ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল ত্রিস্তানরা নিশ্চয়ই এখানেই আত্মগোপন করে আছে। তোমরা রাজবাড়ির সামনে জড়ো হও আর চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখো। খবরদার–অস্ত্র হাত থেকে নামাবে না। মোকাও এই কথাগুলো ইকাবো যোদ্ধাদের বলল।
রাজবাড়ির সামনে সবাই জড়ো হলো। তৈরী হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
মোকা, ফ্রান্সিস আর হ্যারি বাড়ির ভেতর ঢুকল। একটা ঘরে দেখল ম্যাকরেল মাছের তেলের একটা প্রদীপ জ্বলছে। তাসক ঘাসের একটা বিছানা। তাতে গাছের নরম ছাল বিছানো। কে একজন শুয়ে আছে।
ফ্রান্সিস দ্রুত ছুটে গিয়ে লোকটার গলায় তরোয়াল চেপে ধরল। দেখল–আহত সেনাপতি। সেনাপতি ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। ফ্রান্সিস তরোয়াল সরিয়ে নিল। মোকাকে বলল-সেনাপতিকে বলল-ওর দলের প্রায় সবাই বন্দী। আমরা রক্তপাত চাইনা। ওরা এই দ্বীপ ছেড়ে চলে যাক। মোকা সেনাপতিকে ত্ৰিস্তান ভাষায় সে কথা বলল। সেনাপতি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। বিড়বিড় করে বললো–আমরা চলে যাবো।
ঘরের আর এক কোণায় অন্ধকার আর একটা বিছানা ছিল। সেখানে শুয়েছিল দোভাষী বৃদ্ধটি। সে এবার উঠে আলোর কাছে এল। ফ্রান্সিসের দিকে চেয়ে বলল সেনাপতি অসুস্থ–গুরুতর। আমাদের সৈন্যদের হত্যা করবেন না। কাল এই দ্বীপ ছেড়ে যাব।
ফ্রান্সিস বলল–আক্রান্ত না হলে আমরা কাউকে আক্রমণ করি না। ত্রিস্তান যোদ্ধারা কিছু আহত হয়েছে কিন্তু কাউকে আমরা মারিনি। শুধু বন্দী করেছি।
ঠিক তখনি বাইরে জোর চিৎকার হৈ চৈ শোনা গেল। লুকিয়ে থাকা ত্ৰিস্তানরা আক্রমণ করেছে। জোর লড়াই চলল বাইরে বেশ কিছুক্ষণ। আবার চারিদিক নিঃশব্দ। শুধু আহতদের আর্তনাদ মাঝে মাঝে শোনা যেতে লাগল।
ফ্রান্সিসদের নির্দেশে সব ত্রিস্তানদের হাত বেধে একটা গুহায় রাখা হল। পূর্বদিকের আকাশ তখন লাল হয়ে উঠেছে। আহত ভাইকিং আর ইকাবোদের নৌকা করে জাহাজে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
সকাল হলো। দোভাষী বৃদ্ধটি ফ্রান্সিসকে এসে বলল–চিকিৎসক-সেনাপতির চিকিৎসা।
ফ্রান্সিস তখনই ফার্নান্দোকে জাহাজে পাঠাল। কিছুক্ষণ পরে জাহাজের বৈদ্য এল। সেনাপতির বুকের ক্ষত পরীক্ষা করল। ওষুধ দিয়ে পট্টি বেঁধে দিল। দোভাষী বৃদ্ধ ফ্রান্সিসকে বারবার ধন্যবাদ জানাল।
একটু বেলা হতে সেনাপতি বৃদ্ধ দোভাষীকে ডেকে কী বলল। বৃদ্ধ ফ্রান্সিসকে এসে বলল সেনাপতি সুস্থ বোধ করছেন। ত্রিস্থান বন্দীদের ছেড়ে দিন। আমরা রওনা হব।
