ফ্রান্সিস একে একে ছবিগুলোর নাম দিতে থাকল। তারপর একসময় নাম দেওয়া শেষ হলো;
ফ্রান্সিসের দেওয়া নাম দিয়ে ছবির নক্সাটা দাঁড়াল এরকম :
হ্যারি আর মোকা ঝুঁকে পড়ে নক্সা-ছবিটা মনোযোগ দিয়ে দেখল। হ্যারি বলল–কিন্তু রূপোর নদী কোথায়?
ফ্রান্সিস হাসল। বলল–ডানদিকে যে নদীটা চলে গেছে দেখ ওটা সাদা রঙের আঁকা। ওটাই রূপোর নদী।
কিন্তু কোনো নদীই তো ওদিকে নেই।
অতীতে ছিল। ভূমিকম্পে বা প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয়ে সেই নদীর উৎসমুখ বন্ধ হয়ে গেছে।
এখন কী করবে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
সেই উৎসমুখটা খুলে দিতে হবে। তার জন্যে সকলের সাহায্য চাই। আমরা আর ইকাবোরা মিলে সেই উৎসমুখ খুলে দেব।
মোকা বলল–কিন্তু সেই নদী থেকে কি রূপো পাওয়া যাবে?
নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর হ্যারির দিকে ফিরে বলল–হারি চলো৷ কঙ্কালের বাঁ চোখের কাছে পশ্চিমদিকে যে ধস দেখা যায় সেদিকটা আমায় খুঁটিয়ে দেখতে হবে। রূপোর নদীর উৎস ওখানেই চাপা পড়েছে।
দুজনে উঠল। মোক বলল-চলুন, আমিও যাবো।
ওরা চড়াই পেরিয়ে কঙ্কাল পাহাড়ের মাথার কাছে পৌঁছল। দেখল কঙ্কালের বাঁ চোখের কাছ থেকে পাথরের ধস নেমেছে। ফ্রান্সিস ভাঙা পাথর ধুলোবালির স্তূপ ভালো করে দেখতে লাগল। হঠাৎ নজরে পড়ল নীচে একটা খুব সরু জলধারা নেমে গেছে। ও বলে উঠল–দেখ তোমরা–এখানে কোথাও নিশ্চয়ই জমা জলের স্তর আছে। নইলে ঐ সরু ঝর্ণা থাকত না।
ঐ সরু ঝর্ণাই অনেকদিন থেকে দেখছি আমরা। তবে মাঝে মাঝে ওটা শুকিয়ে যায়। বলল মোকা।
হতে পারে। ফ্রান্সিস বলল–তবু এই জায়গাই আমাদের খুঁড়তে হবে। হ্যারি কাল সকাল থেকেই আমরা খোঁড়ার কাজ শুরু করবো। তুমি জাহাজে বন্ধুদের খবর দিয়ে এসো। মোকা–তুমি ইকাবোদের বলে তারা যেন আমাদের সাহায্য করে।
মোকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
ফ্রান্সিস ও জায়গাটায় দাঁড়িয়ে হ্যারি আর মোকাকে কাছে ডাকল। বলল–ঠিক আমার দৃষ্টি বরাবর নীচের দিকে তাকিয়ে দেখ। কল্পনা কর ঐ নক্সা-ছবির মতো একটা নদী বয়ে গেছে। স্পষ্ট সেই ধারার গতিপথটা দেখতে পাবে। লক্ষ্য করে দেখ সেই গতিপথে শধু ধুলোবালি আর পাথর। কোন গাছ জন্মায় নি।
গাছ জন্মায়নি কেন? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
নিশ্চয়ই ওখানে রূপোর স্তর জমেছিল। রূপোর স্তরে গাছ জন্মাবে কী করে? ওপরের মাটিতে কিছু ঘাস জন্মেছে শুধু।
ওরা ফিরে এল।
সেইদিনই খবরটা রটে গেল–রূপোর নদীর হদিস পাওয়া গেছে। খুঁজে বের করা হবে নদী।
সকাল থেকেই দলে দলে ইকাবো মেয়ে পুরুষ বাচ্চা ছেলেমেয়েরা জড়ো হলো সেখানে। কিছু পরে হ্যারি ভাইকিংদের জাহাজ থেকে নেমে এল। সঙ্গে আনল গাঁইতি, কুড়ুল, কাছি আর হাতুড়ি।
ফ্রান্সিস, আর মোকা এসে পড়েছে তখন। ফ্রান্সিস জায়গা নির্দিষ্ট করে দিল।
