ওদের জাহাজ যেদিকে ছিল নতুন পাওয়া জাহাজটা সেই দিকে নিয়ে এল। তারপর দ্বীপের ধারে নিয়ে এল। তারপর জাহাজটার নোঙর ফেলল।
তখন বিকেল। ফ্রান্সিস ও হ্যারি জাহাজ থেকে পাটাতন ফেলল। তারপর দ্বীপে নামল। চলল রাজবাড়ির দিকে।
রাজবাড়িতে মোকার সঙ্গে দেখা হল। ফ্রান্সিস বলল–মোকা আমাদের সঙ্গে চলো। একটা জিনিস দেব তোমাকে।
–কী? মোকা বেশ অবাক হল কথাটা শুনে?
–চলোই না। ফ্রান্সিস তাগাদা দিল।
–বেশ চলুন।
সমুদ্রের ধারে এসে ছোট্ট জাহাজটা দেখে মোকা কিছুই বুঝতে পারল না। এই জাহাজ তো ওরা আগে দেখেনি। কোত্থেকে এল এই জাহাজ। ফ্রান্সিস মোকার মনের অবস্থা বুঝল। বলল–মোকা এই জাহাজটা তোমাকে দিলাম।
মোকা নির্বাক। ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস তখন ওকে সমস্ত ঘটনাটা বলল। এবার মোকা বুঝল পাঞ্চোরা এই জাহাজে চড়েই এসেছিল। আজ ওরা কেউ বেঁচে নেই।
মোকা জাহাজটায় উঠল ও কেবিন ঘর, দাঁড়ঘর সব ঘুরে ঘুরে দেখল। আনন্দে ওর চোখে জল এসে গেল। বলল-ফ্রান্সিস আপনি আবার আমাদের বাঁচালেন। আর ব্রিস্তানদের ভয় করি না। ওরা যদি আবার আক্রমণ করে এই জাহাজই সেই আক্রমণের মোকাবিলা করতে পারবে। আপনার কাছে আমরা চিরঋণী হয়ে রইলাম। ও আবেগে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি মোকাকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের আস্তানায় যখন ফিরে এল তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
পরদিন দুপুরে খেতে বসে ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি-জাহাজে খবর পাঠাও। বিদায় কঙ্কাল দ্বীপ। এবার দেশে ফেরা।
কিছু রূপো নিয়ে যাবো না? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
নাঃ। ফ্রান্সিস বলল–রাজাকে অনেককিছু এনে দিয়েছি। এবার আর নাই বা কিছু নিয়ে গেলাম।
বিকালে মোকা এল। জিজ্ঞেস করল–আপনারা কি আজই যাচ্ছেন?
না, কালকে জাহাজ ছাড়বো। ফ্রান্সিস বলল।
একটা অনুরোধ ছিল আমার।
বলো।
আপনাদের ঋণ কেনোভাবেই শোধ করতে পারবো না, তাই বলছিলাম–মন্দিরের দুটো রূপোর থাম যদি আপনারা গ্রহণ করেন।
কী বলছো মোকা? তোমাদের দেবতার পবিত্র থাম।
আমি সদারদের সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই সম্মতি দিয়েছে। পুরোহিতও বলেছে এতে কোনো পাপ হবে না। পরে দুটো থাম তৈরী করে দিলেই হবে।
ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বুঝে উঠতে পারল না কী বলবে। হ্যারি বলল নাও ফ্রান্সিস। মোক এত করে বলছে। তাছাড়া এই থাম দুটো হবে ইকাবোদের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বের নিদর্শন;
–বেশ–ফ্রান্সিস বলল।
পাঞ্চো যে দুটো থাম খুঁড়ে তুলেছিল–সে দুটো পাশাপাশি রাখা হল।
