বলুন। মোকার কণ্ঠস্বরে হতাশা।
তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে।
মোকা কোন কথা না বলে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল।
ত্রিস্তানদের রাজার সঙ্গে কথা হলো। রাজা বলছে তোমাদের গিয়ানির মন্দিরের রূপোর থামগুলো ওকে দিয়ে দিলেই ওরা তোমাকে মুক্তি দেবে।
জানি।
তুমি রূপোর থামগুলো দিয়ে দিও না।
মোক একটু ক্ষণ মাথা নীচু করে রইল। তারপর মুখ তুলল। ফ্রান্সিস সেই স্বল্প আলোয় দেখল মোকার চোখে জল। মোকা ভারী গলায় আস্তে আস্তে বলল–গিয়ানির পবিত্র মন্দিরের থাম–অসম্ভব। ওগুলো ত্ৰিস্তানদের দেবার আগে আমার যেন মৃত্যু হয়।
ফ্রান্সিস ও রকম উত্তর আশা করেনি। ও বুঝল গিয়ানি দেবতা আর তার মন্দিরের ওপর ইকাবোদের শ্রদ্ধাভক্তি কত গভীর। বলল–আমাকে মাফ কর মোকা। আমি ঠিক বুঝিনি। একটু থেমে বলল–কিন্তু এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার কথাটাও তো ভাববে?
মোকা ম্লান হাসল। বলল-আমি নিজে না হয় এই বন্দীদশাতেই মারা গেলা। আমার প্রজারা তো বাঁচবে–গিয়ানির পবিত্র মন্দিরও থাকবে।
ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। বুঝলমুক্তির অন্য কোনো উপায় ভাবতে হবে।
ফ্রান্সিসদের বন্দীদশার দুদিন কাটল। ত্ৰিস্তানরা ওদের সারাদিনে দুবার খাবার দিয়ে যায়। বুনো ফলের তরকারী মতো আর সামুদ্রিক মাছ সেদ্ধ। খিদের জ্বালায় তাই খেয়েছে ওরা। তারপর নারকেলের মালায় চক চক করে জল খেয়েছে।
সেদিন বিকেলে সেই দোভাষী বৃদ্ধ ত্রিস্তানটি এল। রাজাইনাকি পাঠিয়েছে ফ্রান্সিসদের সিদ্ধান্ত জানতে। ফ্রান্সিস স্পষ্ট বলল–গিয়ানির দেবতার মন্দিরের থামের বিনিময়ে মোকা বাঁচতে চায় না। বৃদ্ধটি কথা শুনে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল। ফ্রান্সিস বলল–রাজাকে গিয়ে বলুন–বিনা শর্তে আমাদের সবাইকে যেন মুক্তি দেন। নইলে আমাদের জাহাজ কাছে আছে। আমার বন্ধুরা তৈরী! কালকের মধ্যে আমাদের মুক্তি না দিলে আমার বন্ধুরা এই দ্বীপ আক্রমণ করবে। তখন আপনারা কেউ বাঁচবেন না। আমরা ভাইকিং। একমাত্র মৃত্যু হলেই আমরা অস্ত্র ত্যাগ করি তার আগে নয়। রাজাকেবলুন–আমরা অযথা রক্তপাত চাইনা।
বৃদ্ধটি ফ্রান্সিসের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে আস্তে চলে গেল।
বেশ রাত তখন। ঘরের কোণায় ম্যাকরে মাছের তেলের প্রদীপ জ্বলছে খুঁটিতে হাত বাঁধা অবস্থাতেই ফ্রান্সিসরা শুয়ে আছে মাটিতে। বিস্কো আর মোকা ঘুমিয়ে পড়েছে। দরজার বাইরে একটা পাথরের উপর একজন ত্ৰিস্তান পাহারাদার বসে আছে। ও ঘুমে ঢুলে ঢুলে পড়ছে। ফ্রান্সিস দেখল ওদেরই একটা তরোয়াল পাহারাদার কোলের ওপর রেখেছে। ও তরোয়ালটার দিকে তাকিয়ে রইল। ঈস্ একবার খোলা হাতে তোয়ালটা পেলে হঠাৎ একটা কানফাটা শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে এক ঝলক লাল আলো ঝলসে উঠল বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে মাটি দুলে উঠল। ঘরটা একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেল। দরজাসুন্ধু বাইরের পাথরের দেয়ালটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল পাহারাদারের ওপর। ওর কোল থেকে তরোয়ালটা ছিটকে গেল। মোকা আর বিস্কো লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। ভীষণ দুলে দুলে উঠছে ঘরটা ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল–আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছে।
