হ্যারি বলল–যদি কারো কিছু বলার থাকে বলো। পরে যেন বাড়ি ফেরার বায়না তুলে ঘোঁট পাকিও না।
একজন ভাইকিং বলল ফ্রান্সিস একটা কথা তুমি কি বিশ্বাস করো রূপোর নদী বলে কিছু আছে?
অবশ্যই। ফ্রান্সিস বলল যেমন তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে। কথা বলছো এটা সত্য, তেমনি রূপোর নদী আছে এটা সত্য।
কবে নাগাদ এই রহস্য ভেদ করতে পারবে?আর একজন ভাইকিং বলল।
সেটা নির্ভর করছে রহস্যের সূত্রগুলোর ওপর। তবে যতদুর মনে হয় সপ্তাহখানেকের মধ্যেই এই রহস্যের একটা সমাধানে পৌঁছুতে পারবো।
আর কেউ কোনো কথা বলল না। সভা ভেঙে গেল।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিস হ্যারিকে ডেকে বলল–চলো আজকে কঙ্কাল পাহাড়টা ভালো করে দেখবো। ওটার মাথায় ওঠা যায় কিনা সে চেষ্টা করবো। অবশ্য প্রথমে দেখবো হলুদ জলের নদীটা।
দুজনে বেরোল। সকালের ঝকমকে রোদে-ছাওয়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরের দিকে চলল। হলুদ জলের নদীটার কাছে এল। ফ্রান্সিস নদীটা ভালো করে দেখতে লাগল। নদীর দুধারে হলুদ রঙের স্তর জমে গেছে। ও কোমরের ফেট্টি থেকে একটুকরো বড় ন্যাকড়া বের করল। নদীর জল একটা নারকেলের মালা দিয়ে তুলে ন্যাকড়ায় ছাঁকল। বেশ কয়েকবার। দেখা গেল ন্যাকড়ায় হলুদ স্তর জমে আছে। ফ্রান্সিস সেই স্তর আঙুল দিয়ে ঘেঁটে দেখে হতাশার ভঙ্গীতে ঘাড় নাড়ল। ও রূপোর গুঁড়ো আশা করেছিল। দেখল–অেন কোনোকিছুর চিহ্নমাত্র নেই।
এবার দুজনে চলল কঙ্কাল পাহাড়ের দিকে। চড়াই হয়ে উঠতে লাগল দুজনে। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়াল। পাহাড়টার মাথাটা নরকঙ্কালের মাথার মতো। চোখের একটা বড় গর্তও তাতে। আর একটা গর্ত অর্ধেকটা আছে। বাকীটা ভেঙে ধসে গেছে। হ্যারি সব দেখতে দেখতে বলল–জানো, আমার কেমন সন্দেহ, এই মাথার পুরোটাই প্রকৃতির খেয়াল নয়। মোকাদের পূর্বপুরুষরা এই মাথার চোখ দুটো পাহাড় কুঁদে করেছে।
ফ্রান্সিস ভালো করে দেখল চোখ দুটো। সত্যি সমান দূরত্বে দুটো গহ্বর। প্রকৃতির খেয়াল নাও হতে পারে।
ফ্রান্সিস মাথাটার দিকে তাকাল। তিন দিকই ঢালু। ওঠার উপায় নেই। একমাত্র যে চোখের গর্তটা ধসে গেছে সেখান দিয়েই ওঠা যেতে পারে। সেদিকে পরপর ভাঙা পাথর ছড়ানো। বোধহয় ভূমিকম্পেই এটা হয়েছে।
ফ্রান্সিস পশ্চিম দিকের ঐ ধসা জায়গাটায় এল। ভালো করে ছড়ানো পাথরগুলো দেখল। একটা দুটো করে পাথরে পা রেখে ওপরে উঠতে লাগল। চোখের গর্ত ছাড়িয়ে কপালের কাছে উঠে এল। আর ওঠার উপার নেই। ও লক্ষ্য করল কয়েকটা খোঁদল রয়েছে মাথার দিকে। সেগুলোতে পা রেখে রেখে একসময়ে ফ্রান্সিস বুক দিয়ে ঘষটে ঘষটে পাহাড়ের মাথায় পৌঁছল। পরিষ্কার সব দেখা যাচ্ছে। উত্তর দিকেইকাবোদের বসতি কুনহা নদী, বনজঙ্গল সমুদ্র। দূরে ওদের জাহাজ।
এবার বুক চেপে আস্তে আস্তে দক্ষিণমুখো হলো। ঠিক নীচেই গিয়ানির মন্দির। ছটা রূপোর থাম। বাঁদিকে হলুদ জলের নদী বয়ে যাচ্ছে। বনজঙ্গল। তার পরেই সমুদ্র।
হঠাৎ এই দৃশ্যটা ওকে নাড়া দিল। ও চমকে ভালো করে তাকাল। ঠিক এমনি একটা ছবি ও কোথায় দেখছে। বাঁদিকে হলুদ নদী। সবুজ গাছের নক্সা। সারি সারি। ডানদিকে কী যেন একটা? হ্যাঁ সাদা রঙের নদী। কিন্তু এখানে সেটা নেই। কোথায় দেখেছি–এমনি নক্সা ছবি? কোথায়? হ্যাঁ হ্যাঁ-রাজা মোকার গায়ের কাপড়টা–কোহালহো, জাহাজে রোদ্দুরে শুকোচ্ছিল। ফ্রান্সিস চীৎকার করে উঠল–কোহালহো।
হ্যারি নীচ থেকে বলল–কী হয়েছে?