ত্রিস্তান বন্দীদের হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হলো। ওরা সবাই সমুদ্রের ধারে এসে জড়ো হলো। সারি সারি ক্যানো নৌকা রাখা হলো। প্রথমে আহতদের নৌকোয় তোলা হল। আহত সেনাপতিকে কয়েকজন কাঁধে করে নিয়ে এল। জোড়াবাঁধা দুটো ক্যানো নৌকায় পাটাতনে সেনাপতিকে শুইয়ে রাখা হল। সঙ্গে রইল বৃদ্ধ দোভাষীটি। তারপর সবাই একে একেক্যানো নৌকায় উঠতে লাগল। সবাই উঠলে সারি বেঁধে সব নৌকা চলল দক্ষিণমুখো ত্ৰিস্তানদের দ্বীপের উদ্দেশ্যে।
দু একদিনের মধ্যেই কঙ্কালদ্বীপে জীবন ফিরে এল। যারা বনে লুকিয়েছিল তারা সবাই এল। ইকাবোদের ঘরে ঘরে আবার শান্তি ফিরে এল।
কঙ্কালদ্বীপে রইল শুধু ফ্রান্সিস আর হ্যারি। সব ভাইকিংরা জাহাজে ফিরে গেল।
সেদিন শেষরাত। ফ্রান্সিস আর হ্যারি দুজনে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎকয়েকজন ইকাবো এসে ওদের ঘরের সামনে চিৎকার করে কী বলতে লাগলো। ওদের হাতে মশাল। ফ্রান্সিস আর হারির ঘুম ভেঙে গেল। ফ্রান্সিস উঠেই শিয়র থেকে একটা তরোয়াল নিল। গাছের ডাল কেটে তৈরী দরজার দিকে এগোল। হ্যারিও একটা তরোয়াল নিল। চলল ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে।
বুনো লতায় বাঁধা দরজাটা খুলে ফ্রান্সিস বাইরে এল। বলল কী ব্যাপার? যে কজন ইকাবো এসেছে তাদের দেখেই ফ্রান্সিস চিনল এরা রাজবাড়ির পাহারাদার। ওরা ফ্রান্সিসকে হাত পা নেড়ে কী বোঝাতে লাগল। ফ্রান্সিস ওদের একটা কথা বুঝল–বন্দী। আর বুঝল ওরা বারবার রাজা মোকার নাম করছে। ওরা রাজবাড়ির দিকে ইঙ্গিত করতে লাগল। ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–হ্যারি মনে হচ্ছে মোকা কোনোভাবে বন্দী হয়েছে। রাজবাড়িতে চলল।
দুজনে রাজবাড়ির দিকে চলল। জ্যোৎস্না বেশী উজ্জ্বল নয়। চারিদিকে নিস্তব্ধ। দুজনে আগে আগে চলল। পেছনে চলল রাজবাড়ির পাহারাদার।
ওরা রাজবাড়িতে পৌঁছল। ভেতরে রাজা মোকার ঘরে ঢুকে দেখল পাথরের ওপর বিছানো তাসক ঘাসের বিছানা ছত্রাখান হয়ে আছে। মোকা নেই। ফ্রান্সিস মৃদু আলোয় চারদিকে দেখল। ঘর শূন্য। একপাশে পাথরের ওপর ছড়ানো রয়ছে মোকার গায়ের সেই কোহালহোটা।
তখনই পাহারাদারদের মধ্যে কয়েকজন দুজন পাহারাদারকে ধরাধরি করে নিয়ে এল। দুজনইআহত। তারমধ্যে একজনের আঘাত সাংঘাতিক। তখনই একজন পাহারাদার বারবার ত্রিস্তান এই কথাটা বলতে লাগল। এবার ফ্রান্সিস ব্যাপারটা বুঝতে পারল। রাতে ত্ৰিস্তানরা এসে মোকাকে ধরে নিয়ে গেছে। ত্ৰিস্তানরা আবার আসতে পারে। একথা ওরা ভাবতেই পারেনি। কিন্তু তাই ঘটল। পাহারাদারটি এবার সমুদ্র তীরের দিকেইঙ্গিত করতে লাগল। ফ্রান্সিস বুঝল ক্যানো নৌকা চালিয়ে ত্ৰিস্তানরা এসেছিল। কতক্ষণ আগে ধরে নিয়ে গেছে সেটা পাহারাদারদের বারবার জিজ্ঞেস করেও জানতে পারল না। বলল–হ্যারি-কিছুই বুঝতে পারছি না। কখন ধরে নিয়ে গেল? ওদের দলেই বা কতজন ছিল? যাগগে, চলো সমুদ্রের ধারে যাওয়া যাক। যদি ওদের ধরা যায়।