বিস্কো চেঁচিয়ে বলল–ফ্রান্সিস, আমার খুঁটিটা উপড়ে গেছে।
তাহলে শীগগির ভাঙা দরজার কাছে যাও। আলো এখনও নেভেনি। তরোয়ালটা খুঁজে বের কর। আমাদের বাঁধন কাটো তাড়াতাড়ি। ফ্রান্সিস দ্রুত বলে গেল।
আবার আলোর ঝলকানি। সেইসঙ্গে গুড় গুড় একটানা শব্দ। আবার মাটি দুলে উঠল। বিস্কো খুঁটিটা থেকে হাতটা খুলে নিল। কোনরকমে টাল সামলাতে সামলাতে ভাঙা দরজার কাছে গেল। প্রদীপের স্নান আলোয় দেখল পাথরের নীচে তরোয়ালের হাতলটা বেরিয়ে আছে। ও হাতলটা ধরে এক হ্যাঁচকা টানে তরোয়ালটা বের করে আনল। তারপর ছুটে এল ফ্রান্সিসদের কাছে। ওদের দুজনের হাতের বাঁধন কেটে দিল। নিজেরটাও কাটল। ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল বাইরে চলো শীগগির।
ওরা দ্রুত ছুটতে যাবেতখনই ঘরের একপাশের পাথুরে দেওয়াল শব্দ তুলে ভেঙে পড়ল। ঐ দেয়ালের দিকে ছিল মোকা। মোকা সরে আসতে আসতেও শেষ রক্ষা হলো না। একটা বড় পাথর গড়িয়ে মোকার ডানপায়ে এসে পড়ল। মোকা আর্তনাদ করে উঠল। তারপর বসে পড়ল। ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল–বিস্কো মোকার পায়ের দিকে ধরো।
বিস্কো ছুটে গিয়ে মোকার পায়ের দিকে ধরল। ফ্রান্সিস ধরল ওর মাথার দিক। তারপর সন্তপর্ণে ভাঙা দেয়ালের পাথর ডিঙিয়ে ওরা বাইরে চলে এল। ঠিক তখনই সমস্ত ঘরটা শব্দ তুলে ভেঙে পড়ল।
ওরা দুজনে মোকাকে কাঁধে নিয়ে ছুটল সমুদ্রতীরের দিকে। একবার পেছন ফিরে দেখল–সেই চ্যাপ্টা মাথা পাহাড়টারমাথা থেকে লক্ষ লক্ষ ফুলকির মতো আগুনের ফণা থেকে থেকে ছিটকে উঠছে আকাশের দিকে। সেই আলায় ত্রিস্তান দ্বীপ আলোকিত। বহুদূর পর্যন্ত সমুদ্রও দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। পাহাড়ের মাথা থেকে কালো ঘন ধোঁয়া বেরোচ্ছে গল গল করে! আকাশে অনেক দূর উঠে গেছে সেই ধোঁয়া।
পায়ের নীচে ধুলো পাথরভর্তিজমি দুলে দুলে উঠছে। হঠাৎ সামনেই একটা ফাটল দেখা গেল। ফাটল থেকে তোড়ে গরম ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ওরা ফাটল এড়িয়ে অন্যদিকে ছুটল।
আগ্নেয়গিরির মাথায় আগুনে-আলোর তীব্রতা কখনও বাড়ছে কখনও কমছে। ওরা বসতির কাছে এল। দেখল ত্ৰিস্তানদের অনেক বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। চিৎকার কান্নাকাটি শোনা গেল। কিছু ত্ৰিস্তান বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে দেখা গেল। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে আগ্নেয়গিরির দিকে মুখ করে। একবার দুহাত তুলছে। উবু হয়ে মাটিতে দুহাত রাখছে। আবার উঠে বসছে।