শুরু হলো পাথরের স্তূপ সরানোর কাজ। ইকাবোরাও হাত লাগাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাথরের স্তূপসরাতে দেখা গেল একটা গুহার মুখ। গুহার নীচের দিকটার পাথরের স্তর ভেজা। ফ্রান্সিস বুঝল কাছেই কোথাও জল আছে। সেই জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে এসে জায়গাটা ভিজিয়ে দিয়েছে।
গুহায় ঢুকল ফ্রান্সিস। সঙ্গে বিস্কো আর হ্যারি। বাইরের আলো অল্পই আসছে। বেশ অন্ধকার অন্ধকার ভাব।
একটু এগোতেই ফ্রান্সিস দেখল–একটা বড় গহুর নেমে গেছে। ফ্রান্সিস পেছনে দাঁড়ানো বিস্কোকে বলল–কাছি আর একটা জ্বলন্ত মশাল আনন। কাছিটা ঝুলিয়ে দাও।
বিস্কো নিয়ে এল সেসব। ফ্রান্সিস মশালটা হাতে নিয়ে ঝোলানো কাছি ধরে ধরে নামতে লাগল। এক মানুষসমান নামতেই পায়ে ঠেকল একটা পাথরের চাই। ও দেখল এই পাথরের চাঁইটা গহ্বরের মুখটা বুজিয়ে দিয়েছে। হয়তো ওপর থেকে পড়েছিল। পাথরের চাঁইটা ভেজাভেজা। তার মানে নীচে জল আছে।
ফ্রান্সিস মুখ তুলে বলল–বিস্কো, কয়েকজনকে নামতে বলল। এই পাথরের চাঁইটা ভাঙতে হবে।
মশালটা পোঁতা হলো পাথরের খাঁজে। ফ্রান্সিস একটা চুনা পাথরের টুকরো দিয়ে চাঁইটার মাঝবরাবর দাগ দিল। সবাইকে বলল–এই দাগ বরাবর ঘা মারো, যত জোরে পারো।
পাঁচ ছজন কাছি ধরে নামলো। শুরু হলো পাথরের চাইটার ওপর গাঁইতি, কুড়ুল আর বড় বড় হাতুড়ি চালানো। গাঁইতি কুড়ুলের ঘা পড়তে লাগল পাথরের ওপর। আগুনের ফুলকি ছিটকোতে লাগল।
একদল পরিশ্রান্ত হলে অন্য দল নামছে। এইভাবে ঘা মারা চলল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল ঘা মারা।
হঠাৎ পাথরের চাঁইটা ফেটে গেল। যারা হাঁতুড়ি গাঁইতি চালাচ্ছিল ওটার ওপর দাঁড়িয়ে তারা কিছু বোঝার আগে পাথরের চাঁইয়ের একটা অংশ ভেঙে পরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তোড়ে জল উঠতে লাগল। মুহূর্তে গহুরটা জলে ভরে গেল। যারা গাঁইতি, হাতুড়ি চালাচ্ছিল তারা কাছি ধরে একে একে উঠে এল। জল গুহার মুখ দিয়ে ছুটল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচের দিকে, আশ্চর্য! জল সাদাটে। পরিষ্কার। গুহা থেকে জল বেরোতে দেখে বাইরে দাঁড়ানো সবাই উল্লাসে চিৎকার করে উঠল।
মশাল নিভে গেছে। ফ্রান্সিস প্রায় অন্ধকারে জলভরা গহ্বরটায় নামল কাছি ধরে। এক ডুব দিয়ে দেখল পাথরের চাঁইয়ের একটা অংশ ভেঙে উল্টেযাওয়াতে অন্য পাথরের চাইটাও আলগা হয়ে গেছে। ও জল থেকে মুখ তুলল। কিছুক্ষণ শ্বাস নিল। তারপর দম বন্ধ করে আবার ডুব দিল। হাতের কাছিটা সেই আলগা চাঁইটার চারিদিকে বাঁধল। এটা করতে তিন-চারবার ওকেডুব দিতে হলো জলে। মুক্তোর সমুদ্রে যাবার আগেও অনেকক্ষণ জলে ডুবে থাকার অভ্যাস করেছিল। সেটা কাজে লাগাল। এবার উঠে এল। সবাইকে বলল-চলো সব গুহার বাইরে। ওখান থেকে আমরা কাছি ধরে টানবো। চাইটা তাহলেই কাত হয়ে যাবে, আরো জল উঠবে তখন। সেই জলের তোড়ের সামনে আমরা হয়তো ভেসে যেতে পারি।
