–ব্রেণ্ডন কী করলেন? হ্যারি জিজ্ঞেস করল। বলছি। বারিনথাস বলল–ঐ বিষাক্ত উপত্যকার মাঝখানে আছে একটি পাথরের চাই আর তার ওপর একটা ফণিমনসার গাছ। সেই গাছটা যে কী করে বেঁচে আছে এটা এক আশ্চর্য ব্যাপার। তার চেয়েও আশ্চর্য বিষাক্ত উপত্যকায় সবুজ কাঠির মতো এক ধরনের ছোট ছোট গাছ আছে। তাতে গাঢ় বেগুনী রঙের ফুল ফুটে থাকে। সেই ফুল যদি কেউ শোঁকে সে সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে যায়। মরে যায় না। কয়েক ঘন্টা পর সুস্থ হয়, কিন্তু তার ঘ্রাণশক্তি চিরদিনের জন্যে লুপ্ত হয়ে যায়।
-তারপর? ফ্রান্সিস আগ্রহ সহকারে বলল।
–ন্যাভিগেশিও বইটিতে লেখা আছে ব্ৰেণ্ডন রাজাকে ঐ বিষাক্ত উপত্যকাতেই ধনভাণ্ডার লুকিয়ে রাখতে উপদেশ দিয়েছিলেন। রাজা নাকি তাই করেছিলেন। কিন্তু কী করে সেই ধনভাণ্ডার লুকিয়ে রাখা হয়েছিল তা লেখক লেখেননি। তারপর ব্ৰেণ্ডন আয়ার্ল্যাণ্ডে ফিরে এসেছিলেন। সেখানেই মারা যান। কিন্তু বিষাক্ত উপত্যকায় রক্ষিত সেই ধনভাণ্ডারের কোনো হদিস তিনি কাউকে দিয়ে যেতে পারেননি।
-এটা কত দিন আগের কথা? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল?
–প্রায় দুশো বছর?
–এখনো কি ঝর্ণাটা থেকে বিষাক্ত জল পড়ে?
–হ্যাঁ, তবে চুঁইয়ে চুঁইয়ে?
–সেই পাথরের চাই ফণিমনসার গাছ এখনো আছে?
–হ্যাঁ। আমি নিজের চোখে দেখেছি।
–উপত্যকার মধ্যে দিয়ে পাথরের ওপর ফণিমনসার গাছের কাছে যাওয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়? অসম্ভব।
–আচ্ছা পরে তো অনেকে রাজা হয়েছে, তারা কেন এই গুপ্তধন উদ্ধারের চেষ্টা করেনি?
–করেছে, কিন্তু ঐ বিষাক্ত উপত্যকা! প্রথম রাজা কালহুয়াকান এরপর যারাই রাজা হয়েছে সবাই কালহুয়াকান পদবীটা তাদের নামের সঙ্গে ব্যবহার করত। এই রীতি এখন পর্যন্ত সব রাজাই মেনে এসেছেন। এখন যে রাজা তারও পদবী কালহুয়াকান।
–আপনি তো ঐ দেশে গিয়েছিলেন?
-হ্যাঁ। ব্ৰেণ্ডনের ন্যাভিগেশিও বইটি পড়েই আমার ঔৎসুক্য জাগে। মাদ্রিদ থেকে বেরিয়ে পড়ি এই স্রোমো রাজ্যের উদ্দেশে। বেশ কটা জাহাজ বদলে একদিন। এই গেরুয়া পাহাড় এলাকায় এসে নামলাম। কয়েকদিন সেই গুহাটাতে রইলাম। তারপর গেরুয়া পাহাড়ের ওপাশের সবুজ তৃণভূমি থেকে যাত্রা করেছিলাম স্ত্রোমো দেশের উদ্দেশে।
–পায়ে হেঁটে? হ্যারি জানতে চাইল।
–না, ঘোড়ায় চড়ে?
–ঘোড়া পেলেন কোথায়?
