আমাদের নিয়ম রাজবংশের যে যুদ্ধে যাবে তাকেই এই পবিত্র কোহালহো গায়ে দিয়ে যেতে হবে। কালকে আমি গিয়েছিলাম, তাই যুদ্ধে জয় হয়েছে।
ফ্রান্সিস হাসল। বলল–তাহলে ত্রিপ্তানদের সঙ্গেযুদ্ধে তোমরা হেরে গেলে কেন?
ওরা হঠাৎ আক্রমণ করেছিল। বাবা পবিত্র কোহালহো গায়ে দিয়ে বেরোবার আগেই বন্দী হন।
হুঁ।
ফ্রান্সিস একটু কৌতূহলী হলো। রেলিঙে মেলে দেওয়া কোহালহোটা দেখতে লাগল। নারকেলের আঁশ থেকেতৈরী মোটা কাপড়। তাতে ছবির মতো কিছুনা আঁকা। রাজামশাই কোহালহো ভাঁজ করে গায়ে দেয়। তাইনল্লা বোঝা যায়নি। এখন ভাঁজ খুলে মেলে দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সিস কাছে গিয়ে ভালো করে দেখল কাপড়টা। ওটাতে কিছু ছবির মতো নক্সা আঁকা। তিনটি রঙ তাতে। সাদা, গেরুয়া আর সবুজ।
নক্সা ছবিটা দেখতে একরকম–
ফ্রান্সিস নক্সা ছবিটা দেখল। অতীতের কঙ্কাল দ্বীপের কোনো আদিবাসী ইকাবো এঁকেছে। আনাড়ির হাতে আঁকা নক্সা। বোঝাই যাচ্ছে কাপড়টাই বহুদিনের। পুরোনো। রঙ নক্সা সবই অস্পষ্ট। যেদিকে ওটা ভাঁজ করা থাকে সেদিকের রঙ অনেকটা স্পষ্ট।
একটু বেলা হয়েছে তখন। হঠাৎ বিস্কো ছুটতে ছুটতে ফ্রান্সিসের কেবিন ঘরে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–ফ্রান্সিস, শিগগির এসো৷ ত্ৰিস্তানরা আমাদের আক্রমণ করতে আসছে।
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ছুটল ডেক-এর সিঁড়ির দিকে। ছুটে ডেক-এর রেলিঙে এসে দাঁড়াল। দেখল, কঙ্কাল দ্বীপ থেকে অনেকগুলো ক্যানো নৌকো ওদের জাহাজের দিকে আসছে। দুদিক দুসার ক্যানো নৌকো। মাঝখানে দুটো নৌকো একটা কাঠের পাটাতন দিয়ে বাঁধা। তার ওপর কাঠের সিংহাসনটা পাতা সেনাপতি বসে আছে। সেনাপতির হাতে তরোয়াল। তার পেছনে দুটি ত্ৰিস্তান যোদ্ধার হাতেও তরোয়াল। ফ্রান্সিস বুঝল ওদের ফেলে-আসা তরোয়াল ওরা পেয়েছে।
সেনাপতির নৌকো দুটোর পেছনে একটা ক্যানো নৌকো। এখানে ভাইকিং এর পোষাক পরা কারা দুজন বসে আছে? ফ্রান্সিস চমকে উঠল–একি! ওদেরই দুজন বন্ধু। একটু কাছে আসতেই বোঝা গেল দুজনেরই হাত-পা বাঁধা। দুই বন্ধুকে দেখে জাহাজের ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো। দূর থেকে বোঝা গেল দুই বন্দী বন্ধু মান হাসল। খুব দূর্বল হয়ে পড়েছে ওরা। যাক, বেঁচে আছে। ফ্রান্সিস এতেই খুশী হলো। কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারল না–সেনাপতির মতলবটা কী?
জাহাজের কাছাকাছি এসে সব ক্যানো নৌকো থেমে গেল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাকল-হারি। হ্যারি এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল–ওদের মতলবটা ঠিক বুঝছি না। সবাইকে বলো তৈরী হতে। অস্ত্রঘর থেকে অস্ত্রশস্ত্র এনে ডেক-এ রাখো। কিন্তু ওরা যেন টের না পায়।
ফ্রান্সিসের নির্দেশমত সবাই তৈরী হলো। ডেক-এ রাখা হলো অস্ত্রশস্ত্র।
একটা ক্যানো নৌকো এগিয়ে এল। দেখা গেল তাতে দাঁড়িয়ে আছে অল্প অল্প স্প্যানিশ ভাষা বলতে পারে সেই বৃদ্ধটি। ক্যানো নৌকোটা জাহাজের খুব কাছে এল। বৃদ্ধটি চেঁচিয়ে বলল–যুদ্ধ নয়–বিনিময়–এসেছি।
কীসের বিনিময়? ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল।
সংবাদ–রাজা, রাজপুত্র মোকাজীবিত-জাহাজে।
কী করে বুঝলেন?