জল দিয়ে থামের তলায় লেগে থাকা মাটি বোয়া হলো। নারকেল ছোবড়া দিয়ে ঘষে উজ্জ্বল করা হলে থাম দুটো। লতাপাতা পশুপাখি খোদাই করা থাম দুটো সুন্দর লাগল দেখতে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি দাঁড়িয়ে এসব দেখছিল। মোকাকে পুরোহিত কী বলল। মোকা ফ্রান্সিসকে বলল-পুরোহিত বলছে–এগুলো পবিত্র থাম। এই দুটোতে যেন কারো পা না লাগে। এগুলো কোনো কারণেই গলাবেন না বা বিক্রি করবেন না।
ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল-নিশ্চিন্ত থাক। এই থামের পবিত্রতা আমরা রক্ষা করবো।
বেশ ভারী থাম। দুদল ইকাবো কাঁধে করে দুটো নিয়ে চলল সমুদ্রতীরের দিকে। ফ্রান্সিস আর হ্যারিও চলল সেই সঙ্গে। সবার সামনে পুরোহিত বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে পড়তে চলল।
সমুদ্রতীরে থাম দুটো নামানো হলো। একটু সমস্যা দেখা দিল। কী করে থাম দুটো জাহাজে তোলা যায়।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে পাঠাল জাহাজের গায়ে বাঁধা সবগুলো নৌকো নিয়ে আসতে। হ্যারি একটা নৌকো চালিয়ে জাহাজে গেল। কয়েকজন ভাইকিং নৌকোগুলো নিয়ে কিছুক্ষণ পরেই এল।
ফ্রান্সিস নৌকোগুলো পরপর সাজাল। মোটা কাছি দিয়ে নৌকোগুলো পরস্পর বাঁধলো। তারপর ইকাবো আর ভাইকিংরা মিলে থাম দুটো সেই নৌকোয় বাঁধা সারির ওপর আস্তে আস্তে রাখল। খুব ভারী থাম দুটোর ভারে নৌকোগুলোর অনেকটা জলে ডুবে গেল। থাম দুটো এবার নৌকোগুলোর সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা হলো। থাম দুটোর আর গড়িয়ে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রইল না।
ভাইকিংরা বৈঠা হাতে নৌকোয় উঠল। এবার ফ্রান্সিসের বিদায় নেবার পালা। মোকা ফ্রান্সিসকেবুকে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ ঐভাবেই রইল। আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে ফ্রান্সিস এবার জড়ো হওয়া ইকাবো নারীপুরুষ শিশুদের দিকে তাকাল। সবাই নির্বাক তাকিয়ে আছে ফ্রান্সিসের দিকে। দুএকজন চোখ মুছছি। ফ্রান্সিসেরও মনটা খারাপ হয়ে গেল। ম্লান হেসে ও হাত নেড়ে বলল-বিদায় ভাই বোনেরা ইকাবোরা কোনো কথা বলল না। একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
ফ্রান্সিস নৌকোয় গিয়ে উঠল। হাতে বৈঠা তুলে নিল। দড়িবাঁধা নৌকোর বহর চলল জাহাজের দিকে। নৌকোর ওপর থাম দুটো।
জাহাজের কাছে পোঁছে ও পেছন ফিরে তাকাল। দেখল ইকাবোরা তেমনি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জাহাজে উঠল সবাই। দড়ি বেঁধে থাম দুটো তোলা হলো জাহাজে। নৌকোগুলো বাঁধা হলো জাহাজের সঙ্গে।
ডেকে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–নোঙর তোল। পাল তুলে দাও। দাঁড়িরা দাঁড়ঘরে যাও বাতাসের তেমন জোর নেই।
সব ভাইকিংরা চীৎকার করে উঠল একসঙ্গে–ওহহহহ। তারপর সবাই যে যার কাজে লাগল।
ঘড় ঘড় শব্দে নোঙর উঠল। পাল খাটানো হলো। জলে দাঁড় পড়তে লাগল—ছপ–ছপ।
একটা পাক খেয়ে জাহাজ চলল। সরে সরে যেতে লাগল কঙ্কাল দ্বীপ। কিছুক্ষণ পরেই আর দেখা গেল না কঙ্কাল দ্বীপ। এখন চারিদিকে শুধু অথৈ জল।
