জাহাজের ডেক-এ দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস তখনও কঙ্কাল দ্বীপের দিকে তাকিয়ে আছে। তখনও ওর মন বিষণ্ণ।
– সমাপ্ত –
বিষাক্ত উপত্যকা
বিষাক্ত উপত্যকা কঙ্কাল দ্বীপ থেকে ফ্রান্সিসদের জাহাজ যাত্রা শুরু করল স্বদেশের দিকে। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়েছিল ফ্রান্সিস আর ওর অভিন্নহৃদয় বন্ধু হ্যারি। ফ্রান্সিস ভাবছিল কঙ্কাল দ্বীপের বর্তমান রাজা মোকার কথা। মন খারাপ লাগছিল ওর। উপহার হিসেবে মোকা ওদের দুটো বিরাট রূপোর থাম দিয়েছে। জাহাজের ডেকের ওপরেই থাম দুটো রেখে দিয়েছে ওরা। দিন রাত নিয়ম করে পাহারা দেওয়া চলছে। আফ্রিকা থেকে হীরের খণ্ড নিয়ে আসার সময় ওরা নির্মম জলদস্যু লা ব্রুশের পাল্লায় পড়েছিল। আবার যাতে ওরকম কোনো বিপদ না হয় তার জন্যে রাত জেগেও পাহারার ব্যবস্থা হয়েছে।
জাহাজ চলেছে। নির্মেঘ আকাশ। বাতাস বেগবান। পালগুলো ফুলে উঠেছে। জাহাজ সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে দ্রুত চলেছে। দাঁড় বাওয়া বন্ধ। জাহাজের কাজও নেই তেমন। ভাইকিংরা জাহাজে এখানে ওখানে বসে শুয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এবার রূপোর থাম নিয়ে যাচ্ছে।
দেশবাসীকে অবাক করে দেবে। সেই সব গল্প, দেশ বাড়ির গল্প এসব চলছে।
বিকেল হলো। পশ্চিমাকাশে লাল টকটকে সূর্য অস্ত গেল। মনে হলো যেন সূর্যটা সমুদ্রের উঁচু উঁচু ঢেউয়ের মধ্যে ডুবে গেল।
সাত আট দিন কেটে গেছে। জাহাজ চলেছে ফ্রান্সিসদের দেশের দিকে।
সেদিন বিকেল হয়ে এসেছে। ভাইকিংরা এখানে ওখানে গল্প করছে। হঠাৎ মাস্তুলের মাথায় বসে থাকা নজরদারের চিৎকার শোনা গেল–ডাঙা, দেখা যাচ্ছে–বাঁ দিকে। ভাইকিংরা সবাই এসে মাস্তুলের নিচে জড়ো হলো। একজন ছুটল ফ্রান্সিসকে খবর দিতে।
একটু পরেই ফ্রান্সিস হ্যারি দুজনেই ডেকে উঠে এল। জাহাজটা তখন ডাঙার অনেকটা কাছে চলে এসেছে। দেখা গেল ডাঙাটা পাথুরে। এক ফোঁটা সবুজ নেই কোথাও। সমুদ্র থেকে উঠে গেছে খাড়া পাহাড়। গেরুয়া রঙের পাহাড়। পাথর ধুলোবালির রঙও গেরুয়া। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–হ্যারি তোমার কী মনে হয়? এটা কি একটা দ্বীপ না দেশ?
–ঠিক বুঝতে পারছি না।
–এখানে তো খাবার জলও পাবো বলে মনে হয় না। পাশ কাটিয়ে চলে যাই কী বলে? ফ্রান্সিস বলল।
-হ্যাঁ, মিছিমিছি এখানে জাহাজ ভিড়িয়ে কী হবে। হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস মুখ ফিরিয়ে জাহাজ চালককে সেই নির্দেশই দিতে যাবে, তখনই মাস্তুলের মাথা থেকে নজরদার চেঁচিয়ে বলে উঠল–একটা সাদা কাপড় মতো কী যেন দেখা যাচ্ছে।
এবার ফ্রান্সিস আর হ্যারি ভালো করে তাকাল। জাহাজটা তখন অনেক কাছে চলে এসেছে। দেখল–পাহাড়ের গায়ে একটা গুহামতো কী দেখা যাচ্ছে। তার সামনে একটা গাছের মোটা ডাল পোঁতা। ডালের মাথায় এক টুকরো সাদা কাপড় বাঁধা। হাওয়ায় উড়ছে। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল-সাদা কাপড়টা দেখেছো?
