কারুকার্য। ওখানে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস মুখ উঁচু করে পেছনে তাকাল। দেখল কঙ্কালের মাথার পেছনটা। এবার দক্ষিণমুখে তাকাল। দেখল বাঁ দিকে একটা নদী বয়ে চলেছে। জলের রঙ। হলুদ। ফ্রান্সিসের মনে পড়ল বন্দীদশা থেকে পালানোর সেই ঘটনা। সেদিন ওরাই পাথরের পাতলা আস্তরণ ভেঙে এই নদীটাকে মুক্তি দিয়েছিল। নদীটা সেই গুহা থেকে বেরিয়েছে।
ডানদিকে শুধু বনজঙ্গল। বনজঙ্গল খুব ঘন নয়। ছাড়া ছাড়া।
মন্দিরের ভেতরে অন্ধকারে দেখল কাঠের খোদাই করা গিয়ানি দেবতার মূর্তি। অনেক ইকাবো এসেছে বুনো ফুল ফল দিয়ে গিয়ানির পূজো দিতে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখল। তারপর নিজেদের আস্তানায় ফিরে এল।
সন্ধ্যেবেলা বিস্কো এল। বলল–ফ্রান্সিস, একবার জাহাজে এস।
কেন? কী হলো?
বন্ধুদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
হুঁ।
ওরা আর এখানে থাকতে চাইছে না। অনেকদিন হয়ে গেল–দেশে ফিরে যেতে চাইছে।
রাত্রে আমি জাহাজে যাবো। সবাইকে ডেক-এ থাকতে বলবে।
বেশ। বিস্কো চলে গেল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি চলল রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে। পথেইকাবোদের সঙ্গে দেখা হলে তারা মাথা নুইয়ে ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে সম্মান জানাতে লাগল।
রাজবাড়ির ভেতরের ঘরে ঢুকে ওরা দেখল মোকা প্রদীপের আলোয় কী করছে। ওরা কাছে যেতে মোকা হেসে বলল–আসুন।
পা কেমন আছে?
ভাল। মোকা বলল।
ওরা দেখল মোকা ওর গায়ের কোহালহোর মতো একটা কাপড়ে কী আঁকছিল। গাছের ডাল থেঁতো করে তুলির মতো বানিয়েছে। ওরা যে পাথর গুঁড়ো করে রঙ বানায় শরীরে মুখে উল্কি আঁকার জন্য, তেমনি রঙ একটা চ্যাপ্টা পাথরে রাখা। হ্যারি জিজ্ঞেস করল–ছবি আঁকছো?
হ্যাঁ, বলতে পারেন ছবিই। জানেন তো আমাদের মুখের ভাষা আছে কিন্তু আপনাদের মতো কোনো অক্ষর নেই। আপনাদের জাহাজে থাকার সময় কিছু চামড়ার বই আমি দেখেছি। তখনই ভেবেছি আমাদের ভাষায় লিখিত অক্ষর তৈরী করবো। সেইসব অক্ষর তৈরী করছি।
হ্যারি আর ফ্রান্সিস কথাটা শুনে খুশী হলো। হ্যারি মোকার কাঁধেই চাপড় দিয়ে বলল-এই তো কাজের মতো কাজ। আমি আসবো। এই ব্যাপারে তোমাকে সাহায্য করবো।
তাহলে তো খুবই ভালো হয়। মোকা হেসে বলল।
হ্যারি বলল–অক্ষরগুলো তৈরী করতে খুব কল্পনার আশ্রয় নিও না। তোমরা মুখে গায়ে যে উল্কি আঁকো সেই রূপগুলো দিয়ে অক্ষর তৈরী করো। ইকাবোদের কাছে সেসব সহজবোধ্য হবে। পরিচিত উল্কির রূপ দেখে ওরা তাড়াতাড়ি অক্ষর চিনতে পারবে।
ভালো কথা বলেছেন। মোক বলল–আমি এদিকটা আগে ভাবিনি।
মোকা আর হ্যারি অক্ষর তৈরীর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে লাগল। ফ্রান্সিস চুপ করে কিছুক্ষণ ওদের কথা শুনল। তারপর একসময় বলল–হ্যারি,এখন ওসব আলোচনা রাখো। মোকার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।
বেশ বলো।
ফ্রান্সিস মোকাকে বলল–দেখ মোকা, আমরা সারা কঙ্কাল দ্বীপ যথাসাধ্য ঘুরে ঘুরে দেখেছি। কিন্তু রূপোর নদীর কোন হদিস করতে পারছি না।
অনেকেই চেষ্টা করেছে। বাবাও চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কেউ খুঁজে বের করতে পারেনি। মোকা বলল।
আচ্ছা–রূপোর নদীর সম্বন্ধে তোমার বাবা কী বলতেন? সত্যিই কি রূপোর নদী ছিল?
