গেল। পাঞ্চো তরোয়াল ফেলে দিল। দুহাত বুকে চেপে ধরে তীরটা টেনে ধরল এক হ্যাঁচকা টানে তীরটা টেনে খুলে ফেলল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। পাঞ্চো টলতে টলতে পাথুরে মাটিতে গড়িয়ে গেল। দেহটা নড়াচড়া করল কয়েকবার। তারপর স্থির হয়ে গেল।
দলের সর্দারের ঐ মৃত্যু দেখে দলের বাকী সঙ্গীরা ভয়ার্ত চোখে চারিদিকে তাকাতে লাগল। তারপর এক পা করে পিছোতে পিছোতে ছুটতে শুরু করল পেছনের দিকে। ওরা ছুটল দ্বীপের উত্তরদিককার সমুদ্রতীরের দিকে। ফ্রান্সিস বলে উঠল–বিস্কো–শিগগির ছুটে যাও। ফেরাও ওদের। ওদিকে বালিয়ারিতে মৃত্যুর ফাঁদ পাতা। ওদিক দিয়ে সমুদ্র নামলে কেউ বাঁচবে না ওরা।
বিস্কো ছুটল পাঞ্চোর সঙ্গীদের পেছনে পেছনে। চীৎকার করে বলতে লাগল–ওদিকে যেওনা। ফিরে এসো। কোন ভয় নেই। কিন্তু কে কার কথা শোনে। ওরা ছুটে চলল মৃত্যু–সৈকতের দিকে।
এত কাণ্ড ঘটে গেল। ইকবোরা সবাই অবাক হয়ে সব ঘটনা দেখল।
মোকা ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। ও কাঁদতে লাগল। ফ্রান্সিস হেসে বলল–কান্না থামাও। তোমার প্রজাদের সাহস দাও। এখন কান্নার সময় নয়। মোকা শান্ত হল। তারপর ইকাবোদের দিকে তাকিয়ে ওদের ভাষায় কী বলে গেল। ইকাবোরা একে একে ফ্রান্সিসের সামনে এসে মাথা নীচু করে সম্মান জানিয়ে গেল।
ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস মেঝেয় বিছানো কোহালহোটা তুলে নিয়ে মোকার গায়ে পরিয়ে দিল। মোক বলল :
–আপনি যে বললেন সোনার স্তর আছে–কোহালহোর নক্সা থেকে তা খুঁজে বের করবেন।
ফ্রান্সিসহেসেবলল–এসব গপপো কেঁদেছিলাম পালাবার ফন্দী করতে। তোমাদের জীপে আর দামী কিছু নেই। তুমি হতাশ হলে তাই না?
–না ফ্রান্সিস, আমি খুব খুশী হলাম। যদি রূপো সোনা আরো থাকত তবে সব লুঠে নিতে কত জলদস্যু খুনী ডাকাত আসত এই দ্বীপে। আমার প্রজাদের জীবনে অশান্তি নেমে আসত। খুন জখম রক্তপাতে দ্বীপ কলুষিত হত। তার চেয়ে এই ভাল। রূপো যা পাব তাই দিয়ে শুধু গিয়ানি মন্দিরের থাম বসিয়ে যাব। সবই উৎসর্গ করবো দেবতার উদ্দেশ্যে।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল-সত্যি মোকা তোমার মত আমি খুব কমই দেখেছি। একজন আদর্শ রাজা তুমি। একটু চুপ করে থেকে বলল-সভ্যজগৎ থেকে কতদূরে এই কঙ্কাল দ্বীপ। অথচ কত প্রগতিশীল তোমার মন, তোমার চিন্তা। ভাবলে অবাক হতে হয়। মোকা কথা বলল না। মৃদু হাসল শুধু। তারপর ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।
-তোমার হাত কেমন আছে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল?
–এখন একটু ভালো বিছানায় বসতে বসতে ফ্রান্সিস বলল?
–তবে ফেরা যাক কী বলে? হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ তবে আর একটা কাজ রয়েছে?
–আবার কি কাজ?