–হ্যাঁ।
–তাহলে তো ওখানে মানুষ আছে। আর লক্ষ্য করে দেখ-ওটা শুধু কাপড় নয়। একটা ছেঁড়া সাদা জামা।
–হুঁ। হ্যারি বলল–তার মানে বুনো মানুষ না, সভ্য মানুষই কেউ আছে। এখন একদল মানুষ আছে না একজন আছে সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।
–যাহোক–সাদা জামাটা খুঁটিতে বাঁধা হয়েছে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যেই। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। কী করবে এখন?
–একজনই থাক আর একদলই থাক–ওদের তো উদ্ধার করতেই হবে। জাহাজ ভেড়াতে বলল।
–কিন্তু ভেড়াবে কোথায়? উঁচু উঁচু পাথর সব। তা ছাড়া সন্ধ্যে হয়ে আসছে। অন্ধকারে একটা অজানা অচেনা জায়গায় নামা কি ঠিক হবে? হ্যারি বলল।
-তাহলে জাহাজ এখানেই থামাতে বলি। কাল সকালে যা করার করবো।
–সেটাই ভালো হবে।
.
পরদিন। সকালের খাবার খেয়েই ফ্রান্সিস ডেকে এসে দাঁড়াল। জাহাজ-চালককে বলল তোমার কী মনে হয়–জাহাজটা ঐ পাহাড়গুলোর কাছে নেওয়া যাবে?
–হ্যাঁ–যাবে। কারণ পাহাড়গুলো খাড়া উঠে গেছে। কিন্তু। এদিক দিয়ে ঐ পাহাড়ে নামা যাবে না।
-কিন্তু আমাদের তো ওখানে যেতে হবে।
–পাহাড়গুলোর ওপাশটা দেখা যাক?
–তাহলে তাই কর। জাহাজ চলতে শুরু করল। গেরুয়া রঙের পাহাড়গুলোর ওপাশে জাহাজটা আসতেই দেখা গেল একটা সমভূমি মতো রয়েছে। তবে অসমান। পাথর ধুলোয় এবড়ো খেবড়ো। তবে তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যাবে।
জাহাজটা সেই জায়গার অনেকটা কাছে নিয়ে আসা হলো। তারপরেই ডুবো পাথর। জাহাজ যাবে না। জাহাজ থেকে পাটাতন ফেলা হলো। পাটাতন পাথুরে জমি পর্যন্ত গেল না। ওটুকু জলে হেঁটে যেতে হবে।
ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–আমি শাঙ্কোকে নিয়ে আগে যাচ্ছি। কী ব্যাপার দেখে আসি।
–তোমরা মাত্র দুজন যাবে। যদি কিছু বিপদ হয়?
ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডাকল। শাঙ্কো এলে বলল–যাও তীর ধনুক নিয়ে এসো। আর এক টুকরো লাল কাপড়।
একটু পরেই শাঙ্কো তীর-ধনুক হাতে এলো। পাটাতনে পা রেখে রেখে দুজনে তীরের কাছে এলো। বাকিটুকু জলের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। দুজনেই জলে নামল। কোমর অব্দি জলে ডুবে গেল। শ্যাওলা ধরা পেছল পাথরের ওপর পা রেখে ওরা এগিয়ে গেল। তারপর তীরে উঠল।
ফ্রান্সিস চারিদিকে তাকাল। আশ্চর্য! সব পাথরের রঙ গেরুয়া। অন্য কোনো রঙের পাথর নেই। এবার ওরা পাথরের টুকরো ছড়ানো জায়গা দিয়ে চলল। একটু এগোতেই পাহাড়ে ওঠার মতো পথ পেল। বড় বড় পাথরের চাই ছড়ানো। সেগুলোর ওপর পা রেখে রেখে উঠতে লাগল। রোদ বেশ চড়া। সমুদ্রের হু হু হাওয়া বইছে বলেই ওরা ঘামছে না। পাথরগুলো এর মধ্যেই তেতে উঠেছে।
