মোকা রাজামশাইকে সব বুঝিয়ে বলল। রাজামশাই সব শুনে মাথা ঝাঁকিয়ে কি সব বলে গেল। মোকা বলল–বাবা বলছেন–আপনাদের পরিকল্পনা খুব সুন্দর হয়েছে। উনি ডুব সাঁতার দিয়ে জাহাজ পেরোতে পারবেন।
এ সময় রাজামশাই মোকাকে কিছুক্ষণ ধরে কী বললেন। মোকা বলল–বাবা বলছেন ভবিষ্যৎকী ঘটবেজানা নেই–কাজেই উনি আমাকে কোহালহো পরিয়ে অভিষেক করতে চান। জাহাজে তো অনেক ইকাবো আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সামনেই তিনি এই অনুষ্ঠান করবেন।
বেশ–
ফ্রান্সিস বলল-তোমার বাবাকে ডেক-এ নিয়ে চলো।
ওরা সবাই ডেকে এসে দাঁড়াল।
যে সব আহত, আগুনে-পোড়া এবং সুস্থ ইকাবোরা জাহাজে আশ্রয় নিয়েছিল তারা রাজাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। দুহাত সোজা ওপরে তুলে মাথা নীচু করে রাজাকে অভিনন্দন জানাল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল।
রাজা সকলের দিকে একবার তাকিয়ে ইকাবোদের ভাষায় কিছুক্ষণ বলে গেলেন। তারপর নিজের গায়ের কোহালহো মোকার গায়ে পরিয়ে দিলেন। গলায় নারকেলের দড়িটা ফিতের মতো বেঁধে দিলেন।
মোকা রাজপদে অভিষিক্ত হলেন। উপস্থিত ইকাবোরা খুশিতে হৈ-হৈ করে উঠল। জাহাজের রেলিঙে ঝুঁকে একজন ইকাবো কিছুক্ষণ ধরে নানা সুরে শিস দিল। বোধহয় সাঙ্কেতিক শিস দিয়ে ও কঙ্কাল দ্বীপের ইকাবোদের এই সংবাদ জানাল।
ওদিকে সেনাপতি অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। ফ্রান্সিস এত দেরি করছে কেন? ফ্রান্সিস সেটা বুঝতে পারল। এবার ও রেলিঙের ধারে এগিয়ে এল। ও দোভাষী বৃদ্ধকে কীভাবে কেমন করে বন্দীদের জাহাজে তোলা হবে–রাজা আর রাজপুত্রকে নামানো হবে, সব বুঝিয়ে বলতে লাগল।
আর হ্যারি ওদিকে জাহাজের ওপাশে শক্ত কাছি ঝুলিয়ে দিল। সবাইকে তৈরী থাকতে বলল।
ফ্রান্সিসের কথা দোভাষী সেনাপতিকে বুঝিয়ে বলল। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সেনাপতি। ফ্রান্সিস সেনাপতির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সেনাপতির সম্মতির ওপর সব নির্ভর করছে। একটু পরে সেনাপতি কী যেন বললেন। দোভাষী বলল-সেনাপতি রাজী হয়েছেন। তবে ওঠা-নামার দড়ি থাকবে পাশাপাশি।
বেশ। ফ্রান্সিস বলল। ওদিকে সেনাপতির একজন দেহরক্ষী হাতের তরোয়াল দিয়ে ভাইকিং বন্দীদের হাত-পায়ের বাঁধন কেটে দিল।
ফ্রান্সিস তখনই শাঙ্কোকে ইশারায় ডাকল। ও কাছে আসতে ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–আমার কাছে থাকো। আমার কথামত তীর ছুঁড়বে। নিশানা যেন নিখুঁত হয়।
শাঙ্কো তীর-ধনুক নিয়ে ফ্রান্সিসের আড়ালে এসে দাঁড়াল।
বন্দী দুজন ভাইকিংদের নিয়ে ক্যানো নৌকোটা একজন ত্রিস্তান যোদ্ধা জাহাজের গায়ে এসে লাগল।
কাছিতে ফাঁসমত পরিয়ে, তাতে রাজাকে বসিয়ে নামিয়ে দেওয়া হলো আস্তে আস্তে ক্যানো নৌকোর ওপর। অন্য কাছি ধরে বন্দী ভাইকিংটি জাহাজেউঠে এল। জাহাজে নামতেই কয়েকজন ভাইকিং ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল।
