–ভালো। বারিনথাস হাসল। হ্যারিও বসল?
–আচ্ছা–বিষাক্ত উপত্যকা ব্যাপারটা কী? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
বারিনথাস একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শিয়রের কাছে রাখা সেই চামড়ার বইটা বের করল। বলল–এই বইটা দেখ।
ফ্রান্সিস বইটার পাতা ওল্টালো। প্রাচীন বই। সাদাটে চামড়ায় লেখা। ফ্রান্সিস লেখার ভাষাটা কিছুই বুঝল না। হ্যারিকে দিল। হ্যারি উল্টেপাল্টে দেখে বলল মনে হচ্ছে কোনো প্রাচীন ভাষায় লেখা।
-–ঠিকই ধরেছেন–এটা প্রাচীন ল্যাটিন ভাষায় লেখা। এই বইটা পড়বার জন্যে আমি অনেক কষ্টে ঐ ভাষাটা শিখেছি। তারপর বইটা পড়েছি। একটু থেমে বলল-বইটা পেয়েছিলাম অদ্ভুতভাবে। মাদ্রিদে রাজপ্রাসাদের পাঠাগারে। সেখানে নানা বিষয়ে পড়াশোনা করতে যেতাম। আগেই বলেছি আমি গৃহশিক্ষকতা করতাম। তখনই ঐ পাঠাগারে একবাক্স পুরোনো বই পুঁথির মধ্যে এই বইটা পাই। সব বইই তো হাতে লেখা। মোটামুটি সব বইয়ের লেখকের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু এই বইটার লেখকের নাম নেই। বইটার নাম ন্যাভিগেশিও। সেন্ট ব্ৰেণ্ডন নামে, একজন ধর্মযাজকের সমুদ্রযাত্রা নিয়ে লেখা। নানা দ্বীপ নানা জায়গায় গিয়েছিল সেন্ট ব্ৰেণ্ডন। একবার আয়ার্ল্যাণ্ডের অনেক পশ্চিমে এক অজানা দেশে পৌঁছেছিল। সেই দেশের নাম স্ত্রোমো। রাজধানীর নাম তুলা। সেই দেশে সেই রাজধানীতে আমি গিয়েছিলাম।
–কোথায় সেই দেশ? হ্যারি জিজ্ঞেস করল?
–এখান থেকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে গেলে আট দশ দিনের পথ?
–তাহলে এটা একটা দ্বীপ নয়?
–না, এটা একটা দেশের পূর্বভাগ। একটু থেমে বারিনথাস বলতে লাগল ন্যাভিগেশিও বইটাতে এসবের একটা অতীত ইতিহাসও লেখা আছে। সেটা বলছি।
বারিনথাস বলতে লাগল–পশ্চিমের দিকে অ্যাজটেক সভ্যতার পত্তন করেছিল একদল রেড ইণ্ডিয়ান। সেই উপজাতির নাম ছিল তলতেক উপজাতি। যে সাম্রাজ্য তারা গড়েছিল তা এক গৃহযুদ্ধে ভেঙে যায়। সেই গৃহযুদ্ধের মধ্যে যারা বেঁচেছিল কালহুয়াকান নামে এক উপজাতি-নেতার নেতৃত্বে তারা অরো পূর্বদিকে সরে আসে। এদের আরাধ্য দেবতার নাম কোয়েতজালকোয়াত্তি। সংক্ষেপে কোয়েতজাল। এই দেবতা নাকি তাদের আদেশ দিয়েছিল–যে উপত্যকায় দেখবি একটা পাথরের ওপর ফণিমনসা গাছ সেখানেই তোরা বসতি স্থাপন করবি। কাহুয়াকানের নেতৃত্বে সেই তলতেক উপজাতির দল মহামূল্যবান হীরে চুনি পান্না দামী পাথর আর প্রচুর সোনা নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে খুঁজতে বেরোয়। কোথায় আছে সেই উপত্যকা যেখানে পাথরের চাইয়ের ওপর রয়েছে ফণিমনসার গাছ। দীর্ঘ বারো বছর তারা নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াল সেই উপত্যকার খোঁজে। দলের কত লোক মারা