ফ্রান্সিস থামলে হ্যারি বলল–যদি তোমাদের কাউকে ওরা মুক্তি না দেয়?
তখন তোমরা আমাদের মুক্ত করতে মারে। তিন দিনের মধ্যে আমরা যদি না ফিরি তখন তোমরা আক্রমণ করবে। ফ্রান্সিস থামল। আর কেউ কোনো কথা বলল না। বোঝা গেল, সকলেই ফ্রান্সিসের পরিকল্পনা মেনে নিল।
কিছুক্ষণ পরে ফ্রান্সিস আর বিস্কো তৈরী হয়ে এল। কিছু খাবার আর তরোয়াল নিল সঙ্গে। জাহাজ থেকে ঝোলানো পঁড়ি বেয়ে বেয়ে দুজনে একটা নৌকায় নেমে এল। দড়ি খুলে নৌকা ছেড়ে দিল। বিস্কো বৈঠা তুলে নিল। নৌকো বাইতে লাগল ত্রিস্তান দ্বীপের উদ্দেশ্য। ঢেউয়ের ঘায়ে নৌকা ওঠা-পড়া চলল। পরিষ্কার নীল আকাশ। আকাশ সমুদ্র জুড়ে ঝকঝকে রোদ।
ত্ৰিস্তান দ্বীপে যেখানে পৌঁছল সে দিকটায় বড় বড় গাছের জঙ্গল। ফ্রান্সিসের নির্দেশে একটা ফাঁকা জায়গায় ওরা নৌকা ভেড়াল।
তীরে নেমে একটা বড় পাথরের সঙ্গে নৌকার দড়িটা বাঁধল। তারপর দুজনে এগিয়ে চলল। কয়েক পা এগিয়েছে তখনই জঙ্গল থেকে একদল ত্ৰিস্তান যোদ্ধা কাঠের বর্শা হাতে ওদের দিকে ছুটে এল। দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়ল। যোদ্ধারা ওদের ঘিরেদাঁড়াল। ওদের মধ্যে সর্দার গোছের একজন ত্ৰিস্তান ভাষায় কী যেন জিজ্ঞেস করল। ফ্রান্সিসরাও কিছুই বুঝল না। ফ্রান্সিস কোমর থেকে তরোয়াল খুলে সামনের ঘাসে-ঢাকা জমিতে ফেলে দিল। বিস্কোও ফ্রান্সিসের দেখাদেখি তরোয়াল ফেলে দিল। তখন সদার গোছের একটা একজনকে কী বলল। সে ছুটে গিয়ে বনের মধ্যে থেকে একটা লতাগাছনিয়ে এল। পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলে লতা দিয়ে ফ্রান্সিস আর বিস্কোর হাত বাঁধল। তারপর সর্দার চলার ইঙ্গিত করল। ওরা দুজন সদারের নির্দেশমতো হাঁটতে লাগল। একজন এদের তরোয়াল দুটো তুলে নিয়ে চলল।
কিছুটা এগোতেই বসতি এলাকা শুরু হলো। বাড়িগুলো সব কাঠ পাথর আর তাসক ঘাসের তৈরি। বাড়িগুলো থেকে ত্রিস্তান স্ত্রী-পুরুষ বা ছেলে-মেয়েরা বেরিয়ে এল। দেখতে লাগল বন্দী দুজনকে।
একটু পরেই চারিদিকে পাথরের দেয়াল-ঘেরা একটা বাড়িতে নিয়ে আসা হলো। বাড়িটা বড় আর মজবুত। বোঝা গেল এটা রাজার বাড়ি।
পাথরের দেয়ালের মাঝখানে একটা উঠোন মতো। সেখানেই ফ্রান্সিস আর বিস্কোকে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। সামনেই গাছের ডাল ফালি করে তৈরী একটা সিংহাসন মতো। তাসক ঘাস আর পাখির বিচিত্র পালক দিয়ে তৈরী একটা বসবার আসন।
একটু পরেই দীর্ঘদেহী প্রৌঢ় মতো একজন লোক বেরিয়ে এল। উপস্থিত ত্ৰিস্তানরা সকলেই মাথা নোয়াল। বোঝা গেল ইনিই রাজা। মোকার মতো এই রাজার গায়েও একটা কোহালহো। গলায় একটা বিনুনির মতো বাঁধা। কপালে গালে শরীরে উল্কি আঁকা। হাতে একটা সাপের মতো আঁকাবাঁকা লাঠি।