বাবা বিশ্বাস করতেন যে রূপোর নদী ছিল। বাবা আমাকে একদিন বলেছিলেন যে তিনি নাকি ঠাকদার মুখে শুনেছেন–রূপোর নদী বেরিয়েছে কঙ্কালের জটা থেকে।
ফ্রান্সিস চমকে উঠলো। কঙ্কালের জটা মানে কঙ্কালের মাথার পেছন দিক। সেদিকে একটা নদী তো ওরাই গুহা থেকে বের করে দিয়েছিল। কিন্তু সে নদীর জলতে হলদেটে। সেটায় কি রূপোর গুঁড়ো আছে? দেখতে হয় তাহলে।
আর কিছু বলতেন তোমার বাবা?
না। শুধু ঐ কথাই একদিন বলেছিলেন।
তোমার কী মনে হয়?
দেখুন, ঐ নিয়ে আমি ভাবি না। রূপ তত খাদ্য নয় যে ইকাবোরা খাবে। উত্তরের বন অনেকখানি পুড়ে গেছে। জন্তু-জানোয়ার, পাখি মারা গেছে। কিছু দিনের মধ্যে আমার প্রজাদের খাদ্যাভাব দেখা দেবে। আমি ঐ নিয়েই ভাবছি এখন।
কথাটা শুনে ফ্রান্সিস খুব খুশী হলো। একজন দায়িত্ববোধসম্পন্ন রাজার মতোই মোকার চিন্তা। ফ্রান্সিস বলল–তোমাকে আর বিরক্ত করবো না। চলি।
দুজনে ফিরে এল।
একটু রাতহতে ফ্রান্সিস আর হ্যারি নৌকো বেয়ে চলল জাহাজের দিকে। আজকে জ্যোৎস্না আরও উজ্জ্বল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় জ্যোত্সা চিকচিক করছে। শান্ত হাওয়া বইছে।
ওরা যখন জাহাজের ডেক-এ উঠল–দেখল সবভাইকিংরা উপস্থিত। বসে দাঁড়িয়ে সবাই ফ্রান্সিসের জন্যে অপেক্ষা করছে।
ফ্রান্সিস একবার সকলের দিকে তাকিয়ে নিয়ে উচ্চস্বরে বলতে লাগল–ভাইসব–যাত্রা শুরু করবার আগেই আমি বলেছিলাম অনেক দুঃখকষ্ট সহ্য করবার জন্যে আমাদের তৈরী থাকতে হবে। আমরা এখানে চড়ইভাতি করতে আসিনি। রূপোর নদী খুঁজে বের করবার সংকল্প নিয়ে এসেছি। অবশ্য কষ্ট লড়াইয়ের দিন শেষ হয়েছে। এখন বুদ্ধির জোরে এগোতে হবে। তার জন্যে তোত প্রয়োজন পড়বে হয়তো। কিন্তু সেটা পরে। এখন তো তোমাদের আনন্দেই দিন কাছে। তবে অধৈর্য হয়ে উঠছো কেন? ফ্রান্সিস থামল। কেউ কোনা কথা বলল না। ফ্রান্সিস আবার বলতে লাগল–যা হোক আমাদের বেশীদিন অপেক্ষা করতে হবে না। রূপোর নদীর হদিস পেতে আর দেরী নেই। কব্জির লড়াইয়ের দিন শেষ। এখন বুদ্ধির লড়াই চলছে। এ সময়ে তোমরা দেশে যাবো এই বলে ঝামেলা বাড়িও না। এভাবে আমার মনের একাগ্রতা নষ্ট করো না। এটা আমার আদেশ নয়–অনুরোধ। ব্যা–আর আমার কিছু বলবার নেই। ফ্রান্সিস থামল কেউ কোনো কথা বলল না।
