মোকা ওদের কথায় একটু শান্ত হলো।
সন্ধেবেলা ফ্রান্সিস সব ভাইকিংদের ডেক-এ জমায়েত হতে বলল।
সন্ধ্যেবেলা সবাই এসে ডেক-এ বসল। ফ্রান্সিস বলতে লাগল-ভাইসব-আজ রাত্রেই আমরা কঙ্কালদ্বীপে যাবো। ত্রিস্তানরা আমাদের দুই বন্ধুর সঙ্গে জঘন্য ব্যবহার করেছে। ওরা ত্রিস্তান সেনাপতিকে রূপোর নদীর হদিস বলে দেবে এই ভাঁওতা দিয়ে কোনো রকমে নিজেদের জীবন বাঁচিয়েছে। যা হোক–ত্ৰিস্তানরা ওদের প্রাণে মারেনি। কাজেই ত্ৰিস্তানরা আমাদের শত্রু নয়। আমরা ওদের ভয় দেখিয়ে কশ্যতা স্বীকার করাবো। আমরা আগ বাড়িয়ে ওদের হত্যা করবো না। আক্রান্ত হলে তবেই যুদ্ধ করবো। ফ্রান্সিস থামল। তারপর বলল–এখন তাড়াতাড়ি খেয়ে বিশ্রাম করে নাও। গভীর রাত্রে আমাদের যাত্রা শুরু হবে।
সবাই চলে গেল। ফ্রান্সিসের কথামত খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রাম করতে লাগল।
গভীর রাত্রে নৌকোয় করে যাত্রা শুরু হলো। প্রথম নৌকোটায় গেল ফ্রান্সিস, হ্যারি, বিস্কো আর তীর ধনুক নিয়ে শাঙ্কো। বনের মধ্যে নেমে ওরা অন্যদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। সে রাত্রে চাঁদ অনেক উজ্জ্বল। সমুদ্রে, বনের মাথায় জ্যোৎস্নার ছড়াছড়ি। বোধহয় পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়।
পাঁচটা নৌকোয় দফায় দফায় ভাইকিংরা আর সুস্থ ইকাবো যোদ্ধারা বনের আড়ালে তীরে নামল। ইকাবোদের হাতে কাঠের বশী। ভাইকিংরা তরোয়াল, বশ নিল। সবাই যখন এল খন ফ্রান্সিস মোকাকে বলল–এই বনে অনেক ইকাবো আত্মগোপন করে আছে। তুমি শিস দিয়ে জানিয়ে দাও যে আমরা ওদের বন্ধু শত্রু নই।
বনের মধ্যে কিছুটা গিয়ে মোকা উবু হয়ে বসে শিস দিতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ নানা সুরে শিস দিল।
একটু পরেই দেখা গেল অন্ধকারে বনের আড়াল থেকে একজন দুজন করে কাঠের বর্শা, গাছের ভাঙা ডাল দিয়ে তৈরি লাঠি নিয়ে ইকাবোরা বেরিয়ে আসছে। প্রায় পঁচিশ-ত্রিশজনইকাবো এসে ওদের দলে যোগ দিল। সকলেই রোগার্ত। কতদিন না খেয়ে আছে কে জানে।
ফ্রান্সিস সবাইকে লক্ষ্য করে চাপাস্বরে বলল–আমরা বনের মধ্যে দিয়ে যাবো না। ওখানে ত্ৰিস্তানরা অনেক ফাঁদ পেতে রেখেছে। আমরা চড়াইয়ের ঢাল বেয়ে উঠবে। আমি না বললে কেউ আক্রমণ করবে না। ফ্রান্সিস মোকাকে বলল-ইকাবাদের কথাটা বলে দাও। মোকা ওদের ভাষায় কথাগুলো বলে দিল। ইকাবো যোদ্ধারা মাথা এপাশ ওপাশ করল। অর্থাৎ ওরা বুঝেছে।
বন ছেড়ে সবাই চড়াইয়ের ঘাসে ঢাকা ঢাল বেয়ে উঠতে লাগল। বেশ দূর পর্যন্ত জ্যোৎস্নায় দেখা যাচ্ছে।
কিছুটা এগোতে বাঁ দিকে বনের ধারে আগুন জ্বলছে দেখা গেল ত্রিস্তান যোদ্ধারা ওখানে দল বেঁধে বসে আছে। দ্বীপের বিচিত্র সব পাখি উড়ে-উড়ে আগুনের কাছে আসছে। ওরা সেসব মেরে পুড়িয়ে খাচ্ছে।