ফ্রান্সিস চীৎকার করে বলল–রূপোরনদীর রহস্য–ভেদ করেছি। চলো মোকার কাছে।
ফ্রান্সিস দ্রুত পাহাড়ের মাথা থেকে নামতে লাগল। হঠাৎ খোঁদল থেকে পা পিছলে গেল। পড়তে পড়তেও টাল সামলাল। উত্তেজনায় ওর সারা শরীর তখন কাঁপছে। ও সাবধান হলো মাথা ঠাণ্ডা করে আস্তে আস্তে নামতে লাগল।
নীচে নেমেই ডাকল–হ্যারি, শিগগির এসো বলে ছুটল রাজবাড়ির দিকে। পেছনে হ্যারিও ছুটল।
রাজবাড়ির সামনের চত্বরে তখন বিচারসভা বসেছে। মোকা কোহালহো গায়ে দিয়ে কাঠের সিংহাসনে বসে আছে। সামনে একদল ইকাবো দাঁড়িয়ে আছে।
ফ্রান্সিস ছুটে গিয়ে মোকার সামনে দাঁড়াল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–মোকা এখন তোমার বিচারসভা বন্ধ কর। জরুরি কথা আছে।
কী ব্যাপার ফ্রান্সিস? মোকা বেশ আশ্চর্য হলো।
বলছি। তুমি ইকাববাদের যেতে বল।
মোকা ওদের ভাষায় কিছু বলল। ইকাবোরা মোকাকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে চলে গেল।
ফ্রান্সিস বলল–মোকা, মনে হচ্ছে রূপোর নদীর হদিস পেয়েছি।
মোকার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
মোকা জিজ্ঞাসা করলো,–কোথায় তার হদিস পেলে? যা আমাদের পূর্বপুরুষরা খোঁজ করে পায়নি।
ফ্রান্সিস বলল,-সবচাইতে আশ্চর্যের জিনিস কি জানো? রূপোর নদীর হদিশের নক্সা তোমরা বংশপরম্পরায় বহন করে চলেছে।
ফ্রান্সিস আবার বলল–মোকা–তোমার গায়ের কোহালহোটা সিংহাসনের ওপর মেলে দাও। ভাঁজ খুলে।
মোকা আরো আশ্চর্য হলো। তবু ফ্রান্সিস বলছে। কাজেই কোনো কথা না বলে গলায় নারকেলের দড়ি দিয়ে বাঁধা কোহালহোটা খুলে সিংহাসনের উপর মেলে দিল। সেই নক্সার ছবিটা। কঙ্কাল পাহাড়ের মাথা থেকে ফ্রান্সিস ঠিক এই ছবিটাই দেখেছে। শুধু দুটি জিনিষ নেই। গিয়ানির মন্দিরের একটা থাম আর ডানদিকে নদীর ধারাটা। একটা থাম পাঞ্চোরা চুরি করে নিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস বলল–দেখ তোমরা, আমি ছবির নক্সাগুলোর নাম দিচ্ছি। তাহলেই বুঝতে পারবে।