কাল রাত্রে–মোকাদ্ধ–শিস দিয়ে নির্দেশ–তাহলে রাজাও জীবিত জাহাজে।
বিস্কো চেঁচিয়ে বলল–রাজা, রাজপুত্র কেউ আমাদের জাহাজে নেই।
বৃদ্ধ দোভাষীটি সেনাপতিকে সে কথা বলল বোধহয়। সেনাপতি কী বলল। বৃদ্ধটি চেঁচিয়ে বলল-সেনাপতি বলেছেন-মিথ্যে বললে–চোখের সামনে বন্দী দুজন হত্যা।
ফ্রান্সিস এবার বিনিময় কথাটার অর্থ বুঝল। বলল-বেশ–রাজা আর রাজপুত্র জীবিত। আমাদের জাহাজে আছে।
তা হলে–বৃদ্ধ দোভাষী বলল–রাজা-রাজপুত্রকে দিন-দুজন বন্দী নিয়ে যান।
ফ্রান্সিস দ্রুত ভাবতে লাগল-এই সুযোগ। জীবিত অবস্থায় বন্ধু দুটিকে ফিরে পেতে গেলে বুদ্ধি খাটাতে হবে। বলল–বেশ আমরা রাজি। কিন্তু কথা দিন রাজা ও রাজপুত্রকে আপনারা প্রাণে মারবেন না।
কথাটা বৃদ্ধ সেনাপতিকে বলল। সেনাপতি উত্তরে কী বলল। বৃদ্ধ বলল– সেনাপতি বলেছেন–আমাদের ব্যাপার আপনারা বিদেশী কোনো কথা নেই।
বেশ–রাজপুত্রের সঙ্গে কথা বলি। তারপর বলছি। আসলে ফ্রান্সিস ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাটা ভাবছিল। একটু সময় চাই যার জন্যে।
ফ্রান্সিস ভাবতে ভাবতে মাথা নীচু করে কয়েকবার পায়চারি করল ডেক-এর ওপর। হ্যারি কাছেই ছিল। পায়চারি থামিয়ে বলল–হ্যারি উপায় বাতলাও।
রাজা আর রাজপুত্রকে পেলে ওরা সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলবে।
এ তো জলের মতো পরিষ্কার।
ওদের হাত থেকে বন্ধুদের উদ্ধার করতে হবে আবার রাজা-রাজপুত্রকেও বাঁচাতে
কিন্তু কী করে।
আমি একটা উপায় ভেবেছি।
হুঁ। বলো।
পরিকল্পনাটা এরকম–জাহাজ থেকে দুটো দড়ি ঝুলবে।
বেশ।
একটা দড়ি বেয়ে আমাদের এক বন্ধু জাহাজে উঠে আসবে। অন্য দড়িতে রাজাকে নামিয়ে দেওয়া হবে। তারপর অন্য বন্ধু আর রাজপুত্র।
বুঝলাম। তারপর?
রাজা আর রাজপুত্র নৌকায় নেমে ওরা কিছু বোঝার আগেই জলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কাছেই জাহাজ, ডুব সাঁতার দিয়ে জাহাজ পেরিয়ে ওপাশে ভেসে উঠবে। ওরা রাজা আর রাজপুত্রকে আক্রমণ করার আগেই আমরা ওদের জাহাজে তুলে নেব? |||||||||| –
সাবাস হ্যারি। ফ্রান্সিস হেসে হ্যারির কাঁধে এক চাপড় মারল। তারপর দুজনে চলল রাজা আর রাজপুত্রের কেবিনের দিকে। কেবিনে ঢুকে দেখল রাজা মাথা নীচু করে চুপচাপ বসে আছে। রাজপুত্র শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল ওদের দিকে। চোখে মুখে মৃত্যুভীতি। ফ্রান্সিস ওর কাঁধে হাত রাখল। বলল-বিপদের সময় সাহস হারাতে নেই। তারপর আস্তে আস্তে সমস্ত পরিকল্পনাটা বলল। মোকার মুখচোখ উজ্জ্বল হলো। ফ্রান্সিস বলল–কিছছু ভয় পেও না। আমরা আছি। এছাড়া আমাদের বন্ধুদের বাঁচাবার অন্য কোনো পথ নেই। এখন তোমার বাবাকে সব বুঝিয়ে বলো। ডুবসাঁতার দিয়ে জাহাজ পেরোতে পারবেন বিনা বলে দেখ।
