সবাই গুহার বাইরে এল। শুরু হল কাছি টানা। একটু পরেই পাথরের চাঁইটা কাত হয়ে গেল। বেশ জোরে গুহার মুখ থেকে জলের ধারা বেরিয়ে এল। বাইরে নুড়ি পাথরের ধুলোবালি সব ভাসিয়ে নিয়ে চলল। এবার জলধারা একটা নদীর চেহারা নিল। সবাই গুহার মুখ থেকে সরে দাঁড়াল।
জলে ভেজা কাপড়-চোপড় নিয়ে ফ্রান্সিস একটা পাথরের ওপর বসল। কিন্তু এত পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে যে বসে থাকতে পারল না। শুয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল। যারা এতক্ষণ গাঁইতি কুড়ল চালাচ্ছিল তারাও এখানে ওখানে বসে পড়ল, কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। ইকাবোরা তখনও আনন্দে হৈ হৈ করছে।
ওদিকে রূপোর নদীর ধারা বয়ে চলেছে সমুদ্রের দিকে। নুড়ি পাথর ধুলোবালির মধ্যে দিয়ে।
একসময় ফ্রান্সিস হ্যারিকে ডাকল। হ্যারি এল। ফ্রান্সিস বলল–নদীটার জলের রঙ দেখেছো?
হ্যাঁ সাদাই।
একটা ন্যাকড়ার জল নিয়ে হেঁকে দেখ তো কিছু তলানি পড়ে কিনা।
কিছুক্ষণ পরে হ্যারি ফিরে এল। হেসে বলল সাবাস ফ্রান্সিস। তোমার অনুমানই ঠিক। ন্যাকড়ায় গুড়ো গুঁড়ো রূপোর আস্তরন পড়েছে। অবশ্য খুব অল্প।
হতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল দীর্ঘদিন ধরে নদীর নীচে এই স্তর পুরু হয়ে জমত। তাই থেকেই ইকাবোরা রূপো তুলতে।
সন্ধ্যে হয়ে গেল। ভাইকিংরা জাহাজে ফিরে গেল। ইকাবোরা নিজেদের বসতিতে। ফ্রান্সিস ও ব্যারি নিজেদের আস্তানায়।
পরদিন। একটু বেলা হয়েছে তখন। ফ্রান্সিসের সবে ঘুম ভেঙেছে। হ্যারি উঠে পড়েছে। মুখ ধুচ্ছে।
হঠাৎ মোকা ছুটতে ছুটতে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,শিগগির দেখবেন আসুন।
কী হয়েছে ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
রূপোর স্তর পাওয়া গেছে।
সত্যি? হ্যারি চমকে উঠল।
ফ্রান্সিস হাসল-ঐ নদীই আসল রূপোর নদী। কুনহা নয়। ওরা আর দেরী করল না দ্রুত পায়ে চলল নদীর দিকে।
সত্যিই রূপোর স্তর। নদীর জল ওপরের ছোট পাথর ধুলো-বালি মাটি সরিয়ে দিয়েছে। বড় বড় কিছু পাথর পড়ে আছে। সেসবের আড়ালে নীচে রুপোর স্তর দেখা যাচ্ছে। গুহা সামনেই সেই স্তরটা স্পষ্ট দেখা গেল। প্রায় এক হাত পুরু নিরেট রূপোর আস্তরণ দেখা গেল। তারপর থেকে পাথর জমা। ওগুলোর নীচটা এখনও পরিষ্কার হয়নি।
এত রূপো? এ যে কল্পনাতীত। মোকা চীৎকার করে বলে উঠল।
মোকা–নইলে মন্দিরের অতগুলো থাম নিরেট রূপোর তৈরি হলো কি করে? ফ্রান্সিস বলল।
–তবে একটা কথা। তোমাদের কুনহা নদীটা শুকিয়ে যাবে।
–বলেন কি? মোকা আশ্চর্য হল।
–হ্যাঁ। কারণ আমার যতদূর মনে হয় অতীতে কোন সময় কঙ্কাল দ্বীপে প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয়েছিল। তাতে রূপোর নদী আর হলুদ জলের নদীর উৎস গলিত লাভা পাথরের ধ্বংসের নীচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। তখনই সৃষ্টি হয়েছিল কুনহা নদী। অন্য এক উৎস থেকে। এখন রূপোর নদী আর হলুদ জলের নদী মুক্ত হয়েছে। তার ফলে অতীতের কঙ্কাল দ্বীপের ভৌগোলিক বিন্যাস আবার অতীতের রূপ নিয়েছে। কুনহা নদী আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাবে। থাকবে শুধু রূপোর নদী আর হলুদ জলের নদী। অবশ্য এগুলো নামেই নদী। আসলে একটা বড় আকারের ঝর্ণা।
