নেমে আসার পথে এখানে ওখানে ত্রিস্তান যোদ্ধাদের মুখোমুখি পড়ল ওরা। কিন্তু ত্রিস্তান যোদ্ধারা তখন নিজেদের প্রাণ বাঁচাতেই ব্যস্ত। ওদের দিকে চাইবার সময় কোথায়
আবার একটা ছোট ফাটল পড়ল। ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ওরা লাফিয়ে পার হলো। কাঁধে আহত মোকা। খুব জোরে ছুটতে পারছিল না ওরা।
ফ্রান্সিস আর বিস্কো সমুদ্রতীরে পৌঁছুল। কিন্তু নৌকো কোথায়? তীর ধরে খুঁজতে খুঁজতে জঙ্গলের আড়ালে একটা ক্যানো পেল। সেটাতেই উঠল ওরা। মোকাকে সাবধানে গলুইতে শুইয়ে দিল। আগ্নেয়গিরির মাথায় কখনও কখনও আগুনের আলোর তীব্রতা ঝলসে উঠছে। সেই আলোয় ফ্রান্সিস দেখল মোকার ডান পাটা বেশ জখম হয়েছে। রক্ত পড়ছে। সমুদ্রের জল হাত দিয়ে তুলে ক্ষতের জায়গাটা ধুয়ে দিল। ক্ষতে নোনা জল লাগাতে বোধহয় জ্বালা করে উঠল। মোকাও কঁকিয়ে উঠল। কোনো কথা বলল না।
এবার ফ্রান্সিস সমুদ্রের দিকে তাকাল। আগ্নেয়গিরির আলোয় যতদূর দেখা যাচ্ছে ওদের জাহাজ কোথাও নেই। ফ্রান্সিস বলল–বিস্কো, আমরা দক্ষিণ ঘেঁষে এসেছি। দ্বীপের ধার ধার দিয়ে এবার উত্তর ঘেঁষে যাবো।
ফ্রান্সিস নৌকোর গলুইতে বৈঠা খুঁজল। পেল না। তখন নৌকোর ওপর বুক লাগিয়ে শুয়ে হাত দিয়ে জল ঠেলতে লাগল। সমুদ্রে তখন বাতাসের তেজ নেই। শান্ত সমুদ্র। ঢেউও ছোট ছোট। হাত দিয়ে জল ঠেলে নৌকো চালাতে লাগল ফ্রান্সিস। নৌকো দ্বীপ ঘুরে চলল। ফ্রান্সিস ডাকল–বিস্কোও তুমিও হাত লাগাও- বিস্কো ওর মত শুয়ে পড়ে হাত দিয়ে ঠেলতে লাগল। নৌকো চলল। কোথাও কোথাও সমুদ্রের জল ভুস ভুস করে উঠছে। ওরা সেগুলো পাশ কাটিয়ে চলল।
ফ্রান্সিস আগ্নেয়গিরির দিকে তাকাল। দেখল–এবার পাহাড়ের মাথা থেকে গলিত লাভার স্রোত নেমে আসছে। লাল হলুদ ধোঁয়া উঠছে গলিত লাভা থেকে।
ত্রিস্তান দ্বীপের পশ্চিমদিকের বাঁকটা পেরোতেই ওরা অস্পষ্ট দেখল দূরে ওদের জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। হাত দিয়ে জল ঠেলে ঠেলে ওরা জাহাজের দিকে নৌকো নিয়ে চলল।
ক্যানো নৌকো ঢেউ ভেঙে খুব আস্তে আস্তে চলছে। বিস্কো একবার চিৎকার করে উঠল-ও-হো-হো-। কিন্তু সেই চিৎকার জাহাজে গিয়ে পৌঁছল না।
হঠাৎ আগ্নেয়গিরিতে আর একবার অগ্নদগার ঘটল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে গায়ের জামাটা খুলে উঠে দাঁড়াল। জামাটা হাতে দিয়ে ঘোরাতে লাগল। এবার সমুদ্রে অনেকদূরে পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা গেল। জাহাজে ভাইকিংরা সবাই ডেক-এ এসে দাঁড়িয়ে আছে তখন। হ্যারিকে সবাই জিজ্ঞেস করছিল–আমরা কী করবো এখন?