রাজার পেছনে পেছনে যে বৃদ্ধলোকটি বেরিয়ে এল তাকে দেখে ফ্রান্সিস অনেকটা নিশ্চিত হলো। বৃদ্ধটি সেই দোভাষী। অল্প অল্প স্পেনীয় ভাষা বুঝতে পারে বলতেও পারে। সে। একপাশের একটা পাথরেবসল। রাজা সিংহাসনে কসলে উপস্থিত সবত্ৰিস্তানরা বসল। রাজাহাতের বাঁ লাঠিটা ফ্রান্সিসদের দিকেইঙ্গিত করেতীরে কী বলে উঠলেন। রাজার শরীরের তুলনায় কণ্ঠস্বর ভীষণ সরু। ফ্রান্সিস সেই দোভাষী বৃদ্ধের দিকে তাকাল। বৃদ্ধটি এবার উঠে দাঁড়াল। রাজার দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে নিয়ে কী বলল। রাজাও কী বললেন। বৃদ্ধটি এবার ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। বলল–মহামান্য রাজা-তোমরা-কেন?ফ্রান্সিসফলল-আপনারা অন্যায়ভাবে কঙ্কালদ্বীপের রাজাকে বন্দী করে এনেছেন। আমরা রাজা মোকার মুক্তির জন্যে এসেছি। বৃদ্ধটি বলল–রাজা–গিয়ানির মন্দির-যত রূপোর থাম-চাই-বিনিময়ে রাজা মোকা-। ফ্রান্সিস বুঝল রূপোর থামগুলোর ওপরই রাজার লোভ। বলল
ঠিক আছে-রাজা মোকার সঙ্গে আমাদের এই নিয়ে কথা বলতে দিন। মোকাকে রাজী করবার চেষ্টা করব।
বৃদ্ধটি রাজাকে তাই বলল। রাজা কী বলল যেন। কয়েকজন ত্ৰিস্তান যোদ্ধা এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস আর বিস্কোকে ধাক্কা দিয়ে চলবার নির্দেশ দিল। দুজনে নির্দেশমত চলল। ওদিকে রাজসভায় বিচারপ্রার্থী একজনকেরাজা কি যেন বলতে লাগল।
উত্রাই বেয়ে ফ্রান্সিসরা উঠতে লাগল। একবারে ন্যাড়া পাহাড়। শুধু পাথর আর ধুলো। ঘাসও জন্মায়নি সেখানে।
একটি বাড়ির সামনে এসে ত্ৰিস্তান যোদ্ধারা থামল। পাথয় আর তাসক ঘাসের ছাউনির ঘর। খণ্ড খণ্ড ডাল দিয়ে তৈরী দরজা। বুনো লতা দিয়ে বাঁধা। সেই বাঁধন খুলে একজন দরজা খুলল। ফ্রান্সিসদের ভেতরে ঢুকতে ইঙ্গিত করল। ওরা দুজন ভেতরে ঢুকল। ত্রিস্তান কয়েকজনও ঢুকল।
বাইরের আলো থেকে ঘরে ঢুকে অন্ধকার লাগল। কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না ওরা। অন্ধকার চোখে একটু সয়ে এলে দেখল ঘরের মেঝেয় তিনি চারটে কাঠের খুঁটি পোঁতা। ত্রিস্তানরা ফ্রান্সিস আর বিস্কোকে দুটি খুঁটির কাছে নিয়ে গেল। তারপর বুনো লতা দিয়ে খুটির সঙ্গে হাত বেঁধে দিল। তারপর দরজা বন্ধ করে চলে গেল।
ফ্রান্সিস এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘরটা ভাল করে দেখছিল, তখনই নজর পড়ল একটা খাটের নীচে বন্দী একজন পা ছড়িয়ে মাটিতে বসে আছে। ফ্রান্সিস চোখ কুঁচকে তাকাল বন্দীটির দিকে। চমকেউঠল–আরে মোকা। মোকাও তখন ফ্রান্সিসের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে। এবার ফ্রান্সিসকে চিনতে পেরে হাসল। মোকার চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। বেশ খারাপ হয়ে গেছে চেহারা; ফ্রান্সিস ডাকল-মোকা?
