উঠতে উঠতে একসময় গুহাটা যে পাশ থেকে দেখেছে সেইদিকে চলে এল। এখানে পাথর কম। গুহাটা দেখা গেল। গুহা পর্যন্ত গেরুয়া রঙের ধুলোটে পথ।
এক সময় গুহার সামনে এল। দেখলগাছের ডালে বাঁধা সাদা জামাটা শতছিন্ন। গেরুয়া ধুলোমাখা। তাতে নীল হলুদ সুতোর কাজ করা।
ওরা এবার হার মুখে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ইঙ্গিত করল। শাঙ্কো তীর ধনুক বাগি এ ধরল।
আস্তে আস্তে তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিস গুহার মধ্যে ঢুকতে লাগল। পেছনে তীর উঁচিয়ে শাঙ্কো। বাইরের তীব্র রোদ থেকে এসেছে। একটু এগোতেই অন্ধকার। কিছুই নজরে পড়ছে না। ফ্রান্সিস অল্পক্ষণ দাঁড়াল। শাঙ্কোও দাঁড়াল। অন্ধকারটা চোখে একটু সয়ে আসতেই দেখল একটু দূরে শুকনো ঘাসের একটা বিছানা। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। খালি গায়ে একটা মানুষ সেই বিছানায় শুয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে একজন শ্বেতকায় মানুষ। এখন অবশ্য রোদে জলে পুড়ে গায়ের রঙ ঘোর তামাটে।
ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে পোর্তুগীজ ভাষায় বলল–আপনি কে? কোনো সাড়া শব্দ নেই। ফ্রান্সিসের কণ্ঠস্বর গুহাটায় প্রতিধ্বনিত হলো। ফ্রান্সিস আবার বলল–আপনার নাম কী? লোকটি নিশ্চপ। শরীরে কোনো সাড়া নেই। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকাল। শাঙ্কো আস্তে বলল–মরে টরে যায়নি তো?
–বুঝতে পারছি না।
ফ্রান্সিস বিছানাটার পাশে এসে বসল। লোকটার ডান হাতটা তুলে নিল। হাতটা একেবারে ঠাণ্ডা নয়। নাড়ী দেখল। নাড়ী চলছে ক্ষীণ ভাবে। বুকে কান পাতল। দুর্বল হৃৎপিণ্ডের শব্দ। তাহলে বেঁচে আছে। ফ্রান্সিস এদিক ওদিক তাকাল। দেখল পাথুরে মেঝেয় একপাশে একটা মাটির হাঁড়ি। হাঁড়িটার কাছে গেল। দেখল তাতে জল ভরা। আরো কয়েকটা হাঁড়িকুড়ি রয়েছে। কালো পোড়া। ও হাতে জল নিল। এগিয়ে এসে লোকটার চোখে মুখে জলের ঝাঁপটা দিল। বারকয়েক জলের ঝাঁপটা দেবার পর হঠাৎ কয়েকবার পিট পিট করে লোকটা চোখ খুলল। তারপর মাথাটা আস্তে আস্তে এপাশ ওপাশ করল। এতক্ষণে ফ্রান্সিস অনেকটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। দেখল লোকটা মধ্যবয়স্ক। মাথায় লম্বা চুল। মুখে বড় বড় দাড়ি গোঁফ।
ফ্রান্সিস এবার ঝুঁকে লোর্কটার কানের কাছে মুখ এনে পোর্তুগীজ ভাষায় বলল–আপনি কে?
খুব ক্ষীণস্বরে দুর্বলকণ্ঠে লোকটা বলল–বা-রিন থা-স।
–আপনি কি অসুস্থ?
–হ্যাঁ। বারিনথাস ক্ষীণকণ্ঠে পোর্তুগীজ ভাষায় বলল?
–আপনি এখানে কী করে এলেন?
–সে অ-নে-ক কথা। আ-আ-মি-বারিনথাস–আর কথা বলতে পারল না। ভীষণভাবে কাশতে লাগল। কাশির ধমকে বুকটা ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। ফ্রান্সিস চুপ করে রইল। কাশি একটু কমতে ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল–আপনি কতদিন এখানে আছেন?