গেল, কিন্তু অন্বেষণ চলল। অবশেষে ওরা এসে পৌঁছল এই স্রোমো নামে জায়গাটায়। এখানেই তারা দেখল একটি উপত্যকা যেখানে একটি মাত্র পাথরের উপর একটা ফণিমনসার কাটাছাওয়া গাছ। ওদের যাযাবরবৃত্তি শেষ হলো। এখানেই কালহুয়াকান বসতি স্থাপন করল। রাজধানীর নাম তুলা। কোয়েতজাল দেবতার বড় মন্দির তৈরি করল পাথর গেঁথে। দেবতার মূর্তি কাঠ দিয়ে তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করল। বারিনথাস থামল। বইটা খুলে একটা আলগা পাতা বের করল। বলল–এই দেখ কোয়েতজাল দেবতার ছবি।
ফ্রান্সিস ও হ্যারি দেখল ছবিটা।
–কিন্তু এ তো গেল ইতিহাস। বিষাক্ত উপত্যকা কী? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল। বারিনথাস হাসল। বলল–আর একটু ইতিহাস আছে। সব বলছি। একটু থেমে বলতে লাগল–কালহুয়াকানের নেতৃত্ব সেই দল যে মহামূল্যবান হীরে পান্না চুনি প্রচুর সোনা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে বেরিয়েছিল সে সবের কী হলো? ন্যাভিগেশিও বইটিতে তার হদিস নেই। কিন্তু ইঙ্গিত আছে। কালহুয়াকান নিজেকে রাজা বলে ঘেষণা করলেন, সবাই তাকে রাজা বলে মেনে নিল। এখন সেই প্রচুর ধনসম্পত্তি কোথায় লুকিয়ে রাখা যায় এই নিয়ে রাজা কালহুয়াকান খুব চিন্তায় পড়লেন। এই সময়েই সেন্ট ব্ৰেণ্ডন সেই দেশে গিয়ে হাজির হলেন। রাজা কালহুয়াকান তার কোনো ক্ষতি করলেন না। দু একটা ছোটখাট যুদ্ধে ব্ৰেণ্ডন-এর পরামর্শ নিলেন তিনি। সেসব যুদ্ধে সেই পরামর্শেই জিতলেন। এবার ধনসম্পত্তি লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে ব্ৰেণ্ডন-এর পরামর্শ চাইলেন। ব্রেন সমস্ত দেশ, ধারেকাছের গুহা-গহ্বর পাহাড়ের ঢাল সব তন্নতন্ন করে দেখলেন। কিন্তু সেই ধনসম্পত্তি লুকিয়ে রাখার মতো জায়গা পেলেন না।
একটু থেমে বারিনথাস বলতে লাগল–অবশেষে ব্ৰেণ্ডন এলেন বিষাক্ত উপত্যকায়। উপত্যকাটি কোয়েতজাল মন্দিরের পেছনেই। কাছের পাহাড়ের ঢাল থেকে একটা ছোট্ট ঝর্ণা নেমে এসেছে এই উপত্যকায়। খুব ক্ষীণ সেই জলধারা যেন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। সেই ঝর্ণার জল সাংঘাতিক বিষাক্ত। দূর থেকে দেখেছি সেই জলের রং গাঢ় সবুজে। সেই জল জমে জমে সমস্ত উপত্যকাটিতে বিষাক্ত হয়ে গেছে। সেখানে সবসময় কুয়াশা জমে থাকে। সমস্ত উপত্যকাটি ঘাসের চিহ্ন মাত্র নেই। সবুজে শ্যাওলার মতো স্তর জমে আছে। সেই স্তরে মানুষ বা জন্তু জানোয়ার পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া বেরোয়। সেই সঙ্গে তীব্র কটু গন্ধ আর মানুষ বা জন্তু-জানোয়ার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। কোনো তলতেক ভুলেও ওদিকে যায় না। তাই ঐ উপত্যকার নাম বিষাক্ত উপত্যকা। বারিনথাস থামল। একটু হাঁপাতে লাগল।
