পাঞ্চো ওরা চলে যেতে চারিদিক নিস্তব্দ হয়ে গেল।
এবার হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল-তুমি ঠিক জানো আর একটা সোনার স্তর আছে এই দ্বীপে?
-পাগল হয়েছে। আর কিছু নেই এই দ্বীপে।
–তাহলে তুমি সোনার স্তরের কথা বললে কেন?
–এবার সেটা বুঝবে।
এই বলে ফ্রান্সিস খুঁটির সঙ্গে বাঁধা শরীরটা উঁচু করে তুলে বসল। বলল। হ্যারি এবার আলোটা আমার বাঁধা হাত দুটোর কাছে তোমার পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে নিয়ে এস।
হ্যারি পা বাড়িয়ে ঠেলে ঠেলে আলোটা ফ্রান্সিসের বাঁধা হাত দুটোর দিকে এগিয়ে আনতে লাগল। আলোটা একটা মাটির পাত্র। তাতে তেল ভরা। পলতে করা হয়েছে গাছের পাতলা আঁশ দিয়ে।
ফ্রান্সিস বলল-হ্যারি-যদি পাঞ্চোকে বলতাম আলোটা আমার কাছে এনে দাও তাহলে ওর সন্দেহ হত। ও কিছুতেই আলোটা কাছে রাখতে দিত না। কিন্তু ঐ ধাপ্পাটা দিতেই ও কোন আপত্তি করল না। এবার দেখ।
ফ্রান্সিস এবার ঈড়ি বাঁধা হাত দুটো আলোর শিখার ওপর রাখল। বাঁধা দড়িটা পুড়তে লাগল। সেইসঙ্গে ফ্রান্সিসের হাতের কব্জিও। কিন্তু ফ্রান্সিস দাঁত চেপে কব্জি পোড়ার অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগলো। আস্তে আস্তে দড়িটা পুড়ে যেতে লাগল। বেশ কিছুটা পুড়ে যেতেই ফ্রান্সিস দুহাতে হ্যাঁচকা টান দিল। পোড়া দড়ি ছিঁড়ে গেল। ফ্রান্সিস এক লাফে উঠে দাঁড়াল। দুহাতের কব্জি তখন পুড়ে কালো হয়ে গেছে। অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগল। ছুটে গেল বিছানার কাছে। শিয়রের কাছে রাখা তরোয়ালটা নিল। তরোয়ালটা নিয়ে এল হ্যারির কাছে। দ্রুত হাতে তরোয়াল ঘষে হ্যারির হাতের বাঁধন খুলে ফেলল। হ্যারিও লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। বিছানায় শিয়রের পাশ থেকে ওর তরোয়াটা তুলে নিল।
ফ্রান্সিস চিৎকার করতে লাগল-পাহারাদার শিগগির এসো–ঘরে আগুন লেগেছে। আগুন-আগুন। পাহারাদার তাড়াতাড়ি ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকল। দরজার আড়ালেই দাঁড়িয়েছিল ফ্রান্সিস ও ডান পাটা বাড়িয়ে দিল। ফ্রান্সিসের পায়ে হোঁচট খেয়ে পাহারাদার উবু হয়ে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস ওর তরোয়ালের বাঁট দিয়ে পাহারাদারের ঘাড়েমারল। লোকটা আর মেঝে থেকে উঠল না। জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল-হ্যারি শিগগির–ছোটো। বলেই ফ্রান্সিস লাফিয়ে ঘরটার বাইরে চলে গেল। পেছনে হ্যারিও এল। দুজন ছুটল সমুদ্রতীরের দিকে।
অন্ধকার রাত। আকাশে অজস্র তারা। সমুদ্রের দিক থেকে জোরালো হাওয়া বইছে।
ফ্রান্সিস ধ্রুবতারাটা দেখে নিল। তারপর দিকটা ঠিক রেখে ছুটল উত্তর-পূর্ব মুখে সমুদ্রের ধার ঘেঁসে গাছগাছালির গায়ে ওদের নৌকো বাঁধা আছে। নৌকা খুঁজে বের করে নৌকো চড়ে জাহাজে উঠবে গিয়ে।
