দুজনে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। তারপর দ্রুত ছুটল সমুদ্রতীরের দিকে। সমুদ্রতীরে যেখানে ত্ৰিস্তানরা কানো নৌকা নিয়ে এসেছিল, পাহারাদাররা সেখানে ওদের দুজনকে নিয়ে এল। ফ্রান্সিস তাকাল সমুদ্রের দিকে। ত্রিস্তানদের ক্যানো নৌকার চিহ্নমাত্র
নেই। অল্প জ্যোৎস্নায় দেখা যাচ্ছে দূরে সমুদ্রের বুকে পাতলা কুয়াশার আস্তরণ। তার মানে ধরে নিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে।
ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি কী করা যায় বলো তো?
মোকাকে ত্ৰিস্তানদের হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে।
তার মানে যুদ্ধ।
হ্যাঁ প্রয়োজনে যুদ্ধ করতে হবে।
আমি যুদ্ধে রক্তপাত এসব এড়াতে চাইছি।
বেশ, সে চেষ্টা করা যাক। ত্রিস্তানরা মোকাকে বন্দী করল কেন কী ওদের উদ্দেশ্য তা তো আমরা জানি না।
ভাবছি, কালকেই জাহাজে নিয়ে ত্ৰিস্তানদের দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হব।
দু একজন ইকাবোকে সঙ্গে নিতে হবে। ওরা ঠিকনিশানা রেখে আমাদের নিয়ে যেতে পারবে।
ওরা নিজেদের আস্তানায় ফিরে এল যখন রাত শেষ হয়ে এসেছে। হ্যারি আবার শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুমলো না। কী করে মোকাকে উদ্ধার করবে তারই পরিকল্পনা করতে লাগলো। পাখির ডাক শোনা গেল। ভোর হলো।
ফ্রান্সিস বিছানা থেকে উঠল। হাত-মুখ ধুয়ে একটা বুনো আনারস খেল। তারপর চলল রাজবাড়ির দিকে। সেখানে পৌঁছে দেখল অনেক ইকাবো মেয়েপুরুষ সেখানে জড়ো হয়েছে। কেউ কেউ কাঁদছে। ফ্রান্সিস বুঝল-ওরা সত্যিই মোকাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। ফ্রান্সিসকে দেখে কয়েকজন ইকাবো মেয়েপুরুষ ছুটে এল। ফ্রান্সিসের হাত ধরে কী বলেতে লাগল। ওদের মুখে বারবার রাজা মোকা কথাটা শুনে ফ্রান্সিস বুঝল ওরা কি বলতে চায়? ফ্রান্সিস রাজবাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। একটা পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে সবাইকে শান্ত হবার ইঙ্গিত করল। সকলে চুপ করল। ফ্রান্সিস তখন অঙ্গভঙ্গী করে ত্রিস্তানদের দ্বীপ থেকে কী করে মোকাকে মুক্ত করে আনবে সেটা বোঝাল। ও বারবার মোকা ত্রিস্তানআর মুক্তি এই কথা কটার ওপর জোর দিয়ে বলল। ইকাবোরা বুঝতে পারলো ফ্রান্সিস মোকার মুক্তির কথাই বলছে। ওরা আনন্দে হৈ হৈ করে উঠল। হাসতে লাগল। ফ্রান্সিসও হাসল। খুশীইহলো–যাক, ইকাবোরা ওর কথা বুঝতে পেরেছে।
ও তখন পাহারাদারদের সর্দারকে ইঙ্গিতে ডাকল। সর্দার কাছে এল। ফ্রান্সিস ওকেইঙ্গিতে বোঝাল ওরা জাহাজ চালিয়ে ত্ৰিস্তানদের দ্বীপে যাবে। সর্দার ওদের নিয়ে যেতে পারবে কিনা। কয়েকবার মুক্তি ত্রিস্তান কথাগুলো শুনে সদার মাথা ঝাঁকাল। তারপরে নিজের বুকে বারবার ছুঁইয়ে ও বোঝাল ও ওদের নিয়ে যেতে পারবে।