বারিনথাস আস্তে আস্তে ডান হাতটা তুলল। কাঁপা কাঁপা আঙুল তুলে গুহার দেয়ালটা দেখাল। ফ্রান্সিস অস্পষ্ট দেখল গেরুয়া পাথরে দেয়ালে কতকগুলো টানা টানা দাগ। বোঝা গেল দিনের হিসেব। ফ্রান্সিস ওকে আর কোনো কথা জিজ্ঞেস করল না। বুঝলো কথা বললে লোকটা আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। শাঙ্কোকে বলল–শাঙ্কো, একে জাহাজে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এ অবস্থায় নেওয়া যাবে না। তুমি এক কাজ করো। জাহাজের বদ্যিকে ডেকে আনন। চিকিৎসা চলুক। একটু সুস্থ হলে তখন নিয়ে যাবো।
শাঙ্কো চলে গেল বদ্যিকে ডাকতে।
জাহাজ থেকে বদ্যি ওষুধপত্র নিয়ে এল। মৃতপ্রায় বারিনথাসকে পরীক্ষা করে বলল–অসুখ তেমন সাংঘাতিক কিছু নয়। অনাহারে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ভালো হয়ে যাবে।
বদ্যি কোনো রকমে ওষুধ খাওয়ালো। বদ্যি চলে গেল। ফ্রান্সিস বারিনথাসের জন্যে জাহাজ থেকে পোশাক কম্বল পাঠিয়ে দিল।
দিন তিনেক চিকিৎসা চলতে বারিনথাস অনেকটা সুস্থ হলো। ফ্রান্সিস বারিনথাসের সঙ্গে কথা বলে এইটুকু জানতে পারল–ও জাতিতে স্প্যানিশ। তবে পোর্তুগীজ ভাষা ভালোই জানে। স্পেনদেশের রাজধানী মাদ্রিদে সে থাকতো। রাজসভার। এক গণ্যমান্য অমাত্যের বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাজ করত।
বারিনথাস এখন সুস্থ। কয়েকজন ভাইকিং বারিনথাসকে ধরে ধরে জাহাজে নিয়ে এল। আসার সময় বারিনথাস ঘাসের বিছানার তলা থেকে একটা চামড়ায় বাঁধানো বড় খাতা নিয়ে এল। খাতাটা দেখে ফ্রান্সিস বেশ অবাক হলো। কী আছে ওটাতে যে বারিনথাস অনেক যত্নে ওর কাছে রেখে দিয়েছে।
দিন দশেক কাটল। ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা তাগাদা দেয়। বলে, এখানে পড়ে থেকে কী হবে? চলো দেশে ফিরি। কিন্তু ফ্রান্সিসের মন তখন বারিনথাসের বলা একটা কথাই ভাবছে। বারিনথাস একবারই কথাটা বলেছিল। বলেছিল–বিষাক্ত উপত্যকার নাম শুনেছো?
ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলেছিল–না। বারিনথাস আস্তে আস্তে বলেছিল–তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছো। সব তোমাকে বলবো। শরীরটা ভালো হোক।
এই বিষাক্ত উপত্যকার কথা শুনেই ফ্রান্সিস উৎসুক হয়েছিল। কোথায় এই বিষাক্ত উপত্যকা? কী আছে ওখানে? নামটাও বা এরকম কেন? ফ্রান্সিস অনেক কষ্টে নিজের ঔৎসুক্য চেপে রাখল। বন্ধুদের ডেকে বলল–আর কয়েকটা দিন। বারিনথাস সুস্থ হলেই জাহাজ ছাড়বো।
একদিন রাতের খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল-চলো বারিনথাসকে দেখে আসি।
বারিনথাসের কেবিনঘরে ঢুকল ওরা। দেখল বারিনথাস আয়নায় দেখে দেখে চুল আঁচড়াচ্ছে। ওদের ঢুকতে দেখে আয়না চিরুনি রেখে বসল। ফ্রান্সিস বিছানায় বসতে বসতে বলল–তারপর এখন কেমন আছো বন্ধু?