দুজনে অন্ধকার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ছুটল।
সমুদ্রের ধারে বনজঙ্গলের কাছে যেসময় পৌঁছল তখন পুব আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। সূর্য উঠতে বেশী দেরী আর নেই।
ফ্রান্সিস সমুদ্রের ধারের জংলা এলাকাটায় ওদের নৌকা দুটো খুঁজতে লাগল। আশ্চর্য! একটা নৌকোও নেই। ফ্রান্সিস বুঝল–এসব পাঞ্চোর কাজ। নৌকাগুলো লুকিয়ে রেখেছে কোথাও যাতে ফ্রান্সিসরা ওদের জাহাজের সঙ্গে কোন যোগাযোগ রাখতে না পারে।
ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল-হ্যারি পাঞ্চো নিশ্চয় সব নৌকা লুকিয়ে রেখেছে। আমাকে সাঁতার কেটে জাহাজে যেতে হবে। তুমি পারবে না অত কষ্ট করতে। তুমি বনের আড়ালে লুকিয়ে থাকো। আমি বন্ধুদের নিয়ে আসছি।
-বেশ তো। হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিল। আগুনে পোড়া দুহাতের কব্জিতে সমুদ্রের নোনা জল লাগতে অসহ্য জ্বালা করে উঠল। ওর মুখ দিয়ে চাপা আর্তস্বর বেরিয়ে এল। তবু ফ্রান্সিস দুহাতে জলকেটে সাঁতরে চলল জাহাজের দিকে।
আকাশটা অনেক পরিষ্কার হয়ে এসেছে। দূরে জাহাজটা দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস সাঁতরে চলল। তখনই সূর্য উঠল পূর্ব আকাশে। খুবই পরিচিত দৃশ্য। তবুও আজকে বড়ভাল লাগল সূর্য ওঠা দেখতে। বন্দীজীবন থেকে মুক্তি, বন্ধুদের কাছে যাচ্ছে এসবের জন্যও ওর মন খুশী আজকে।
সাঁতরে চলল ফ্রান্সিস। সকালের রোদ ছড়িয়ে পড়ল সমুদ্রের জলে। জাহাজ আর বেশী দূরে নয়। অনেকখানি সাঁতরে আসতে হলো ওকে। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে শরীর। হাতের কব্জি জ্বলছে। সমুদ্রের নোনা জলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে।
একসময় জাহাজের কাছে এসে পৌঁছল। ঝোলানো দড়ি দড়া ধরে উঠতে গেল। কিন্তু শরীর আর বইছে না। হাতে জোর পাচ্ছে না যে দড়ি ধরে উঠবে।
ফ্রান্সিস দড়ি ধরে হাঁপাতে লাগল। বিশ্রাম নিল কিছুক্ষণ। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে চিৎকার করে ডাকাল–বিস্কো। কিন্তু কেউ শুনতে পেরেছে বলে মনে হল না। আবার পর পর দুবার ডাকল বিস্কো বিস্কো।
এবার রেলিং ধরে কে মুখ বাড়িয়ে দেখল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলে উঠল–দড়ির মই নামাও। ভাইকিংটি এবার ফ্রান্সিসকে চিনতে পারলো। ও ছুটল। সবাইকে খবর দিতে। একটু পরেই সবাই এসে জড়ো হল রেলিঙের ধারে। তাড়াতাড়ি দড়ির মই নামিয়ে দিল। ফ্রান্সিস দড়ির মই বেয়ে বেয়ে জাহাজে উঠে এল।
সবাই এসে ফ্রান্সিসকে ঘিরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস তখনও হাঁপাচ্ছে। বিস্কো বলল–ফ্রান্সিস কী হয়েছে? সব শুনে বিস্কো বলল-হ্যারির কোন বিপদ হবে নাতো?
–না। ওকে বনের আড়ালে রেখে এসেছি?