–আমাদের নৌকা তিনটে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। তাছাড়া পশ্চিম সমুদ্রতীরের দিকে একবার যেতে হবে।
-কেন?
–পাঞ্চো ওর দলবল নিয়ে একটা ছোট জাহাজে চড়ে এসেছিল। ওদিকেই পাঞ্চোর জাহাজটা কোথাও লুকানো আছে। সেটা খুঁজে বের করতে হবে।
–পাঞ্চোর সঙ্গীরা বাধা দিতে পারে।
–হ্যারি, ওঁরা কেউ বেচে নেই।
–বলো কি?
-হ্যাঁ উত্তর সমুদ্র তীরের দিকে পালিয়েছিল ওরা। ওখানে সমুদ্রে কেউ বেঁচে ফেরে না। জাহাজটা এখন খালি। হয়তো দু একজন পাহারাদার থাকলেও থাকতে পারে।
-জাহাজ নিয়ে কি করবে তুমি? হ্যারি জানতে চাইল?
–মোকাকে দেব। তাহলে ত্রিস্তানদের সঙ্গে লড়াই করতে পারবে?
–এখনই বেরুবে?
–হ্যাঁ। চলো–বেলা থাকতে থাকতে জাহাজটা খুঁজে বের করতে হবে?
–চলো।
দুজনে ঘরের দরজা বন্ধ করে বেরুলো। চলল পশ্চিমমুখে। সমুদ্রতীরের দিকে। ঘন জঙ্গল ওদিকটায়। ফ্রান্সিস একটা বিরাট উঁচু সীডার গাছের মাথায় উঠল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ নজরে পড়ল একটা গাছের ডালপাতার ফাঁকে একটা কাঠের মাস্তুলের মত। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে এল।
নীচে মাটিতে নামতে হ্যারি বলল–কী? কিছু হদিশ পেলে?
–হ্যাঁ, চলো।
দিক ঠিক করে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলল দুজনে। গভীর জঙ্গল। পচা পাতার স্তূপ জমে আছে গাছগুলোর নীচে। পা ফেললে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে। গাছের নীচে অন্ধকার। মাঝে মাঝে কোথাও কোথাও রোদের ভাঙা ভাঙা টুকরো যেন। ওর মধ্যে দিয়েই চলল দুজনে। ফ্রান্সিস নিশানা ঠিক করে চলছিল।
কিছুক্ষণ পরেই দেখল একটা সামুদ্রিক খাঁড়ি দ্বীপের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। সেই খাঁড়িতে একটা ছোট্ট জাহাজ নোঙর করা। জাহাজটার কাছাকাছি আসতে দেখল ওদের নৌকো তিনটে দড়ি দিয়ে জাহাজটার সঙ্গে বাঁধা।
জাহাজে ওঠার জন্যে একটা কাঠের পাটাতন ফেলা ছিল। পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে ওরা জাহাজটায় উঠল। জাহাজের ডেক, কেবিনঘর, দাঁড়ঘর, রসুইঘর সবে ঘুরে বেড়াল ওরা। কেউ নেই জাহাজটায়। ছোট জাহাজ। তবে খুব মজবুত।
ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি এসো নোঙর খুলতে হবে।
দুজনে মিলে নোঙর খুলল। হ্যারি দাঁড় ঘরে চলে গেল। দাঁড় টানতে লাগল। ফ্রান্সিস দেখল গাছপালার এলাকা ছাড়াতে না পারলে পাল খাটানো যাবে না। তাই ও দাঁড়ঘরে গেল। দুজনে মিলে দাঁড় বাইতে লাগল। একটু পরেই জাহাজটা চলতে শুরু করল। যেতে যেতে খাড়ি ছেড়ে সমুদ্রে এসে পড়ল।
ফ্রান্সিস ও হ্যারি ডেক-এ উঠে এল। ফ্রান্সিস নিপুণ হাতে দড়ি দড়া ঠিক করে পাল খাঁটিয়ে দিল। পালে হাওয়া লাগতেই পাল ফুলে উঠল। জাহাজ দ্রুত ছুটল।