–গেরুয়া পাহাড়ের ওপাশে সবুজ তৃণভূমির কথা বললাম, সেখানে অনেক বুনো ঘোড়া আর বুনো ভেড়া চরে বেড়ায়। একটা বুনো ঘোড়া ধরে পোষ মানিয়ে তার পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম।
তারপর? ফ্রান্সিস বলল।
–দিন আট দশেক পরে স্ট্রোমো দেশে পৌঁছলাম। আগেই বলেছি ওখানে তলতেক উপজাতির বাস। ওরা ভেড়ার চামড়ার ফুলপ্যান্ট মতো পরে। ওরা তুলোর চাষ জানে। প্রায় সমতল স্রোমো দেশের মাটি কালো। তুলোচাষের খুব উপযোগী। তুলো থেকে সুতীর পোশাক বানিয়ে ওরা ব্যবহার করে। ওদের বাড়িঘর বলে কিছু নেই, বংশ পরম্পরায় চামড়ার তাবুতে বাস করে। তাবু ছিঁড়ে গেলে সারিয়ে নেয়। শুধু কোয়েতজাল দেবতার মন্দিরটা পাথর গেঁথে তৈরি।
–ঐ দেশে গিয়ে আপনি বিপদে পড়েননি?
–প্রথমে কয়েকবার বিপদে পড়েছিলাম। তখন আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। ওরা নাহুয়াতল ভাষায় কথা বলে। ঐ ভাষার কয়েকটা শব্দ আমি শিখেছিলাম। তারই সাহায্যে কথা দিয়ে অঙ্গভঙ্গি করে সৈন্যদের বললাম–আমাকে রাজা কালহুয়াকানের কাছে নিয়ে চল। ওরা আমাকে রাজার কাছে নিয়ে গেল। রাজাকে অনেক কষ্টে বোঝালাম যে আমি ব্ৰেণ্ডন-এর বংশধর। ব্ৰেণ্ডন নামটা ওদের কাছে পরিচিত। ব্রেন প্রথম রাজা কালহুয়াকানের পরামর্শদাতা ছিলেন এটা রাজা জানতেন। আমি প্রাণে বেঁচে গেলাম। আমার স্বাধীন চলাফেরায় আর কোনো বাধাই রইল না।
–কিন্তু আপনি গিয়েছিলেন কেন? হ্যারি বলল।
বারিনথাস হাসল–এখনও বুঝতে পারলে না?
–সেই গুপ্ত ভাণ্ডার উদ্ধার করতে তাই কি না? ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক তাই। কিন্তু দীর্ঘ দশ বারো বছর চেষ্টা করেও সেই ধনভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারিনি। তবে সেই দেশটার সব জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে আমি স্থির সিদ্ধান্তে এসেছি যে গুপ্ত ভাণ্ডার আছে.ঐ বিষাক্ত উপত্যকার মধ্যে যে পাথরের ওপর ফণিমনসার গাছ আছে ওখানেই।
–কিন্তু-ফ্রান্সিস বলল–একটা কথা ভেবেছেন কি সেই বিষাক্ত জলের উপত্যকার মধ্যে ব্ৰেণ্ডন বা রাজা কালহুয়াকান কী করে গুপ্ত ভাণ্ডার রেখে এলেন?
–আমার মনে হয় দুশো বছর আগে ঐ উপত্যকাটা হয়তো অতটা বিষাক্ত হয়ে ওঠেনি।
–তাহলে তো পরবর্তীকালে রাজারা সহজেই গুপ্ত ভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারতেন। ফ্রান্সিস বলল।
বারিনথাস একটু ভাবল। বলল–হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছে।
–আমার মনে হয় ওখানে পৌঁছবার এবং ফিরে আসার নিরাপদ কোনো পথ আছে। হয়তো বিষাক্ত উপত্যকার একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বরাবর কোনো পথ চলে গেছে। সেই পথে গিয়েই ধনভাণ্ডারে রেখে আসা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেই পথ বিষাক্ত জলে ডুবে যায়। পাথরের ওপর ফণিমনসার গাছের কাছে আর তারপরে কেউই যেতে পারে নি। ফ্রান্সিস বলল।
বারিনথাস কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবল। তারপর মাথা তুলে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে হাসল। ফ্রান্সিস তুমি সত্যিই বুদ্ধিমান।
হ্যারি হেসে বলল–ফ্রান্সিসের বুদ্ধি আর সাহসের কাহিনী নিয়ে আমাদের দেশের চারণকবিরা গান বেঁধেছে। গ্রামে গ্রামান্তরে সেই কাহিনী ওরা গেয়ে বেড়ায়।