ফ্রান্সিসের নির্দেশমতসবাই হামাগুড়ি দিয়ে ওদের কাছাকাছি গেল। তারপর ওদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল।
ফ্রান্সিস মোকাকে বলল–চেঁচিয়ে ওদের বলো যে ওদেব আমরা ঘিরে ফেলেছি। বাঁচতে হলে ওরা যেন অস্ত্রত্যাগ করে।
ফ্রান্সিসের নির্দেশে হঠাৎ সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল। ত্ৰিস্তানরা পাখি মারতে মারতে হঠাৎ দেখলকারা ওদের ঘিরে দাঁড়িয়েছে। তখনই মোকা ত্ৰিস্তানদের ভাষায় বলতে লাগল-তোমরা শোন। শুধু আমরা, ইকাবোরা নই, আমাদের দলে আছে ভাইকিংরা। এরা দুর্ধর্ষ জাতি। এদের হাতে তরোয়াল থাকলে এদের সঙ্গে যুদ্ধে কেউ পারে না। আমরা মিছিমিছি রক্তপাত চাই না। তোমরা অস্ত্রত্যাগ কর। আমরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করবো না।
ওদের মধ্যে কয়েকজন বর্শা উঁচিয়ে ধরেছিল। কিন্তু চারদিক লুকিয়ে ভাইকিং আর ইকাবো যোদ্ধাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র দেখে বর্শা নামাল। নিজেদের মধ্যে কী কথাবার্তা বলল। তারপর হাতের বাগুলো মাটিতে ফেলে দিতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সবাই অস্ত্রত্যাগ করল।
ফ্রান্সিস বিস্কোকে বলল-যাও-বর্শাগুলো নিয়ে এসো। পাহাড়ের কোনো গুহায় গিয়ে রেখে এসো।
বিস্কো আর কয়েকজন মিলে বর্শাগুলো আনতে গেল।
হঠাৎ ফ্রান্সিসদের পেছনে একটা বিরাট পাথরের চায়ের আড়াল থেকে আট দশজন ত্ৰিস্তান যোদ্ধা বর্শা হাতে ছুটে এল। ফ্রান্সিসরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওরা ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল-লড়াই। ভাইকিংরা কেউ কেউ হঠাৎ এই আক্রমণে আহত হলো। আক্রমণের প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠে ওরা ঘুরে আক্রমণ করল। ত্রিস্তানরা হাতে বশা ছুঁড়ে মারছে। পরক্ষণেই নিরস্ত্র অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়ছে। ভাইকিংরা সহজেই ওদের ঘায়েল করতে লাগল তরোয়াল ও বশা দিয়ে।
লড়াই অল্পক্ষণেই মিটে গেল। কয়েকজন ইকাবো বন থেকে লতাগাছ নিয়ে এল। তাই দিয়ে ত্রিস্তানদের পিছমোড়া করে হাত বাঁধা হলো।
ফ্রান্সিসরা এবার চলল রাজবাড়ি লক্ষ্য করে। চড়াই দিয়ে হেঁটে ওরা ওপরের দিকে চলল। বসতি এলাকা শুরু হলো। ভাইকিং আর ইকাবো যোদ্ধারা ঘরে ঘরে ঢুকতে লাগল। ত্ৰিস্তানদের বন্দী করে আনতে লাগল। ত্ৰিস্তানরা বোধহয় ভাবেনি এত তাড়াতাড়ি ওরা আক্রান্ত হবে। ফ্রান্সিস আগেই বলেছিল যেন বেশি গোলমাল না হয়। কিন্তু গোলমাল হৈ চৈ চিৎকার কিছু হলো। তাতেই রাজবাড়ির পাহারাদার ত্রিস্তানরা সাবধান হয়ে গেল। ওরা গাছ-পাথরের আড়ালে গা ঢাকা দিল।
ফ্রান্সিসরা রাজবাড়িতে পৌঁছে দেখল রাজবাড়ি অরক্ষিত পড়ে আছে। জ্যোৎস্নার আলোতে রাজবাড়ির চারপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