–আচ্ছা হলুদ নদীতে রুপোর গুঁড়া নেই কেন? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–তার কারণ দুটো নদীরই উৎস এক হলেও রূপোর নদী রূপোর গুঁড়ো মেশানো পাথরের স্তরের মধ্যে দিয়ে এসেছে। কিন্তু হলুদ জ্বলের নদী এসেছে গন্ধকের স্তরের মধ্য দিয়ে। তাই নদী দুটোর জলের রংএও পার্থক্য রয়েছে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি নিজেদের আস্তানায় ফিরে চলল। ইকাবোরা তখনও রূপোর নদীর দুধারে দাঁড়িয়ে চীৎকার করছে।
জাহাজ থেকে ভাইকিংরা আনন্দে হৈ হৈ করে এল। রুপোর নিরেট আস্তরণ দেখে হতবাক। মাঝে মাঝেই ওরা চিৎকার করে উঠতে লাগল–ও হো-হো।
রাত তখন গভীর। নিজেদের আস্তানা তাসক ঘাস বিছানো বিছানায় ফ্রান্সিস আর হ্যারি ঘুমিয়ে আছে। ঘরটায় ম্যাকরেল মাছের তেলের আলো জ্বলছে।
হঠাৎ কার ডাক শুনে ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। কান পাতল। ওর বাম ধারে আবার কে ডাকল। বুঝল–মোক ডাকছে। উঠে বসল। হ্যারি বলল-মোক ডাকছে মনে হচ্ছে।
-হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে পাথুরে মেঝেয় দাঁড়াল।
–এত রাতে ডাকাডাকি করছে। কী ব্যাপার?
–দেখি। ফ্রান্সিস বলল।
–তরোয়াল নিয়ে যাও। হ্যারি বলল।
–না-না বিপদের কিছু নেই।
সিডার গাছের কাঠের তৈরী দরজার পাল্লাটা খুলল ফ্রান্সিস। দরজাটা তখনও সম্পূর্ণ খোলা হয় নি। দুতিন জন তোক এক ধাক্কায় দরজার সবটা খুলে ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হঠাৎ এই ধাক্কায় ফ্রান্সিস মেঝের ওপর পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দু তিনজন ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। উঠে দাঁড় করাল। তারপর হাতদুটো টেনে নিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। ওদিকে আরো কয়েকজন ছুটে গিয়ে হ্যারির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হ্যারি কিছু বোঝার আগেই ওর দুহাত পেছনে নিয়ে বেঁধে ফেলল।
এবার দরজা দিয়ে মোকা ঢুকল। ঘরের মৃদু আলোতে ফ্রান্সিস দেখল মোকার মুখ ভ কাতর। মোকার পিঠে তরোয়াল ঠেকিয়ে আর একজন লোক ঢুকল। তার মাথায় কাঁচা পাকা বাবড়ি চুল! মুখে কাঁচা পাকা দাড়ি গোঁফ। লোকটার কাঁচাপাকা ভুরুর নীচে চোখদুটো কেমন রহস্যময়। হাসল লোকটা। মোটা গলায় বলল–ভাইকিং দেশের শ্রেষ্ঠ বীর ফ্রান্সিস আমাকে চিন্তে পারো? তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল লোকটার মুখের দিকে। চিনতে দেরী হল না। লোকটা পাঞ্চো। সেই নিজের দেশে সমুদ্রের ধারের এক সরাইখানায় এই পাঞ্চোর সঙ্গে ওর পরিচয় হয়েছিল। এই পাঞ্চোর মুখেই ও প্রথম শুনেছিল-রূপোর নদীর কথা। ফ্রান্সিস বলল–হ্যাঁ চিনেছি। তুমি পাঞ্চো। পাঞ্চো হাসল। বলল–তোমরা সেই বন্দর থেকে জাহাজ চুরি করে পালালে। আমরাও একটা ছোট জাহাজে চড়ে তোমাদের পিছু নিলাম। তোমরা কঙ্কাল দ্বীপে এলে। আমরাও পশ্চিমদিকের জঙ্গলের আড়ালে জাহাজ লুকিয়ে প্রতীক্ষায় রইলাম। ত্রিস্তানদের সঙ্গে যুদ্ধ হল। ত্রিস্তানরা যুদ্ধে হেরে গেল। নিজেদের দ্বীপে চলে গেল। সবই দেখেছি আমরা। পাঞ্চো থামল। তারপর বলতে লাগল ঠিক জানতাম নদীর হদিশও তুমিই বের করবে যা আমরা কখনই পারবো না। তাই তোমার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের একজন তোক ইকাবোদের পোশাক পরে সব সময় থাকতো। তারপর জানলাম–তুমি রূপোর নদী আবিষ্কার করেছে। ফ্রান্সিস আমি জানতাম একমাত্র তুমিই এই ধাঁধার সমাধান করতে পারবে।