হ্যারি দুহাত তুলে বলল–ফ্রান্সিস তিন দিন অপেক্ষা করতে বলেছিল। আমাকে ভাবতে দাও আর কেউ কোনো কথা বলল না।
হ্যারি ভুরু কুঁচকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ত্রিস্তান দ্বীপের দিকে। তখনই আগ্নেয়গিরিতে অগ্নদাগার হলো। সেই আলোয় হ্যারি নজরে পড়ল ক্যানো নৌকোটা। নৌকোয় দাঁড়িয়ে কে কাপড় নাড়ছে। হ্যারি চীৎকার করে বলল–ভাই সব, ফ্রান্সিসরা আনছে। ঐ দেখ ক্যানো নৌকো।
ততক্ষণে অনেকেরই নজরে পড়েছে ক্যানো নৌকোটায়। ওরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল-ও-হো-হো-।
ফ্রান্সিস আর বিস্কোও নৌকো থেকে চিৎকার করল–ও হো-হো-ওদের চিৎকার জাহাজ থেকে শোনা গেল না।
নৌকোর আসার গতি দেখে হ্যারির মনে সন্দেহ হলো। এত আস্তে আসছে কেন নৌকোটা? ও কয়েকজন ভাইকিংকে ডাকল। বলল–নৌকো নামাও। ওদের নৌকো নিয়ে এসো।
তখনই কয়েকজন ভাইকিং দড়ি বেয়ে নেমে এল নৌকোর ওপর। তারপর দুটো নৌকো চলল ফ্রান্সিসদের নৌকো লক্ষ্য করে।
ভাইকিংরা ফ্রান্সিসদের নৌকোটা ওদের একটা নৌকোর সঙ্গে বাঁধল। তারপর দ্রুত চলল জাহাজের দিকে।
ফ্রান্সিসরা যখন জাহাজের ডেক-এ উঠল তখন বন্ধুদের মধ্যে আনন্দের বান ডাক যেন। ফ্রান্সিস বিস্কো অক্ষত দেহেই ফেরেনি শুধু মোকাকেও মুক্ত করে এনেছে।
মোকাকে ধরাধরি করে কেবিন ঘরে শুইয়ে দেওয়া হলো। জাহাজের বৈদ্য কাঁচের বোয়ামে ওষুধপত্র নিয়ে এল। মোকার ক্ষত পরীক্ষা করে ওষুধ দিল। মোকা ঘুমিয়ে পড়ল। জাহাজ আবার রওনা হল কঙ্কালদ্বীপের উদ্দেশ্যে।
এবার শুরু হলো ফ্রান্সিসের রূপোর নদী খোঁজা। অনেক অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু রূপোর নদীর হদিস পায়নি। সেই নদী খুঁজে বের করতে হবে।
কঙ্কালদ্বীপে ফ্রান্সিস আর হ্যারি ইকাবোদের দেওয়া একটা ঘরে আস্তানা নিয়েছে। প্রায় সারাদিনই ওরা দ্বীপটা ঘুরে বেড়ায় যদি রূপোর নদীর কোনো হদিস মেলে। দ্বীপটা নেহাৎ ছোট নয়। কাজেই চার-পাঁচ দিন লেগে গেল সমস্ত দ্বীপ ঘুরে ফিরে দেখতে।
বসতি এলাকায় ওরা যখন ঘুরে বেড়ায় ইকাবোরা মাথা নুইয়ে ওদের শ্রদ্ধা জানায়। ফ্রান্সিস আর হ্যারি ইকাবোদের বাচ্চা ছেলেমেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করে। ইকাবোরা খুব খুশী হয়।
সেদিন ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল–চলো গিয়ানির মন্দিরটা দেখে আসি। ওটা ভালো করে দেখা হয়নি।
দুজনেই বেরোল মন্দিরটার উদ্দেশ্যে।
কঙ্কাল পাহাড়ের মাথার নীচেইদক্ষিণ দিকে সেই মন্দিরটা। এদিকটায় ইকাবোদের বসতি কম। ওরা ঘুরে ঘুরে মন্দিরটা দেখতে লাগল। মন্দিরটা চারকোণা। গাছের ডাল, তাসক ঘাস আর নারকেল পাতা দিয়ে বোনা ছউনি মন্দিরের চারটে চৌকোণা থাম রূপোর। বেশ মোটা রূপোর থামগুলো।
তাছাড়া মন্দিরের সামনে অর্ধগোলাকারভাবে সাজানো ছটা রূপোর থাম। হাত দিয়ে দেখল, বেশ মোটা নিরেট রূপোর তৈরী থামগুলো। তাতে লতাপাতা আঁকা নানা
