাদেরই বলি দেওয়া হয়। মৃতদেহগুলি ছুঁড়ে ফেলা হয় বিষাক্ত উপত্যকায়। যে সব বিদ্রোহীদের বন্দী করা হয়েছিল তাদের বলি দেওয়া হতে লাগল। আমার ভাগ্যেও মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু তার আগেই বহু কষ্টে আমি পালালাম। পালিয়ে চলে এলাম এই গৈরিক পাহাড়ের আস্তানায়। গুহার বাইরে একটা গাছের ডাল পুঁতে ছেঁড়া জামাটা ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম। যদি কোনো জাহাজযাত্রীদের নজরে পড়ে। আমাকে উদ্ধার করে। বারিনথাস কথা শেষ করে একটু হাঁপাতে লাগল।
–হুঁ। শুনুন–আমরা যাবো। আপনি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন? ফ্রান্সিস বলল।
–পারবো বৈ কি। কিন্তু আপনাদের জীবনের নিরাপত্তা আমি দিতে পারবো না। উল্টে রাজা কালহুয়াকান আমাকে হাতের কাছে পেলে মেরে ফেলবে।
–ঠিক আছে। সে সব সমস্যার মোকাবিলা আমরাই করবো। ফ্রান্সিস বলল–ব্যাপারটা কি জানেন। জীবনে দুঃসাহসিকতা আমি পছন্দ করি। তাই আমি সমুদ্রযাত্রা করি, দ্বীপে দেশে ঘুরে বেড়াই। যে কোনো কঠিন কাজ করতে আমি ভালোবাসি। প্রথম রাজা কালহুয়াকানের গুপ্ত ধনসম্পদের ওপর আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। কিন্তু সেটা উদ্ধার করবার জন্য নিজের বুদ্ধি সাহস সব কাজে লাগাতে আমি আগ্রহী। বলতে পারেন এটাই আমার জীবন-দর্শন। অবশ্যই এ ব্যাপারে আমার বন্ধুরা আমাকে নানাভাবে সাহায্য করে।
–আপনার কথাগুলো আমার কাছে একটু অদ্ভুত লাগছে। গুপ্তধনের ওপর কোনো লোভ নেই অথচ সেটা উদ্ধার করতে আগ্রহী–এটা ঠিক বুঝলাম না।
হ্যারি হেসে বলল–ফ্রান্সিসের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হোক তাহলেই ওর মনটাকে বুঝবেন।
–আচ্ছা চলি। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। হ্যারিও উঠল।
জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়াল দুজনে। হ্যারি বলল–তাহলে কী স্থির করলে? তলতেকদের দেশে যাবে?
–যাবো বৈকি?
–কিন্তু বন্ধুরা কি সব রাজী হবে? বাড়ি ফেরার জন্যে সবাই মুখিয়ে আছে।
–সে সব আমি বুঝিয়ে বলছি। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর সবাইকে ডেকে উপস্থিত থাকতে বলো।
–বেশ।
সেদিন রাতে খাওয়া দাওয়া বেশ তাড়াতাড়িই সারল সব ভাইকিংরা। ফ্রান্সিস রাতে সভা ডেকেছে। সবাইকে উপস্থিত থাকতে হবে। কেন সভা ডেকেছে ফ্রান্সিস সেটা এ-কান ও-কান হতে হতে সবাই জেনে গেল। ফ্রান্সিস আবার নতুন এক অভিযানে যাবে। কিন্তু খবরটা সত্যি কিনা সেটা ফ্রান্সিসের মুখে শোনার জন্যে সবাই ডেকে এসে জড়ো হলো।