সেদিন দুপুরেই ফ্রান্সিস হ্যারি আর পাহারাদারদের নিয়ে সমুদ্রতীরের দিকে রওনা হলো। নৌকো চালিয়ে ওরা ওদের জাহাজে এসে উঠল। সকলেই ওদের ঘিরে ধরল। ঠিক বুঝল না ফ্রান্সিস হঠাৎ এল কেন? ফ্রান্সিস সকলের দিকে তাকিয়ে বলল ভাইসব–কাল রাত্রে ত্ৰিস্তানরা লুকিয়ে কঙ্কাল দ্বীপে এসেছিল। মোকাকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে। জানি না ওদের উদ্দেশ্য কি? যা হোক আমরা আজকেই রাহাজ। নিয়ে যাচ্ছি যাত্রা করণে, ত্ৰিস্তান দ্বীপ লক্ষ্য করে। একজন ইকাবো সর্দারকে নিয়ে যাচ্ছি আমাদের ঠিক পথে নিয়ে যাবার জন্য। এখন সবাই বিশ্রাম করো। রাত হলেই আমরা যাত্রা করব। মোকাকে মুক্ত করাই আমাদের উদ্দেশ্য।
সব ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো। তারপর সবাই যে যার কাজে চলে গেল।
রাতের খাওয়া–দাওয়া শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ হলো। ফ্রান্সিস আর হ্যারি ইকাবো সর্দারকে নিয়ে জাহাজের ডেক-এ এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল-নোঙর তোল। পাল খাটাও। বাতাস পড়ে গেছে। দাঁড়িরা দাঁড়ঘরে যাও। মুহূর্তে জাহাজে কর্মব্যস্ততা শুরু হলো। ঘড়ঘড় শব্দে নোঙর তোলা হলো। কয়েকজন মাস্তুল বেয়ে উঠে গেল ওপরে। পাল খুলে দিল। ইকাবো সর্দারের নির্দেশমতো জাহাজ চলল দক্ষিণ-পশ্চিম মুখো। আজ জ্যোৎস্না তেমন উজ্জ্বল নয়। আবছা আলোয় পাতলা কুয়াশা ঢাকা সমুদ্রের ওপর দিয়ে, জাহাজ চলল ঢেউ ভেঙে।
সারারাত জাহাজ চলল। পরের দিন ভোর ভোর সময়ে মাস্তুলের ওপর নজরদার ভাইকিংটি চেঁচিয়ে বলল–ত্রিস্তান দ্বীপ দেখা যাচ্ছে।
সকালে সমুদ্রের বুকে কুয়াশার পাতলা আবরণ কেটে গেল। দেখা গেল ত্ৰিস্তান দ্বীপ। দ্বীপে দুটো পাহাড়ের পাথুরে চূড়া দেখা গেল। পাহাড় দুটো একেবারে ন্যাড়া, সবুজের চিহ্নমাত্র নেই। শুধুই নীচের দিকে গাছগাছালির ভীড়। ফ্রান্সিসের পাশেই দাঁড়িয়েছিল হ্যারি। বলল–একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছে?
কী? ফ্রান্সিস ওর দিকে তাকাল।
ডানদিকের চুড়োটার মাথা ভাঙা।
হ্যাঁ, কেমন চ্যাপ্টা মতো।
ওটা আগ্নেয়গিরির মুখ। হ্যারি বলল।
এখন বোধহয় মৃত। ফ্রান্সিস বলল।
হতে পারে। তবে সেটা কাছে না গিয়ে বলা যাবে না।
ফ্রান্সিসের নির্দেশে জাহাজের পাল নামিয়ে ফেলা হলো। দাঁড়িরা দাঁড় বাওয়া বন্ধ। করল। ঘরঘর শব্দে নোঙর ফেলা হলো।
সবাইকে ডেক-এ আসতে নির্দেশ দিল ফ্রান্সিস। সবাই ডেক-এ এল। ফ্রান্সিস বলল–ভাইসব শুধু আমি আর বিস্কো ত্ৰিস্তান দ্বীপে যাবো। তোমরা সবাই জাহাজে থাকবে। দুচারজন আপত্তি তুলল। বলল–তোমরা মাত্র দুজন যাবে। এটা বিপজ্জনক। ফ্রান্সিস বলল–তা ঠিক। তবে আমি প্রথমে যুদ্ধে জড়াতে চাইছি না। আমরা দুজনেই ওদের হাতে ধরা দেব। ওরা নিশ্চয়ই আমাদের রাজার কাছে নিয়ে যাবে। তখনই জানতে পরবো ওদের উদ্দেশ্য কি? তাছাড়া যাকে মুক্ত করতে যাচ্ছি সেই মোকা কোথায় আছে সেটা জানতে পারবো। এ ছাড়া অন্য কোন পথ নেই।