এবার রাজপুত্র মোকা। দ্বিতীয় ভাইকিং বন্ধুটিকে তোলা হতে লাগল জাহাজে। ও জাহাজে উঠল। সবাই ওকে ঘিরে ধরল।
মোকা নামতে লাগল। ফ্রান্সিস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেনাপতির দিকে। সে কোনো ইঙ্গিত করে কিনা। দেখল, সেনাপতি চুপ করেই বসে আছে। রাজা ও রাজপুত্র দুজনেই তো এখন তার হাতের মুঠোয়।
মোকা ক্যানো নৌকোতে নেমেই চাপাস্বরে বোধহয় বাবাকে কিছু বলেই পাক, খেয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাজাও ঝাঁপ দিতে গেলেন। কিন্তু একটু দেরি হলো। ততক্ষণে ক্যানো নৌকোয় বসা ত্ৰিস্তান যোদ্ধাটি কাঠের কশা তুলে ছুঁড়ে মেরেছে রাজার বুক লক্ষ্য করে। ফ্রান্সিস চীৎকার করে উঠল-শাকো। শাকো সঙ্গে সঙ্গে তীর ছুঁড়ল। তীর গিয়ে লাগল ত্ৰিস্তান যোদ্ধার ডান কাঁধে। কিন্তু ততক্ষণে বশ ছোঁড়া হয়ে গেছে। কশা বিঁধেছে রাজার বুকে। ক্যানো নৌকো থেকে গড়িয়ে জলে পড়ে গেলেন। ওখানকার জল লাল হয়ে উঠল। ত্ৰিস্তান যোদ্ধাটি বাঁ হাতে কাঁধ চেপে নৌকোয় বসে পড়ল। ওদিকে তিন-চারটি ক্যানো নৌকো মোকাকে খুঁজতে লাগল বশা উচিয়ে। কিন্তু মোকা আর ভেসে উঠল না। মোকা তখন ডুবসাঁতার দিয়ে জাহাজ পেরিয়ে জাহাজের ওপারে ঝোলানো কাছি ধরে উঠছে। সাত-আটজন ভাইকিং দ্রুত হাতে কাছি টেনে মোকাকে জাহাজে তুলে নিল।
চোখের পলকে এত ঘটনা ঘটে গেল। সেনাপতি কাঠের সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। চেঁচিয়ে কী বলে উঠল। সব ত্ৰিস্তান যোদ্ধারা বর্শা উচিয়ে চিৎকার করে উঠল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল–শাকো, সেনাপতিকে। সঙ্গে সঙ্গে শাকোর তীর ছুটল। একেবারে সেনাপতির বুকে গিয়ে বিধল। নিখুঁত নিশানা। সেনাপতি দুহাত তুলে উল্টে পড়ল কাঠের পাটাতনের ওপর। তারপর কাতরাতে লাগল।
এরকম কিছু ঘটবে ত্রিস্তানরা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি। ওরা হকচকিয়ে গেল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। তখনই দোভাষী বৃদ্ধটি চিৎকার করেকী বলে উঠল। তারপর তার ক্যানো নৌকোটা কালদ্বীপের দিকে চালাতে লাগল।
আর ক্যানো নৌকোগুলোও ওটার পেছনে-পেছনে চলল কঙ্কাল দ্বীপের দিকে। মারাত্মক আহত সেনাপতিকে নিয়ে ত্ৰিস্তান যোদ্ধারা ফিরে গেল কঙ্কালদ্বীপে।
***
সেদিনটা কাটল। ফ্রান্সিসরা সারাদিনই সজাগ রইল যদি ত্ৰিস্তানরা ফিরে আক্রমণ করে তার মোকাবিলা করার জন্যে। কিন্তু ত্ৰিস্তানরা আর এমুখো হলো না।
বাবার মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত রাজপুত্র মোকা চুপ করে বসে রইল আর মাঝে-মাঝেই ওর চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল। ফ্রান্সিসরা ওকে সান্ত্বনা দিল। বলল–অল্পের জন্যে তোমার বাবাকে বাঁচাতে পারলাম না। যাকগে তোমাদের দ্বীপ ত্ৰিস্তানরা দখল করে আছে। আগে ওদের তাড়াতে হবে। এখন ভেঙে পড়লে চলবে না।
